চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির আঘাতে জর্জরিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। সম্পূর্ণ বাজার ব্যবস্থা সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে আছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বাজারমূল্যের ক্ষেত্রে পাইকারি ও খুচরা বাজারের মধ্যে পার্থক্য লক্ষণীয়, এক্ষেত্রে অভিযান চালিয়েও কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না। চক্রাকারে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়েই চলেছে। আলু, পেঁয়াজ ও ডিমের বাজারে অস্থিতিশীলতা এখনো অব্যাহত আছে। সব মিলিয়ে দেশে খাদ্যপণ্যে স্মরণকালের সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি দৃশ্যমান, অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারতে পাইকারি বাজারে মূল্যসূচক ধারাবাহিকভাবে কমছে।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, ভারত সরকার খুচরা ও পাইকারি দরের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন পণ্যের পৃথক মূল্যসূচক প্রকাশ করে। দেশটিতে গত পাঁচ মাস পাইকারি পণ্যে মূল্যস্ফীতির হার রয়েছে ঋণাত্মক পর্যায়ে। অন্যদিকে বাংলাদেশে ক্রমাগত খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে। হুট করেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে আলু, পেঁয়াজ, ডিমসহ বিভিন্ন পণ্যের বাজার। এতে প্রভাবক হিসেবে পাইকারি ব্যবসায়ী বা আড়তদাররাই মূলত ভূমিকা রাখছেন বলে খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন। এসব কারণেই সর্বশেষ দুই মাস আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১২ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা গত সাড়ে ১১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
ভারতের মিনিস্ট্রি অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি থেকে প্রকাশিত ‘হোলসেল প্রাইস ইনডেক্স’-এ দেখা যায়, দেশটিতে গত ছয় মাসের মধ্যে পাইকারি পণ্যে সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি ছিল মার্চে, ১ দশমিক ৪১ শতাংশ। যদিও এর পরের মাস এপ্রিলেই তা ঋণাত্মকে নেমে যায়। ওই মাসে পাইকারি পণ্যে মূল্যস্ফীতি ছিল ঋণাত্মক বা মাইনাস শূন্য দশমিক ৭৯ শতাংশ। এছাড়া মে মাসে ঋণাত্মক ৩ দশমিক ৬১, জুনে ঋণাত্মক ৪ দশমিক ১৮, জুলাইয়ে ঋণাত্মক ১ দশমিক ৩৬ ও আগস্টে পাইকারি পণ্যে মূল্যস্ফীতি ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ৫২ শতাংশ ছিল। এ সূচক নির্ধারণে খাদ্যপণ্য, উৎপাদন খাতসংশ্লিষ্ট পণ্য এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংশ্লিষ্ট পণ্যের পাইকারি দাম বিবেচনায় নেয়া হয়।
কিন্তু বাংলাদেশের চিত্রটা তার ঠিক উল্টো। আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৯২ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে অবশ্য তার তুলনায় কিছুটা কমেছে। শূন্য দশমিক ২৯ পয়েন্ট কমে গত মাসে মূল্যস্ফীতি হয় ৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ। সেপ্টেম্বর ও আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল যথাক্রমে ১২ দশমিক ৩৭ ও ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ। মূলত পাইকারি বাজারের সিন্ডিকেটের কারণেই বিভিন্ন পণ্যের দাম অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে দেখা গেছে। কোনো কারণ ছাড়াই আলু, পেঁয়াজ বা মরিচের দাম বেড়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি ডিমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মাছ-মুরগির দাম বেড়েছে। এসব কারণে সরকারিভাবে বিভিন্ন পণ্যের মূল্যও বেঁধে দেয়া হয়। কিন্তু বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। খোদ বাণিজ্যমন্ত্রী এ বিষয়টি স্বীকার করেছেন। এক্ষেত্রে মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে খুচরা বিক্রেতাদের জরিমানা করা হলেও সিন্ডিকেট সদস্যরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
অতিমুনাফার জন্য ব্যবসায়ীদের দোষারোপ করা হলেও তারা এটি সাময়িক বলে গণ্য করছেন। ব্যবসায়ীদের দাবি, ডলার ও ঋণপত্র (এলসি) সংকট, ডলারের উচ্চমূল্যসহ বিভিন্ন জটিলতায় ব্যবসায়ীরা চাহিদামতো আমদানি করতে পারছেন না। বড় শিল্পগুলোর প্রতি সরকারি পর্যায় কিংবা ব্যাংক থেকে সহায়তার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়া হলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের আমদানিতে বেগ পেতে হচ্ছে। ফলে সংকটকালীন চাহিদা ও জোগান সংকটের কারণে বড় পাইকার কিংবা আমদানিকারক পর্যায়ে অতিমুনাফা করা হচ্ছে। আগের লোকসান পুষিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে এটা ব্যবসায়িক দৃষ্টিতে অন্যায্য নয় বলেও দাবি ব্যবসায়ীদের।
কিন্তু এ অতিমুনাফার কোনো অংশই উৎপাদনে সরাসরি জড়িত কৃষক পান না। এক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীরাই সম্পদের পাহাড় গড়ছেন। আবার আমদানির খরচ বৃদ্ধির বিষয়টিকেও দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা। মূল সংকট দূর না করে নিত্য ভোগ্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতি রোধ করা সম্ভব নয় বলে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের দাবি। মূলত বাজার অর্থনীতিতে কখনো লাভ হবে আবার কখনো লোকসান হবে, এটাই স্বাভাবিক। লাভের বিষয়টি একান্তই ব্যবসায়ীদের, অন্যদিকে লোকসানও তাদের হয়। এছাড়া বর্তমান মৌসুমে স্বাভাবিকভাবেই কৃষিপণ্যের দাম একটু বেশি থাকে। তবে অস্বাভাবিক দামের ক্ষেত্রে বাজার নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি অবশ্যই নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের গুরুত্বের দাবি রাখে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর চেষ্টা ও অসহায়ত্ব দুটোই প্রকাশ পাচ্ছে, যা দৃশ্যত কোনো সুসংবাদ বয়ে আনে না। এভাবে হার মেনে নিলে তা সাধারণ জনগণের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। তাই যেকোনো মূল্যে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রণোদনার ব্যবস্থাও করতে হবে। মোদ্দাকথা, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। এজন্য কৃষি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কঠোর পদক্ষেপের বিকল্প নেই। আমরা প্রত্যাশা করব নিম্নবিত্ত মানুষের দুর্ভোগের কথা ভেবে সরকার সময়োপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থাপনার ভিত্তিতে বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় থাকুক, এটিই আমাদের কাম্য।










