কোনো দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে সাশ্রয়ী ও তুলনামূলক নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ বিবেচনায় রেলপথের নাম সবার আগে চলে আসে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে ট্রেন একটি জনপ্রিয় পরিবহন। আর আমাদের মতো সীমিত সম্পদ কিন্তু জনসংখ্যার আধিক্যের দেশে ট্রেন কেবল জনপ্রিয়ই নয়, গণপরিবহন হিসেবে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। যাতায়াত, মালামাল পরিবহন থেকে শুরু করে কর্মসংস্থানের অন্যতম মাধ্যম রেল খাত। অবশ্য অস্বীকার করার অবকাশ নেই যে দুর্নীতিগ্রস্ত অন্যতম খাতও এটি। তাই বছরের পর বছর ধরে গুনতে হচ্ছে লোকসান। স্বাভাবিক সময়ে ট্রেনে কত মানুষ যাত্রা করে সে হিসাব বাদ দিলেও খোলা চোখে ঈদে দেখা যায় মানুষের ঢল। ট্রেনের বগি থেকে শুরু করে ছাদ মানুষে টইটম্বুর থাকে। যে দেশে ট্রেন সর্বস্তরের আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী ও বহুল ব্যবহৃত গণপরিবহন, সেই রেল খাতে কেন বছরের পর বছর লোকসান টানতে হচ্ছে, আর্থিক চাপে হিমশিম খেতে হচ্ছে—এ প্রশ্নের উত্তর খুব একটা জটিল নয়।

সম্প্রতি লোকসান কমাতে রেলযাত্রায় ১০০ কিলোমিটারের অতিরিক্ত দূরত্বে রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে, যা কার্যকর হবে আগামী ৪ মে। এ বিষয়ে তারা একটি গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দূরত্বভিত্তিক রেয়াতি সুবিধায় ৩২ বছর ধরে মূল ভাড়ায় ১০১-২৫০ কিলোমিটার ভ্রমণে ২০ শতাংশ, ২৫১-৪০০ কিলোমিটারে ২৫ ও ৪০১ কিলোমিটার বা এর বেশি দূরত্বের জন্য ৩০ শতাংশ ছাড় দিয়ে আসছিল বাংলাদেশ রেলওয়ে। আর্থিক চাপ ও লোকসান কমাতে এখন এ সুবিধা প্রত্যাহার করে নিচ্ছে রেলওয়ে। এছাড়া ভাড়া বাড়ানো হচ্ছে ট্রেনে অতিরিক্ত সংযোজিত কোচ ও আবেদনের মাধ্যমে রিজার্ভকৃত টিকিটেরও। উল্লেখ্য, এর আগে ২০১২ সালে ৫০ শতাংশ এবং ২০১৬ সালে সাড়ে ৭ শতাংশ ভাড়াও বাড়িয়েছে রেলওয়ে। ২০১২ সালে সেকশনাল রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়। স্বভাবতই এখানে প্রশ্ন চলে আসে, সে সময় ভাড়া বাড়ানোর ফলে কি রেল খাতের লোকসান কমে আয় বেড়েছিল? তথ্য-উপাত্ত বলছে—না। 

স্বাধীনতার পর দেশের জনসংখ্যা বাড়লেও রেলের পরিধি সে তুলনায় তেমন একটা বাড়েনি। এমনকি রেলের সেবাও তেমন বিস্তৃত করা হয়নি। ফলে যাত্রীসংখ্যা ও চাহিদা অনুসারে পরিবহন সেবা দিতে সমর্থ নয় রেল খাত। ক্রমাগত প্রায় ২৬ বছর ধরে লোকসান দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। তাদের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০-২১ সালে লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা এবং সংস্থাটির অপারেটিং রেশিও বা পরিচালনা ব্যয় ও মোট আয়ের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ২৭৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ। অথচ ২৬ বছর আগেও বাংলাদেশ রেলওয়ে ছিল একটি লাভজনক সংস্থা। যাত্রী ও পণ্য পরিবহন করে সংস্থাটি যে টাকা আয় করত, তা দিয়ে ট্রেন পরিচালনার সব ব্যয় মেটানোর পরও কিছু টাকা উদ্বৃত্ত থাকত। ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছর সংস্থাটিতে এমন উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা। ওই অর্থবছর সংস্থাটির অপারেটিং রেশিও ছিল ৯৫ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ ওই অর্থবছরে প্রতি ১ টাকা আয় করতে গিয়ে রেলওয়ের ব্যয় হয়েছিল ৯৫ দশমিক ৯ পয়সা। পরবর্তী সময়ে অপারেটিং রেশিওর এ হার আর ধরে রাখতে পারেনি সংস্থাটি। বর্তমানে প্রতি ১ টাকা আয় করতে গিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের খরচ হচ্ছে প্রায় ২ টাকা ৭৮ পয়সা। বিশেষজ্ঞদের মতে, আয়-ব্যয়ের এ ক্রমবর্ধমান ফারাকের কারণ মূলত দুর্নীতি এবং অদক্ষ ব্যবস্থাপনা। রেলের দুর্নীতি-অনিয়ম বন্ধ ও রেলের সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে এ লোকসান আগামীতে আরো বাড়তে থাকবে। 

যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনায় বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির পাশাপাশি বাংলাদেশ রেলওয়ের অনিয়ম-দুর্নীতির একাধিক খাত চিহ্নিত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। খাতগুলো হলো সম্পত্তি ইজারা ও হস্তান্তর, অবৈধ স্থাপনা তৈরি, কেনাকাটা, ভূমি অধিগ্রহণ, যন্ত্রাংশ নিলাম, টিকিট বিক্রি, ট্রেন ইজারা, ক্যাটারিং ইত্যাদি। দুর্নীতি বন্ধ করা গেলে ট্রেন পরিচালনার ব্যয় ও আয়ের মধ্যে ব্যবধান অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি বিদ্যমান সম্পদগুলো সুষ্ঠু ব্যবহার করে রেলকে সহজেই লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সম্ভব। বিদ্যমান অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। একই সঙ্গে কাজ করতে হবে সেবার মান বাড়ানোর। কেবল রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহারের মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়ালেই রেলওয়ে লোকসান ঠেকাতে পারবে বলে মনে হয় না। উল্টো স্বল্প আয়ের জনগণের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে। 

প্রতিবেশী দেশ ভারতের রেল খাত একসময় লোকসানে ছিল। দেশটি তাদের জনপ্রিয় রেল রুটে কোচের সংখ্যা বাড়িয়ে এবং অজনপ্রিয় ট্রেনের ভাড়া কমিয়ে ও সেবা বাড়ানোর মাধ্যমে রেল খাতকে লাভে নিয়েছে। এ পন্থা আমাদের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে। বাড়তি ভাড়া গুনতে হলে সাধারণ জনগণ ট্রেনবিমুখ হয়ে পড়লে ট্রেনের লোকসান বৈ লাভ হবে না। 

তবে যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি রেলকে লাভজনক করতে মালামাল পরিবহনেও গুরুত্ব দিতে হবে। মালবাহী একটি ট্রেনের ব্যয় যাত্রীবাহী ট্রেনের তুলনায় দ্বিগুণের কম হয়। ভারতীয় রেলের মোট আয়ের ৭০ শতাংশের বেশি আসে পণ্য পরিবহন থেকে। পণ্য পরিবহনের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেয়া দরকার। বাংলাদেশ রেলওয়ের আয়ের প্রধান খাত যাত্রী পরিবহন। মোট আয়ের ৬০ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে। অন্যদিকে সংস্থাটির মোট আয়ের ২০ শতাংশ আসে পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে। জমি ইজারা, ক্যাটারিংসহ বিবিধ খাত থেকে আসে অবশিষ্ট আয়। বিপরীতে সংস্থাটির পরিচালন ব্যয়ের সবচেয়ে বড় খাত ইঞ্জিন-কোচ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ। মোট ব্যয়ের ৩০ শতাংশের বেশি হয় এ খাতে। এর বাইরে মোট ব্যয়ের প্রায় ১৭ শতাংশ জ্বালানি তেল খাতে, প্রায় ১২ শতাংশ কর্মীর বেতন-ভাতা খাতে, প্রায় ৯ শতাংশ প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা খাতে এবং প্রায় ২৯ শতাংশ ব্যয় হয় বিবিধ খাতে।

যদিও গত আড়াই দশকে মোটা অংকের বিনিয়োগ পেয়েছে রেল খাত। রেলওয়ে বিভাগকে উত্তীর্ণ করা হয় মন্ত্রণালয়ে। ২০০৯-এর জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা হয় ৮৩টি উন্নয়ন প্রকল্প। এতে ব্যয় হয় ২০ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। যদিও এ বিপুল ব্যয় সংস্থাটিকে লাভজনক করতে পারেনি। উল্টো বছর বছর বড় হয়েছে লোকসানের পরিমাণ। ‘বাংলাদেশ ইকোনমিক রিভিউ ২০২৩’-এর তথ্যমতে, ২০২০-২১ বছরে সব মিলিয়ে ২ হাজার ১০২ কোটি টাকা লোকসান করেছে সংস্থাটি।

বিপুল বিনিয়োগের পরও কেন লোকসান দূর হয় না, প্রকল্পগুলোর ফাঁকফোকর কোথায় তা তদন্ত করে খুঁজে বের করা দরকার এবং সে মোতাবেক কাজ করতে হবে। দুর্নীতিকারীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিকল্পনা কমিশনকে প্রকল্পগুলোর সমন্বয়ে জোর দেয়া প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ পর্যন্ত রেল খাতের অনেক উন্নতি সাধন হয়েছে। তবে ক্রমবর্ধমান লোকসান কমাতে ব্যর্থ হলে সব উন্নতি অকার্যকর হিসেবে বিবেচনা করা ছাড়া উপায় থাকবে না।