অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ চলছে। কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতির মুখে প্রায় থমকে গেছে দেশের অর্থনীতির চাকা। পণ্যবাহী যান চলাচল বন্ধের কারণে বাজারে বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে বাড়তে শুরু করেছে নিত্যপণ্যের দাম। চট্টগ্রাম বন্দরে রফতানি বাণিজ্যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, খালাস করা যাচ্ছে না আমদানি পণ্যও। ঘোষণার মাধ্যমে প্রায় সব কারখানা সিলগালা করা হয়েছে। জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় ও আতঙ্কে বন্ধ হয়ে গেছে অসংখ্য পেট্রলপাম্প। ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্তিমিত হয়ে পড়েছে অনলাইনভিত্তিক সব অর্থনৈতিক কার্যক্রম ও লেনদেন। সারা দেশে নগদ টাকার সংকট প্রকট রূপ নিয়েছে। আর আয়ের অভাবে নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনে নেমে এসেছে বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয়।
এদিকে দেশের অর্থনীতি দীর্ঘকাল ধরে নানা সমস্যায় জর্জরিত। এর মধ্যে আর্থিক খাতের অবস্থা সবচেয়ে বেশি শোচনীয়। তারল্য সংকট, লাগামহীন খেলাপি ঋণ, মন্দ ঋণ, ব্যাংক খাতের প্রতি মানুষের অনাস্থা প্রভৃতি সমস্যায় নিপতিত দেশের ব্যাংক খাত। বাজারের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে বাজার ব্যবস্থাপনায় নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা প্রতীয়মান হয়। অতি মুনাফার আশায় অসৎ ব্যবসায়ীরা গুদামজাত করে দ্রব্য, স্বেচ্ছাচারী হয়ে দাম বাড়িয়ে দেয়। সরকার বাজারদর বেঁধে দিয়ে, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযানে নামিয়েও পণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে। বেড়েছে সার্বিক মূল্যস্ফীতি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরজুড়ে সারা দেশে মূল্যস্ফীতির গড় হার ছিল ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ওই অর্থবছরের শেষ দিকে খাদ্য মূল্যস্ফীতি পৌঁছেছিল দুই অংকের ঘরে। এখনো দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান। পাশাপাশি রয়েছে অর্থ পাচার, ডলার সংকট ও অব্যাহতভাবে রিজার্ভ পতন, অতিরিক্ত পরোক্ষ করের মতো বিবিধ চ্যালেঞ্জ। এত সব চ্যালেঞ্জের মধ্যে কোটা আন্দোলন ঘিরে যে অস্থিরতা চলমান দেশে তা সামষ্টিক অর্থনীতির ভিতকে আরো নড়বড়ে করে তুলেছে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে যখন স্থিতিশীলতার পথে হাঁটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, এমন ক্রান্তিকালে পুরো অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার জায়গায় স্থবিরতা নেমে এসেছে। এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতির চাকা দ্রুত সচল করা প্রয়োজন। এজন্য সরকারের আশু পদক্ষেপ জরুরি। তা না হলে অর্থনীতির চরম বিপর্যয় রুখে দেয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
অর্থনীতির চাকা সচল করতে প্রথমত দ্রুত ইন্টারনেট সেবা চালু করা দরকার। ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ হওয়ায় দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সরকারের নিয়মিত ডিজিটাল সার্ভিস পুরোপুরি বন্ধ। নাগরিক সেবা, ই-নথি, ডি-নথির মাধ্যমে পরিচালিত কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে। সরকারি কার্যক্রমের বাইরে সংযোগ বন্ধ থাকায় ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল সব ধরনের ব্যবসায়িক কার্যক্রমও এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে পড়েছে। আর্থিক লেনদেন ব্যাহত হচ্ছে। কেননা দেশের সিংহভাগ মানুষই এখন অনলাইনভিত্তিক আর্থিক লেনদেনে অভ্যস্ত। বেশির ভাগ ব্যাংকেই অ্যাপসভিত্তিক ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবা চালু থাকলেও ইন্টারনেট সংযোগ না থাকায় এ সেবা এখন বন্ধ রয়েছে। যদিও ব্যাংকের এটিএম বুথ ও পজ মেশিন চলছিল। যেহেতু ইন্টারনেট ছাড়া ফাইবার অপটিক কেবলের মাধ্যমে এ দুই ব্যাংকিং পদ্ধতি পরিচালিত হয়। কিন্তু এখন এটিএম বুথেও টাকার সংকট দেখা দিয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে এমএফএস খাতের গ্রাহকরা। পাশাপাশি এ খাতসংশ্লিষ্ট এজেন্টরা। এজেন্টরা ই-মানি সুবিধা ব্যবহার করতে পারছে না। এতে এজেন্টরা ক্যাশ ইন সুবিধা পাচ্ছে না আর গ্রাহকরা পাচ্ছে না ক্যাশ ইনসহ ক্যাশ আউট সেবাও। এমএফএস পরিষেবার প্রায় অর্ধেক পরিসর বন্ধ হয়ে এসেছে ইন্টারনেট সংযোগ না থাকায়। সরকারের পক্ষ থেকে আমরা হরহামেশাই স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার অভিপ্রায়ে ক্যাশলেস সোসাইটি গড়ে তোলার কথা শুনে থাকি। কিন্তু এভাবে দিনের পর দিন ইন্টারনেট বন্ধ থাকলে কীভাবে ক্যাশলেস সোসাইটি গড়ে উঠবে? ব্যাংক বা এমএফএফ খাতে টাকা জমা রাখার ক্ষেত্রে মানুষের আস্থায় ভাটা পড়বে। এমনিতেও দেশের ব্যাংক খাতে সুশাসন না থাকায় মানুষের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে।
এছাড়া ইন্টারনেট না থাকায় অচল হয়ে পড়েছে বিভিন্ন ফ্রিল্যান্সিং প্রতিষ্ঠান। দেশের ফ্রি-ল্যান্সারদের সব ধরনের ক্রয়াদেশ ঝুঁকির মুখে রয়েছে। অথচ সরকারের লক্ষ্য ছিল ফ্রিল্যান্সিং খাত থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আয় করা। বন্ধ হয়ে পড়েছে আমদানি-রফতানির পণ্য চালানের শুল্কায়ন প্রক্রিয়াও। শুল্কায়ন ছাড়া বন্দরে কোনো আমদানি পণ্য যেমন খালাস করা যায় না, তেমনি রফতানি পণ্যও জাহাজে ওঠানো যায় না। যেহেতু এ-সংক্রান্ত তথ্য কাস্টমসের এসাইকোডা সার্ভারে অনলাইনে দাখিল করতে হয়। রিজার্ভ পতনের এ দিনগুলোয় আমদানি-রফতানি বাণিজ্য থমকে যাওয়ার ক্ষতি আদৌ কি পুষিয়ে নেয়া সম্ভব হবে কখনো?
অন্যদিকে বিভিন্ন কল-কারখানাও বন্ধ। উৎপাদনের গতি মন্থর হয়ে আছে। সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়েছে ভোগ্যপণ্যের। এতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি আরো স্ফীত করার আশঙ্কা রয়েছে। অবশ্য উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরাও বিপাকে আছেন। তারা যেমন পণ্য সরবরাহ করতে পারছেন না, তেমনি সরবরাহ কাজের সঙ্গে জড়িত কর্মীদের আয় নেই বললেই চলে। একই অবস্থায় নিমজ্জিত রিকশাচালকসহ গণপরিবহনের সঙ্গে জড়িত ড্রাইভার-হেলপাররা। নিম্নবিত্ত মানুষ, যাদের জীবিকা দিনপ্রতি আয়ের ওপর নির্ভরশীল তাদের ভোগান্তি এখন সর্বাধিক বলা যায়।
সংকটময় অর্থনীতিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে উদ্ভূত অবস্থা এক নতুন অভিজ্ঞতার জন্ম দিচ্ছে। এ সময়ে বিচক্ষণতার সঙ্গে পথ চলা আবশ্যক। এরই মধ্যে কোটা সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে। কেবল কোটা নয়, এখন সময় সব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংস্কারের পথেও অগ্রসর হওয়ার। নয়তো বর্তমানে অর্থনীতি যেসব কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। নীতিনির্ধারকদের অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় দেশে বিরাজমান অনিশ্চয়তা, অস্থিরতা দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করা উচিত, যাতে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়। এক্ষেত্রে অবশ্যই গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রয়োজন আছে। কেননা নিঃস্বার্থ শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষেই সম্ভব অর্থনৈতিক সংস্কারের মতো কঠিন পথে যাওয়া।










