বাংলাদেশের কমপ্যারেটিভ অ্যাডভান্টেজ বা তুলনামূলক সুবিধা কী? অনেক বিশেষজ্ঞ এবং গণমাধ্যমের মতে, সস্তা শ্রম বাংলাদেশের প্রাথমিক তুলনামূলক সুবিধা। সস্তা শ্রমিকরাই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পের অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধির পেছনের কারিগর। এতে শুধু লাখ লাখ নারী শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়নি, তার সঙ্গে বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জিত হয়েছে। কিন্তু সস্তা শ্রমের আরেক নাম হলো দারিদ্র্য। ৪০ বছর ধরে সস্তায় তৈরি পোশাক উৎপাদন করার পর এখনো কি তা কাম্য?
সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভরশীল প্রবৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত নয়, স্থিতিশীলও নয়। যদি আমরা কেবল সস্তা শ্রমের ওপরই নির্ভর করি, তাহলে দেখা যাবে অন্য কোনো দেশ আরো সস্তা মজুরি দিয়ে আমাদের থেকে কাজ ছিনিয়ে নেবে। যদি গৃহযুদ্ধ না হয়ে থাকত, তাহলে বাংলাদেশের পরিবর্তে হয়তো শ্রীলংকা তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য বিশ্বের শীর্ষ পছন্দের জায়গা হতে পারত। ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, এক সময়ে ব্রিটেনের বস্ত্র উৎপাদন শিল্প তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়ের দেশ জাপানে স্থানান্তরিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে জাপান তার বাজার আরো নিম্ন খরচের দেশ যেমন চীন, বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের কাছে হারায়। শ্রমিকের ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমনির্ভর উৎপাদন আরো সস্তা শ্রমের দেশে সরে যায়। বাংলাদেশ এ প্রক্রিয়া থেকে মুক্ত নয়।
প্রযুক্তির অগ্রগতি ও ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যের সুরক্ষা (ট্রেড প্রটেকশন) সস্তা শ্রমের তুলনামূলক সুবিধাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ২০১৯ সালে ম্যাককিনসের প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্ব বাণিজ্যের নির্ভরতা সস্তা শ্রমনির্ভর ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের ওপর কমছে। ২০০৫ সালে যেখানে সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভরতা ছিল ৫৫ শতাংশ, সেখানে ২০১৭ সালে তা ৪৩ শতাংশে নেমে এসেছে। অটোমেশন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে বিশ্ব বর্তমানে মূলধনকেন্দ্রিক (ক্যাপিটাল ইনটেনসিভ) উৎপাদনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এর ফলে প্রশ্ন ওঠে, সস্তা শ্রমের সুবিধা কমে গেলে বাংলাদেশের উন্নয়নের পথ কী হবে?
বাংলাদেশের প্রাথমিক কমপ্যারেটিভ অ্যাডভান্টেজ হচ্ছে এর মাটির উর্বরতা, যা প্রকৃতির একটি আশীর্বাদ। প্রতি বছর ৫০টিরও বেশি নদী ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবাহিত হয়। এসব নদী দিয়ে প্রায় ৬৫০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার পানি প্রবাহিত হয় এবং একটি বিশাল ব-দ্বীপ গঠনের জন্য উর্বর পলি জমা করে। উইলেম ভ্যান শেন্ডেলের বর্ণনায়, ‘বাংলাদেশ হচ্ছে সমতল করা হিমালয়’। ভারত যদি পানির গতিপথ পরিবর্তন না করে তাহলে এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুবিধা। এ স্থায়ী কমপ্যারেটিভ অ্যাডভান্টেজ বাংলাদেশ কীভাবে কাজে লাগাতে পারে?
এখন পর্যন্ত, বাংলাদেশের এ উর্বর মাটি শুধু তার ১৭০ মিলিয়ন এবং বৃদ্ধিপ্রাপ্ত জনসংখ্যাকে ভাত খাওয়ানোর জন্য ব্যবহার হয়েছে। এ উর্বর জমি যদি আয় উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা হয়, তাহলে কি তা কারো না খেয়ে থাকার সমান হবে? চাহিদা ও সরবরাহের বিবেচনা উভয়েই অন্য কথা বলে। ধনীরা কম চাল খায়। ১৯৬২ সালে শীর্ষে পৌঁছনোর পর, সম্পদ বৃদ্ধির সঙ্গে জাপানের মাথাপিছু চাল খাওয়ার পরিমাণ অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে, যা ২০২০ সালের মধ্যে ১১৮ কেজি থেকে ৫১ কেজিতে নেমে আসে। বাংলাদেশের চালের চাহিদা যদি জাপানের প্রতিচ্ছবি হয়, তাহলে প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত জমি মুক্ত করা সম্ভব যা কিনা অপ্রচলিত উচ্চমূল্যের কৃষি (হাই-ভ্যালু ননট্র্যাডিশনাল এগ্রিকালচার) কাজের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। বর্তমান পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মাথাপিছু চালের ব্যবহার ১০ শতাংশ কমেছে, যা কিনা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যদি আরো সমানভাবে বণ্টিত হতো তাহলে চালের ব্যবহার আরো দ্রুত হ্রাস পেত।
২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ২০ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে। এ অবস্থায় শুধু মাথাপিছু চাল গ্রহণের পরিমাণ কমানোর ওপর নির্ভর করা বিপজ্জনক হতে পারে। চালের স্থিতিশীল সরবরাহের জন্য দেশীয় চাল উৎপাদন বৃদ্ধি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সৌভাগ্যবশত, চালের সম্ভাব্য এবং প্রকৃত উৎপাদনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধানের কারণে সরবরাহ বৃদ্ধির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের ধান উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি বর্তমানে মাত্র ১ শতাংশ, যা ভারতের ২ দশমিক ৪ শতাংশ, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের ১ দশমিক ৯ এবং চীনের ৩ দশমিক ৭ শতাংশের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। কৃষির আধুনিকীকরণ ও দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ফলন বাড়ানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত কৃষিজমির ওপর নির্ভরতাও কমানো সম্ভব। এ প্রক্রিয়া ধান চাষের জন্য জমির চাহিদা কমিয়ে আনতে এবং বাংলাদেশকে চাল রফতানিকারক দেশে পরিণত করতে সাহায্য করবে। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের সামনে এ সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছিল।
ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার আবাসন চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ প্রতি বছর শূন্য দশমিক ২ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ পর্যন্ত কৃষিজমি হারাচ্ছে। জমির আরো লাভজনক ব্যবহার মানুষকে জমি সংরক্ষণে উৎসাহিত করবে এবং সঙ্গে সঙ্গে ভূমি সাশ্রয়ী এবং বহুমুখী (কমপ্যাক্ট, মাল্টি-লেভেল) বাড়িঘর নির্মাণে প্ররোচিত করবে। এ কৌশল দুটি কাঙ্ক্ষিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ফলাবে।
প্রথমত, জমির ব্যবহার আরো লাভজনক হলে কৃষিজমির মূল্য বৃদ্ধি পাবে। ফলে মানুষ লাভজনক কৃষিজমিতে নতুন আবাস তৈরি করার আগে দুবার ভাববে। এ পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবে বাড়িগুলোকে ঊর্ধ্বমুখী (ফ্ল্যাট-বাড়ির মতো) নির্মাণের প্রতি চাপ তৈরি করবে। এটি জমি সংরক্ষণের পাশাপাশি গ্রামের বাসিন্দাদের বিদ্যুৎ ও ট্যাপের পানির মতো আধুনিক সুযোগ-সুবিধার কাছাকাছি বসবাসে সক্ষম করে তুলবে। গ্রামের ভূস্বামী ও কৃষক উভয়েই উচ্চ জমির মূল্য থেকে উপকৃত হবেন, যা গ্রামাঞ্চলের উন্নতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের কৃষকরা সম্ভবত অবশেষে ধানের বিশ্ব রফতানি বাজারের প্রতি নজর দেবে। ডলারে ধান বিক্রি করে আয় হলে স্বাভাবিকভাবেই ধানের খামারগুলোয় সর্বাধিক প্রচেষ্টা এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথ সুগম করবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিশ্বব্যাপী চ্যালেঞ্জগুলো কৃষি বৈচিত্র্যের প্রয়োজনীয়তাকে আরো স্পষ্ট করে তুলেছে। ধান বা গমের মতো একক ফসলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বিভিন্ন ঝুঁকি নিয়ে আসে, যেমন গাছের মহামারী থেকে শুরু করে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব, পাকিস্তানের ২০২২ সালে বন্যা যেটা প্রমাণ করে, যা দেশের ১৫ শতাংশ ধানের ফসল ধ্বংস করেছে। জলবায়ু প্রতিরোধী, উচ্চমূল্যের অপ্রচলিত কৃষিবৈচিত্র্যে প্রবেশ করা শুধু আয় বৃদ্ধি করে না, বরং ঝুঁকি কমায় এবং স্থানীয় খাদ্যনিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ায়।
ফল ও শাকসবজির মতো অর্থকরী ফসলের দিকে ঝোঁকা উভয়ই কাঙ্ক্ষিত এবং অনিবার্য মনে হচ্ছে। শস্যবৈচিত্র্য এবং কৃষি প্রক্রিয়াকরণ গ্রামীণ কৃষিজীবিকা সুরক্ষিত করতে, দ্রুত বৃদ্ধি উৎসাহিত করতে এবং গ্রামীণ দারিদ্র্য হ্রাসের কার্যকর উপায় হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। তৈরি পোশাক খাত থেকে রফতানিতে বৈচিত্র্য আনার পাশাপাশি, এ কৌশল বাংলাদেশের উষ্ণ জলবায়ু ও উর্বর জমিকে পশ্চিমা ভোক্তাদের সারা বছরের চাহিদা মেটানোর জন্য কাজে লাগাবে। এর উদ্দেশ্য কেবল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনই নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্ট অপ্রত্যাশিত হুমকিগুলোর বিরুদ্ধে সুরক্ষা প্রদানেও জড়িত।
তৈরি পোশাক শিল্প প্রতিযোগিতার প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল, কিন্তু বাংলাদেশের উর্বর আবাদযোগ্য জমি একটি স্থায়ী সম্পদ, যা প্রতিযোগিতার প্রতি খুব কম সংবেদনশীল। ক্রমহ্রাসমান উর্বর জমিতে বাংলাদেশের উৎপাদন বাড়ানোর আর কোনো বিকল্প নেই। আবাদযোগ্য জমির উন্নত ব্যবহার নিশ্চিত করে বাংলাদেশ বেশ লাভবান হতে পারে। মধ্যম আয়ের ফাঁদ বাংলাদেশের জন্য নতুন একটি ধারণা হিসেবে উঠে এসেছে। তবে এটি বাস্তব কিনা এবং এটি থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসা যায় তা নিয়ে এখনো ঐকমত্য নেই। আমরা মনে করি, উচ্চফলনশীল কৃষিতে জোর দেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ তার কমপ্যারেটিভ অ্যাডভান্টেজ কাজে লাগাতে পারে।
সৈয়দ আবুল বাশার: ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক
সেলিম রশিদ: ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়, আরবানা-শ্যাম্পেইনের ইমেরিটাস অধ্যাপক










