বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৯৭৫ সালে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার পর পারস্পরিক আস্থার দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার চীন। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের প্রায় ১৪ শতাংশই পূর্ব এশিয়ার বৃহৎ এ দেশটির সঙ্গে হয়। দেশের মোট আমদানির ২৫ শতাংশই চীন থেকে আসে। তবে দেশটিতে আমাদের মোট রফতানির মাত্র ১ দশমিক ২২ শতাংশ যায়। এক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে বিশাল যে বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে তা কমিয়ে আনার বিষয়ে কর্মতৎপরতার প্রয়োজন রয়েছে।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, ২০১২-১৩ অর্থবছরে চীনের সঙ্গে ৬৭৭ কোটি ডলারের বাণিজ্য হয়েছিল। এর প্রায় এক দশক পর ২০২১-২২ অর্থবছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য তিন গুণ বেড়ে ২ হাজার ৩ কোটি ডলার হয়েছে। বাণিজ্যসংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি যত বড় হবে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যও বাড়বে। বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বিকাশে আপাতত চীনের কোনো বিকল্প নেই বলেও পর্যবেক্ষকদের দাবি। তবে বিপুল অর্থের পণ্য চীন থেকে আমদানি করলেও দেশটিতে বাংলাদেশী পণ্য খুবই কম রফতানি হয়। তার পরও দেশটির সঙ্গে ক্রমান্বয়ে বাণিজ্য বৃদ্ধির বিষয়ে রফতানিকারকরা আশাবাদী। কেননা বাংলাদেশ যেসব পণ্য রফতানি করছে বা রফতানিযোগ্য পণ্য তৈরির বিষয়ে ভাবছে সেগুলোর যন্ত্রাংশ, কেমিক্যাল থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির প্রধান উৎস চীন। ফলে বাংলাদেশের প্রধান খাতগুলোকে দেশটি থেকে প্রয়োজনের ভিত্তিতেই এসব কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। তাই সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের রফতানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চীন থেকে আমদানিও বাড়তে থাকবে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও চীনের অবদান রয়েছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় এরই মধ্যে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। এছাড়া সাড়ে ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কাজ চলমান। ২০২৬ সালের মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোয় আরো সাড়ে ৫ বিলিয়ন ডলারের মতো বিনিয়োগ আসতে পারে। অবশ্য ২০১৬ সালে দুই দেশের মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক সই হয় সেটির আওতায় ২৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা রয়েছে। কর্ণফুলী টানেলের পার্শ্ববর্তী চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে আগামী বছর থেকেই বড় ধরনের চীনা বিনিয়োগের আশা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

এদিকে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি দূর করার বিষয়ে বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, ২০২০ সালের জুলাই থেকে চীন ট্যারিফ লাইনের আওতায় ৯৭ শতাংশ বাংলাদেশী পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা চালু করেছে। সম্প্রতি দেশটির সরকার চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যকে অন্তর্ভুক্ত করে সেটি বাড়িয়ে ৯৮ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছে। এ সুবিধা কাজে লাগাতে পারলে দেশটির বাজারে বাংলাদেশী পণ্য রফতানি বাড়ানো সম্ভব বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, প্রচলিত পণ্য দিয়ে চীনে রফতানি বাড়ানোর প্রচেষ্টা খুব কঠিন হবে। দেশটিতে বাংলাদেশের কমার্শিয়াল উইংয়ের সূত্র অনুযায়ী, চীনের বাজার বিশাল হলেও প্রতিযোগিতামূলক। স্থানীয় উৎপাদন-সরবরাহকারীদের সঙ্গে সে প্রতিযোগিতায় ভালো মানের বিদেশী কোম্পানিই কেবল টিকে থাকতে পারে। তাছাড়া দেশটির প্রধান ২০ আমদানি পণ্যের একটিও বাংলাদেশ রফতানি করে না। তাই প্রচলিত পণ্য দিয়ে নয়, বরং মূল্য সংযোজিত মানসম্মত পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে চীনে রফতানি বাড়াতে হবে। কারণ দেশটির ভোক্তাদের আচরণগত ধরন অনুসারে ধারণা করা হচ্ছে, দেশটিতে উচ্চহারে মূল্য সংযোজিত পণ্যের চাহিদা ক্রমেই বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে চীনের বাজারে রফতানি বৃদ্ধির জন্য মানসম্মত পণ্য ও অনলাইনে এসব পণ্যের ব্যাপক প্রচারণাও থাকতে হবে।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশকে ঘিরে আঞ্চলিক যোগাযোগ সৃষ্টিতে চীনের তৎপরতা রয়েছে। বিকল্প জ্বালানি রুটের পাশাপাশি একটি শিল্পাঞ্চল তৈরির উদ্যোগও রয়েছে তাদের। এর অংশ হিসেবে আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশের অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে চীন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে। চীন থেকে অনেক শিল্প প্রকল্পও বাংলাদেশে স্থানান্তর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সব মিলিয়ে চীনের সঙ্গে যে বাণিজ্য সম্ভাবনা রয়েছে, দূরদর্শী পরিকল্পনার আলোকে এক্ষেত্রে অগ্রসর হতে হবে। যদিও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা চীনের সঙ্গে বাণিজ্য প্রসারে প্রতিবন্ধক হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে এখনো চীনকে বড় উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রতি চীনের এ আস্থা ধরে রাখার জন্য কাজ করতে হবে। এজন্য চীনের বাজারে পণ্য রফতানির জন্য দেশটির চাহিদা অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ প্রয়োজন। 

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, গত দুই বছরে বাংলাদেশের জন্য ঋণের সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীন। কিন্তু ২০২২ সালে দেশটি থেকে এফডিআইয়ের নিট প্রবাহ ১১৮ শতাংশ কমে ১৮৬ দশমিক ৬১ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। ২০২১ সালে দেশটি থেকে নিট এফডিআই এসেছিল ৪০৭ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলার। এক্ষেত্রে চীনা বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য সরকার একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল বরাদ্দ দেয়ার পরও চীন থেকে মূলধন বিনিয়োগ কমে গেছে। তবে অবকাঠামোগত উন্নয়ন সম্পন্ন হলে অনেক চীনা বিনিয়োগকারী অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে বিনিয়োগ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। কারণ সরকার কয়েক বছর আগে বরাদ্দ দিলেও অর্থনৈতিক অঞ্চলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হওয়ায় বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয় বলে ব্যবসায়ীদের দাবি। চীনের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক জোনে পণ্য উৎপাদন হয়ে চীনে গেলে বাণিজ্য ঘাটতি কমে আসবে বলে দেশটি আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।

বস্তুত বাংলাদেশ সম্পর্কে চীনের মনোভাব খুব ইতিবাচক। অনেক চীনা কোম্পানি বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। এজন্য দেশটি অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা প্রত্যাশা করে। ঢাকায় অবস্থিত চীনা দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে ৬৭০ চীনা কোম্পানি তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব কোম্পানি বাংলাদেশ ও চীনের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার প্রধান চালিকাশক্তি। দেশটির দূতাবাস থেকে বাংলাদেশীদের জন্য প্রতিদিন প্রায় ৫০০ ভিসা ইস্যু করা হচ্ছে। প্রায় প্রত্যেক আবেদনকারীই ভিসা পাচ্ছে এবং তারা চীনের বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছে। দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারে এ আন্তরিকতার সদ্ব্যবহার করতে হবে। চীনের বিনিয়োগকারীরা আমাদের অর্থনীতির সম্ভাবনা ও দক্ষ জনশক্তিকে স্বীকৃতি দিতে প্রবল আগ্রহ দেখিয়েছেন। এজন্য অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার মাধ্যমে বিনিয়োগের পরিবেশ বজায় রাখার বিকল্প নেই। 

বাংলাদেশ-চীনের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধির যে সুযোগ রয়েছে, তা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, চীন ও বাংলাদেশ পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে সময়ের পরীক্ষিত বন্ধু। এ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অব্যাহত রাখতে হবে। আঞ্চলিক ও ভূরাজনীতির নানা পরিপ্রেক্ষিতে চীন-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব দীর্ঘজীবী হোক, এটি আমাদেরও প্রত্যাশা। এজন্য দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি দূরীকরণে নিরলস পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে, সেটিই একান্তভাবে কাম্য।