কৃষি সমবায় কৃষকদের আর্থিক ও সামাজিক উন্নয়নের অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বিশেষত কৃষিপণ্য বিপণনে কার্যকরী কৃষি সমবায় কৃষকদের জন্য উৎপাদিত পণ্যের উচ্চতর মূল্য নিশ্চিত করতে এবং তাদের জীবনমান উন্নতির জন্য খুবই সহায়ক। 

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে কৃষিপণ্য বিপণন ব্যবস্থা একটি আলোচিত বিষয়। দেশে কৃষিপণ্য বিপণনে নতুন ধারণা, ‘‌কৃষিপণ্য একত্রীকরণ মডেল’ যা ‘‌কৃষি সমবায়’ নামে পরিচিত হয়ে উঠছে। ‘‌কৃষিপণ্য একত্রীকরণ মডেল’-এর মাধ্যমে কৃষকরা নিজেদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য সরাসরি ক্রেতাদের হাতে তুলে দিতে পারছে। ফলে একদিকে যেমন উৎপাদিত কৃষিপণ্যের অপচয় হ্রাস পাচ্ছে তেমনি অন্যদিকে ভোক্তারাও নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী কৃষিপণ্য কিনতে পারবে। এই মডেলের মাধ্যমে বিক্ষিপ্তভাবে ছডিয়ে থাকা কৃষকদেরও একত্র করা সম্ভব, যার মাধ্যমে তারা কৃষি থেকে বেশি আয় করে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

কৃষি খাতের একটি অন্যতম সমস্যা হলো কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য ন্যায্য দামে বিক্রি করতে না পারা। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য জমি থেকে ক্রেতা পর্যন্ত পৌঁছানোর পথে বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী, যেমন পাইকার, বেপারি, আড়তদার, ফড়িয়া, খুচরা বিক্রেতা ইত্যাদির দ্বারস্থ হতে হয়। কৃষক তাদের অধিকাংশ সময় ফসল উৎপাদনের পেছনে ব্যয় করলেও উৎপাদনের পরবর্তী ধাপগুলো, যেমন ফসল সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ, বিতরণ এবং বিপণন মূলত বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভর করতে হয়। এ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে মধ্যস্থকারীরা তাদের লাভের অংশ যোগ করে, ফলে পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়, ফলে একদিকে ক্রেতাকে বেশি দামে কিনে খেতে হয়, অন্যদিকে লাভের একটি বড় অংশ কৃষকের কাছে পৌঁছায় না। এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণের উপায় হতে পারে কৃষি সমবায় বিপণন ব্যবস্থা বা ‘‌কৃষিপণ্য একত্রীকরণ মডেল’-এর বাস্তবায়ন। এ বিপণন পদ্ধতি কৃষকদের একত্র করে তাদের সামগ্রিক বাজারজাত ক্ষমতা বাড়ায়। এ পদ্ধতিতে কৃষকরা তাদের পণ্যের বিপণন, পরিবহন ইত্যাদি নিজেরাই সম্পন্ন করতে পারবে বলে আর্থিক লাভের পরিমাণ বাড়াবে। 

কৃষিপণ্য একত্রীকরণ মডেল কৃষকদের জন্য একটি সম্ভাবনার দ্বার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। বর্তমান সরকার দেশের কৃষকদের জীবনযাত্রার উন্নয়নের লক্ষ্যে সারা দেশে বেশ কয়েকটি কৃষি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল স্থাপন করেছে, যা কৃষিপণ্য বিপণনের সমবায় ব্যবস্থাকে নতুন গতি দিয়েছে। এখানে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্য একত্র করে সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রি করে থাকে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কৃষি সমবায় ধারণা অনুসরণ করে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তাদের কৃষক এবং কৃষি দুটির উন্নতি করে চলছে। নেদারল্যান্ডসের সবজি বাজারের প্রায় শতভাগই এ সমবায় ধারণা কাজে লাগিয়ে বিক্রি হয়। জাপানের প্রায় ৭০ শতাংশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২৩ শতাংশ কৃষিপণ্য বিপণনে এ সমবায় ধারণাকে প্রাধান্য দেয়া হয়। এছাড়া ডেনমার্ক, সুইডেন ও জার্মানির মতো দেশগুলো সমবায় গঠনের মাধ্যমে তাদের কৃষি বিপণন ব্যবস্থার উন্নতি ঘটিয়ে চলেছে। তানজানিয়া, নাইজেরিয়া এবং উগান্ডার মতো স্বল্পোন্নত দেশও এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের কৃষি অর্থনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন সৃষ্টি করছে। 

বাংলাদেশের কৃষি খাতে এখন একটি বিপ্লবের সময় এসেছে, যার উদ্ভাবনী ধারা হতে পারে সমবায়ভিত্তিক বিপণন পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে কৃষকরা নিজেরাই তাদের উৎপাদিত পণ্যের জন্য একটি শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ এবং স্বাবলম্বী বাজার স্থাপন করতে পারবে। এটি কেবল তাদের পণ্য উৎপাদন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখবে না, বরং কৃষক নিজেরা বিপণনের দায়িত্ব নিয়ে ব্যবসায়ী বা ভোক্তাদের কাছে সঠিক মূল্যে তাদের পণ্য বিক্রি করা করতে পারবে। এ পদ্ধতির মূল লক্ষ্য হলো, কৃষকদের মধ্যে একটি সংঘবদ্ধ শক্তি তৈরি করা, যাতে তারা তাদের উৎপাদিত পণ্যের যথার্থ মূল্য নিশ্চিত করতে পারে। এটি কৃষকদের আর্থিক স্বাবলম্বিতা বাড়াবে, বাজারের চাপ ও অনিশ্চয়তা মোকাবেলা করার ক্ষমতা বাড়াবে এবং মধ্যস্থতাকারীদের দ্বারা সৃষ্ট অতিরিক্ত খরচ কমাবে।

দেশের প্রতিটি অঞ্চলের কৃষকদের যদি কৃষি সমবায়ের আওতায় নিয়ে আসা যায়, তাহলে তারা যেমন ন্যায্য মূল্য পাবেন ঠিক তেমনি ক্রেতারাও সঠিক দামে তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য দ্রব্যাদি ক্রয় করতে পারবে। কয়েক বছর ধরে কৃষিপণ্যের বাজারে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। কখনো বেড়ে যাচ্ছে পেঁয়াজের দাম, কখনো-বা বাড়ছে আলুর দাম। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে অন্যান্য কৃষিপণ্যের দাম। শীতকালে ভরা মৌসুমেও সবজির বাজারে দাম বেড়েই চলেছে। বাজারের এ দামের মানেই যে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন, তা নয়। দেশের প্রান্তিক কৃষকরা ঠিকই নামমাত্র মূল্যে তাদের কষ্টে উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে দিচ্ছেন এবং দিন শেষে তারা তাদের ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়েই পরবর্তী ফসল উৎপাদন শুরু করছেন। কিন্তু এ কৃষকরা যদি কৃষি সমবায়ের মাধ্যমে বাজার ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনা করে কাঙ্ক্ষিত পণ্যটি চাষ করে নিজেরাই বিক্রি করে তাহলে বাজারের অস্থিতিশীলতা কম হওয়ার পাশাপাশি কৃষকের মুখে ফুটবে হাসি।

আমাদের দেশের কৃষি খাতের অধিকাংশ কৃষক বাজারের গতিবিধি সম্পর্কে অজ্ঞ, যা তাদের ফসল উৎপাদন ও বিপণন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করে। যখন কোনো এক বছর একটি নির্দিষ্ট ফসলের দাম বাজারে বেশি থাকে, তখন পরের বছর প্রায় সব কৃষকই সেই ফসল চাষে ঝুঁকে পড়েন। এ প্রবণতার ফলে ফসলের উৎপাদন মাত্রাতিরিক্ত হয়ে যায়, যা বাজারে ফসলের দাম হ্রাস করে এবং কৃষকদের প্রত্যাশিত মুনাফা অর্জন হয় না। ফলে পরবর্তী বছর কৃষকরা সেই ফসল চাষ কমিয়ে দেন, যা বাজারে পুনরায় অস্থিরতা সৃষ্টি করে। এ চক্রীয় অস্থিরতার সমাধানে কৃষি সমবায়ের আওতায় কৃষকদের নিয়ে আসা এবং তাদের তিন-চার বছরের বাজার ব্যবস্থার সঠিক তথ্য প্রদান করা গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে কৃষকরা বুঝতে পারবেন কোন সময়ে কোন পণ্যের দাম কীভাবে পরিবর্তন হয় এবং কোন ফসলের উৎপাদন তাদের জন্য লাভজনক। এ জ্ঞানের ভিত্তিতে কৃষকরা তাদের ফসল বিক্রি করে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা অর্জন করতে পারবেন। একই সঙ্গে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের উৎপাদন বাজারে সৃষ্টি হওয়া অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সমাধান করবে বলে আশা করা যায়। সমবায়ভিত্তিক উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষকরা নিজেদের উৎপাদনের পরিকল্পনা আরো বুঝে-শুনে এবং বিজ্ঞানসম্মতভাবে করতে পারবেন, যা বাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিতের পাশাপাশি কৃষকদের আর্থিক উন্নতি ঘটাবে। 

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুসারে, পেঁয়াজ, কুমড়া, ফুলকপি, ব্রকলি, আলু, চাল ইত্যাদি প্রায় ২২টি কৃষিপণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষ দশে অবস্থান করছে। বাংলাদেশের মতো ছোট দেশের জন্য বড় অর্জন। কিন্তু এ অর্জনের পেছনে যাদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি তারাই প্রতিনিয়ত দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে পতিত হচ্ছে। বর্তমান সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমুখী কর্মকাণ্ডে আমরা উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরিত হচ্ছি কিন্তু অন্যান্য শিল্পের উন্নতি সাধনের পাশাপাশি দেশের প্রধান চালিকাশক্তি কৃষিকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। কৃষি খাত একদিকে যেমন দেশের মানুষের খাদ্যের জোগান দেয়, ঠিক তেমনই বিভিন্ন শিল্প-কারখানার কাঁচামালের উৎস এ কৃষি খাতে উৎপাদিত পণ্য। দেশের সামগ্রিক কল্যাণে এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে আরো উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যেতে কৃষকদের সামগ্রিক উন্নয়নের কথা বিবেচনা করতে হবে।

এ দেশের কৃষকরা যেমন আর্থিকভাবে অসচ্ছল, ঠিক তাদের জ্ঞানের ভাণ্ডারও সীমিত। আমাদের দেশের অধিকাংশ কৃষকই তার সহযোগী কৃষক বা কীটনাশক দোকানদারের পরামর্শ নিয়ে তাদের চাষাবাদ পরিচালনা করে। এছাড়া অধিকাংশ প্রান্তিক কৃষকের নেই নিজস্ব চাষের জমি। ফলে তারা চাইলেও নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী ফসল উৎপাদন করতে পারেন না। দেশের এ প্রান্তিক ও অসচ্ছল কৃষকদের একত্র করে একটি সমবায় গঠনের মাধ্যমে যদি তাদের বীজ, কীটনাশক, ট্রাক্টরসহ অন্য সুযোগ-সুবিধা ও বিভিন্ন ভর্তুকি লাভের ব্যবস্থা করে দেয়া হয় তাহলে তারা সুষ্ঠুভাবে তাদের চাষাবাদ পরিচালনা করতে পারবে। সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলো এ উদ্যোগে সহায়তা প্রদান করতে পারে যাতে কৃষকরা আধুনিক বিপণন কৌশল, পণ্য সংরক্ষণ এবং পরিবহন প্রযুক্তির ওপর প্রশিক্ষণ পেতে পারে। এছাড়া কৃষিপণ্যের মান বজায় রাখা এবং বাজারে পণ্যের প্রচারের জন্য ডিজিটাল প্লাটফর্মের ব্যবহার এ পদ্ধতিকে আরো কার্যকর করতে পারে।

সমবায়ের আওতাভুক্ত কৃষকরা নিজেদের মধ্যে ঐক্য ও সচেতনতাবোধ সৃষ্টি করে তাদের কৃষিপণ্য বিপণন করে। এতে করে ফসল বিক্রির সময় প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশেই কমে যায়। সমবায়ের মাধ্যমে পণ্য বাজারজাত করে কৃষকরা তাদের পণ্য পরিবহন, গুদামজাত, বাছাই করা, প্যাকেজিং ইত্যাদির খরচ হ্রাস করতে পারে। বিভিন্ন ধরনের কৃষি ঋণ প্রাপ্তির জন্য কৃষি সমবায় সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। বাজারে কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের প্রকৃত চাহিদা, বাজারমূল্য ও ভবিষ্যৎ চাহিদা-সংক্রান্ত তথ্য খুব সহজে সমবায় কৃষির মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব। 

বাংলাদেশের কৃষিপণ্য বিপণনের ক্ষেত্রে পণ্য সরবরাহ ও প্রকৃত চাহিদার মধ্যে রয়েছে অসংগতি। বর্তমানে এই সেক্টরের উন্নতি করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের উচিত কৃষি সমবায়ের উন্নয়নে আরো বেশি মনোযোগ দেয়া এবং এর মাধ্যমে কৃষকদের সামগ্রিক উন্নতি সাধনের জন্য প্রযোজ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা। সমবায় মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষি সমবায় সমিতির কাঠামোগত পরিকল্পনা করা যেতে পারে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকারের সমন্বয়ের মাধ্যমে বেসরকারিভাবে চলমান বাজার ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। একটি সমন্বিত ও স্বাবলম্বী কৃষি বিপণন পদ্ধতির মাধ্যমে কৃষকরা তাদের পণ্যের সঠিক মূল্য আদায় এবং আর্থিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের পাশাপাশি দেশের কৃষি খাতে একটি ব্যাপক বিপ্লব ঘটাতে পারে। এ পদ্ধতির বাস্তবায়ন কেবল কৃষকদের জীবনমান উন্নতি করবে না, বরং দেশের কৃষি উৎপাদন ও বিপণন প্রণালিকে আরো দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে। সর্বোপরি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কৃষকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কৃষি সমবায় ধারণা একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন বয়ে আনতে পারে।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম: কৃষি ব্যবসা ও বিপণন বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

মো. আসিফ ইকবাল: সহকারী গবেষক, কৃষি ব্যবসা ও বিপণন বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ