একুশ শতক শুরু হওয়ার সময় বা তার আগে থেকেই একটা শব্দ খুব শোনা যাচ্ছিল—গ্লোবালাইজেশন। সহজ কথায় বাংলায় একে বলা হয় বিশ্বায়ন। অর্থাৎ বিশ্বের সবকিছু ছড়িয়ে পড়বে। এর মধ্যে আছে পণ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি থেকে শুরু করে সবই। বিশ্বায়নের বাস্তবতা আমরা এর মধ্যেই দেখেছি পণ্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে। বিশেষত এ শতকের দ্বিতীয় দশকের শুরুতে বিশ্বায়নের প্রভাব সহজে দেখা গেছে। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে আমাদের ঘরের মধ্যে এসে পড়েছিল দূর দেশের গান, সিনেমা, সংস্কৃতি এবং এসেছিল তাদের উৎপাদিত নানা পণ্য। বিবিসির খবর তো অনেক আগে থেকেই শোনা যেত, ঢাকায় সহজলভ্য হয়েছিল কেন্টাকি ফ্রায়েড চিকেনও। সাধারণ মানুষের কাছে এটাই বিশ্বায়নের এক অর্থ। কিন্তু বিশ্বায়ন যেভাবে হওয়ার কথা ছিল তা কি এখন হচ্ছে?

বিশ্বায়নের নানা রূপ আছে। সহজ কথায়, বিশ্বের মধ্যে বিনিময় সহজ হওয়া ও দূরত্ব কমে যাওয়াকে বিশ্বায়ন বলা হয়। এর মধ্যে অবশ্য বিনিময়ের পাশাপাশি গ্রহণ করার ইচ্ছাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটি অঞ্চল বিনিময় করতে চায় কিন্তু যে অঞ্চলের সঙ্গে বিনিময়ে আগ্রহী, তারা গ্রহণ করতে রাজি না—তাহলে তো বিশ্বায়ন সহজ হবে না। মূলত একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে এ বিষয়টি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। কোনো কোনো অঞ্চল গ্রহণ করতে চাইছে না, আবার কোনো কোনো অঞ্চল বিনিময়ই করতে চাইছে না। ফলে বিশ্বায়ন পড়ছে পিছিয়ে।

বিশ্বায়ন বলতে বিশ্বের মানুষের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া বাড়াকে বোঝানো হয়। তারা একে অন্যকে জানবে, বুঝবে। এক অঞ্চলের মানুষ অন্য অঞ্চলের রীতিনীতি কেবল জানবেই না, নিজেদেরও যুক্ত করবে এর সঙ্গে। কিন্তু বিশ্বায়নকে অন্যভাবেও দেখেছেন অনেকে। তাত্ত্বিকভাবে বিশ্বায়নের কিছু সংজ্ঞা আছে। মার্ক্স বলেছেন, বুর্জোয়ারা একটা ব্যবস্থা করেছে যার মাধ্যমে তারা নিজেদের পণ্য সব দেশের মানুষের কাছে বিক্রি করবে। গ্লোবাল ট্রান্সফরমেশন বইয়ে ডেভিড হেল্ড ও তার সহলেখকরা বলেন, ‘যদিও সহজে বিশ্বায়ন বলতে বোঝায় মানুষে মানুষে সম্পর্ক বিস্তৃত ও দ্রুত হওয়া, কিন্তু একে আরো বিস্তারে পরিচয় করানো প্রয়োজন। বিশ্বায়ন একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া এবং তা হয় স্থানীয়, জাতীয় পর্যায় থেকে। এ ধারাবাহিকতার এক পর্যায়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক মিথস্ক্রিয়া বিস্তৃত হয়।’

মার্ক্স ও হেল্ডের কথা থেকে একটা বিষয় নিশ্চিত হয় যে বিশ্বায়নের সঙ্গে অর্থনীতির একটা যোগসূত্র আছে। কিন্তু বিশ্বায়ন শব্দটির সঙ্গে পরিচিত সাধারণ মানুষ সে পর্যন্ত যায় না। তাদের সাদা চোখে দেখা বিশ্বায়ন অনেকটাই সংস্কৃতির বিশ্বায়ন এবং সেখানকার বিশ্বায়ন স্পষ্ট। ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ব বাংলায় হলিউডের সিনেমা আসত আর তা দেখানো হতো সিনেমা হলে। সবার সুযোগ ছিল না সে সিনেমা দেখার। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে স্যাটেলাইট টেলিভিশন, এ শতকের শুরুতে সিডি এবং এরপর ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় হলিউডের সিনেমা এ দেশে দেখা যায় মুক্তির পরদিনই। পাইরেসি ছাড়িয়ে এখন বিশ্বব্যাপী মুক্তির দিনে সিনেমা মুক্তি পায় বাংলাদেশে। বাংলাদেশের সিনেমাও মুক্তি পায় বাইরের দেশে। 

এই সিনেমা, গান কিংবা ভারতীয় সিরিয়াল কোনো না কোনোভাবে অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত। কেএফসি বা ম্যাকডোনাল্ড নিছক কোনো খাবার নয়, একটা পণ্য। সিনেমার মাধ্যমে প্রচার হয় পণ্যের। সে পণ্যের চাহিদা তৈরি হয় অন্যান্য দেশে। পণ্য বিক্রেতা দেশটিকে নিজের নতুন বাজার হিসেবে দেখে এবং খেয়াল করলেই দেখা যাবে যে এমন হাজারটা বাজার তৈরি হয়ে গেছে আমাদের দেশেও। বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করা কেবল বোঝানোর সুবিধার্থে। বিষয়টা এমন না যে পশ্চিম তার পণ্য বিক্রি করতেই আসছে আর আমরাই খরিদদার। চাইলে একই রকম না হলেও কাছাকাছি ধরনের বাজার তৈরি করার সুযোগ আছে যেকোনো দেশেরই। কিন্তু সে বাজারটা তৈরি হচ্ছে না। এর পেছনে একটা কারণ অবশ্যই শক্তিশালী বাজার ও অর্থনীতির দেশগুলোর ক্ষমতা। কিন্তু পাশাপাশি আরো একটা বিষয় কাজ করছে—আঞ্চলিকতা।

২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে আঘাত হানা কভিড-১৯ মানুষের অনেক আচরণের পাশাপাশি বদলে দিয়েছে নানা দেশের নীতিগত সিদ্ধান্তও। কভিড-১৯ যেভাবে শুরু হয়েছিল তাতে বিশ্বের অনেক দুর্যোগ মোকাবেলা বিশেষজ্ঞ এমনকি রাষ্ট্রপ্রধানরাও বলেছিলেন যে এখন প্রয়োজন সবাই মিলে এর মোকাবেলা করা। কভিডের সময় আমরা দেখেছি নানা দেশ অন্য দেশকে সহায়তা করেছে আর্থিকভাবে কিংবা প্রয়োজনীয় নানা জিনিস দিয়ে। কিন্তু কভিড-১৯ মহামারীর প্রথম দুটো প্রতিক্রিয়া ছিল প্রবাসীদের বের করে দেয়া এবং নিজ দেশকে অন্য দেশের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। মজার ব্যাপার, কভিড মহামারীর সময়কার বিষয়টি ছিল দৃশ্যমান, কিন্তু এর আগে থেকেই বিষয়টি চলছিল, কখনো অভিবাসী নেয়ার ক্ষেত্রে আর কখনো পণ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে।

২০১৯ সালের ২৪ জানুয়ারি ‘দি ইকোনমিস্ট’ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়েছিল, ‘নতুন সময়ে বিশ্ব ভিন্নভাবে চলবে। গ্লোবালাইজেশন (বৈশ্বিক অর্থনীতি সংকট বিভিন্ন দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিময় ও শান্তি বিঘ্নিত করবে। এ বিষয়টি বিশ্বায়নের বিপরীত) আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নিজস্ব জোটকে শক্তিশালী করবে। উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার সরবরাহ ব্যবস্থা আঞ্চলিক সাহায্যের পাশাপাশি যতটা সম্ভব নিজ দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হতে চাচ্ছে। এশিয়া ও ইউরোপ তাদের মহাদেশ এমনকি আরো ছোট অংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ হচ্ছে আর এ প্রবণতা শুরু হয়েছে ২০১১ সাল থেকে।’ ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসে মার্টিন উলফ লিখেছিলেন, ‘আমাদের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ থেকে আন্তর্জাতিক ব্যবসা একেবারে উবে যাবে না, তবে স্পষ্টই বাণিজ্য আরো বেশি আঞ্চলিক ও ভার্চুয়াল হয়ে উঠবে।’

কভিড-১৯-পরবর্তী সময়ে বিষয়টি একেবারে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষত এ সময় থেকেই বিশ্বে একটা নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোও যথেষ্ট সহযোগিতায় এগিয়ে আসছে না। গত শতকে যেসব ক্ষেত্রে একটি দেশ তার বন্ধুপ্রতিম দেশকে স্বাভাবিক সহযোগিতা দিত এখন সেখানে আসে নানা ধরনের শর্ত। এর বাইরে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, প্রতিটি দেশই তাদের উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার চেষ্টায় আছে। বাইরে থেকে তারা পণ্য আমদানিতে খুব একটা উৎসাহী নয়। এর আরেকটি বড় কারণ অবশ্য অর্থনৈতিক বিপর্যয়। এর আভাস আগে থেকেই ছিল, কিন্তু ২০২০ সালের কভিড-১৯ মহামারীর পর অনেক দেশেরই বেহাল অর্থনীতি নগ্নভাবে ধরা পড়েছে।

এছাড়া বেশকিছু কারণ আছে। তার মধ্যে একটি হলো উগ্র জাতীয়তাবাদ। এশিয়ার অনেক দেশেই দেখা যাচ্ছে জাতীয়তাবাদ খুব বেশি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। কেবল দেশের নীতিনির্ধারক নয়, দেশের জনগণও অন্য দেশকে বা জাতীয়তাকে ভালো চোখে দেখছে না। বিশ্বায়নের একটা বড় জায়গা হলো মানুষের প্রতি মানুষের সহযোগিতা ও সহমর্মিতা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এ শতকের শুরুতে যে সাংস্কৃতিক বিশ্বায়ন হয়েছিল এবং মানুষ পরিচিত হয়েছিল দূর বিশ্বের মানুষের আচার-আচরণের সঙ্গে, তা এখন খুব একটা কাজ করছে না। বিভিন্ন দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে দেখা যাচ্ছে সহমর্মিতার অভাব। তারা হেয় করছেন অন্য দেশের সংস্কৃতিকেও।

শরণার্থী সমস্যা বিশ্বের অন্যতম পুরনো বিষয়। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে এ বিষয়টি আরো বেড়েছে। টুইন টাওয়ারে হামলার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীদের প্রতি এক ধরনের অবিশ্বাস এসেছিল। সেখানে ধর্ম ও দেশ একটা বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছিল, কিন্তু এ সময়ে ইউরোপে শরণার্থী সংকট রীতিমতো একটা রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে। সেখানে কোনো দেশই যেন কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। শরণার্থী গ্রহণ না করা বা তাদের চাপ সামলানোর সক্ষমতা না থাকা একটি বিষয়, কিন্তু কোনো কোনো দেশ রীতিমতো শরণার্থীদের দেশ, জাতীয়তার বিরুদ্ধেই কথা বলছে। ইউরোপে সাম্প্রতিক উগ্র ডানপন্থার উত্থান এ বিষয়কে আর কত দূরে নিয়ে যাবে তা বর্তমান বিশ্বের একটা নতুন প্রশ্ন।

গ্লোবালাইজেশনের পর আরেকটি কথা জনপ্রিয় হয়েছিল—গ্লোবাল ভিলেজ। সংস্কৃত ‘ভসুদেইবা কুটুম্বকুম’ অর্থাৎ ‘পুরো বিশ্বই একটা পরিবার’ কথাটি যেন নতুন করে ফিরেছিল। সে রকম একটা অবস্থা তৈরিও হয়েছিল, কিন্তু তারপর হঠাৎই যেন ভেঙে পড়ল সবকিছু। ২০০৮-০৯ সালের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পর থেকে পৃথিবীর বাণিজ্য ব্যবস্থা অনেকটা বদলে গেছে। এ সময়ের পরপর স্মার্টফোনের সর্বব্যাপী প্রভাব বিশ্ব ও তার মানুষকে যুক্ত করেছিল সহজে, কিন্তু তাদের মনে আগের মতো সহমর্মিতা ছিল না। ২০০০-০৮ পর্যন্তও (গ্লোবাল ভিলেজ নিয়ে সে সময় বেশ আবেগ ও আশা দেখা গিয়েছিল) কিছুটা মমত্ববোধ ও পরমতসহিষ্ণুতা ছিল যা এখন অনুপস্থিত। প্রযুক্তি যেখানে যুক্ত করবে সেখানে ঘৃণা ছড়ানো, তথ্যের অবাধ প্রচারের মধ্যে ভুল তথ্য প্রচার বড় হয়ে উঠল এবং মানুষ হয়ে উঠল বিচ্ছিন্ন।

অর্থনৈতিক সংকট আসার সঙ্গে বাধা এসেছে সংস্কৃতির বিশ্বায়নেও। উগ্র জাতীয়তাবাদ বয়কট করছে সিনেমা, বই এমনকি ব্যক্তিকেও। হলিউডের সিনেমার অন্যতম বাজার চীন। কিন্তু বিগত কয়েক বছর চীনে নিষিদ্ধ হলিউডের বহু সিনেমা এমনকি যেগুলো মুক্তি পাচ্ছে তাও পড়ছে সেন্সরে। এর বাইরে চীন, কোরিয়ার মতো আরো অনেক দেশ নিজেদের মধ্যেই সবকিছু সীমাবদ্ধ করে ফেলছে। এদিকে উত্তর ভারত ও দক্ষিণ ভারতের চিন্তা ও কর্মের ফারাক বহু পুরনো। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, এক অংশের সংস্কৃতি অন্য অংশ গ্রহণ করতে অনাগ্রহী। অর্থাৎ কেবল বৈশ্বিক পর্যায়ে না, জাতীয় পর্যায়েও দেশের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে বড় হয়ে উঠছে অঞ্চল। আর শুধু ভারত নয়, ইউরোপের সামষ্টিক আচরণের মধ্যে এখন দেখা যাচ্ছে আঞ্চলিকতা। একই কথা প্রযোজ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ আরো অনেক ক্ষেত্রে। অথচ আশা ছিল গ্লোবাল ভিলেজের। তাই স্বাভাবিকভাবেই মনে হয় বৈশ্বিক হওয়ার বেলায় আরো বেশি আঞ্চলিক হয়ে পড়ছে বিশ্ব।

মাহমুদুর রহমান: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা