আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। শিশু সুস্থ-সবল শরীরে বেড়ে উঠবে এটিই অভিভাবকের কাম্য। সেজন্য ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য খাবার নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটে শিশুকে প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে পারছেন না অনেক অভিভাবক। ফলে শিশুর বেড়ে ওঠা স্বাচ্ছন্দ্যময় হচ্ছে না। পুষ্টির অভাবে ভুগতে হচ্ছে প্রয়োজনীয় খাবার না পাওয়ায়। এটি বলা যায় এক ধরনের অশনিসংকেত। কারণ শিশু অপুষ্টিতে ভুগলে তার রেশ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর পড়বে।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, জন্ম থেকে দুই বছর শিশুর খাবারের তালিকা ও খাদ্য গ্রহণের হারের ওপর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ নির্ভর করে। বয়স অনুযায়ী চাহিদা বিবেচনায় খাবারেরও শ্রেণীবিভাগ করা হয়েছে। ৬-২৩ মাস বয়সী শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করতে আট ধরনের খাবারের স্বীকৃতি রয়েছে। এসব খাবার দিনে কতবার খাওয়াতে হবে তা নিয়েও রয়েছে নির্দেশনা। তবে দেশের ওই বয়সী শিশুদের মধ্যে পুষ্টির জন্য ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য খাবার পাচ্ছে ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ। চার বছর আগের তুলনায় ন্যূনতম খাদ্য পাওয়া এসব শিশুর হার কমেছে। এতে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে শিশু চরম পুষ্টিনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়ছে বলে পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
নবজাতক ও শিশুর খাওয়ানোর পদ্ধতির (ইনফ্যান্ট অ্যান্ড ইয়াং চাইল্ড ফিডিং—আইওয়াইসিএফ) অবনতির কথা খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে। চলতি বছর স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (নিপোর্ট) সর্বশেষ প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ ২০২২’-এ বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচিতে (এইচপিএনএসপি) ৪৫ শতাংশ শিশুর ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য খাদ্য পাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও জাতিসংঘের শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) ভাষ্য, ৬-২৩ মাস বয়সী শিশুর জন্য গ্রহণযোগ্য খাবারের তালিকায় ন্যূনতম আট শ্রেণীর খাবার রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম হচ্ছে মাতৃদুগ্ধ, দ্বিতীয়ত শস্য, সাদা বা ফ্যাকাশে ভোজ্য উদ্ভিদ শেকড়, কন্দ বা ফলাকার উদ্ভিদ মূল (আলু, মূলা, কচু প্রভৃতি) ও কলা, তৃতীয়ত মটরশুঁটি, মটর, মসুর ডাল, বাদাম ও বীজ। চতুর্থত, দুগ্ধজাত পণ্য (তাজা, প্যাকেটজাত ও গুঁড়ো দুধ, দই ও পনির), এরপর যথাক্রমে পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর খাদ্যতালিকায় রয়েছে মাংস, মাছ, হাঁস-মুরগি, ডিম, ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ ফল ও সবজি এবং অন্যান্য ফল ও সবজি। এসবের মধ্যে অন্তত পাঁচ ধরনের খাদ্য গ্রহণকে বৈচিত্র্যপূর্ণ খাবার ধরা হয়। যারা ছয় মাস পরও মাতৃদুগ্ধ পাচ্ছে তাদের এবং যারা মাতৃদুগ্ধ পাচ্ছে না তাদের ক্ষেত্রেও রয়েছে দৈনিক খাবার গ্রহণের বৈচিত্র্য। ৬-৮ মাস বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে দিনে অন্তত দুবার এসব খাবার এবং ৯-২৩ মাস বয়সী শিশুর জন্য দিনে অন্তত তিনবার এ-জাতীয় খাবার দিতে হবে। ইউনিসেফের মতে, শিশুদের খাবারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য ছয় মাস বয়স হলো উপযুক্ত। ওই বয়সে মাতৃদুগ্ধ পুষ্টি চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে ওই বয়সে শিশু শারীরিক বিকাশের মাধ্যমে খাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয় এবং নিজেরাই নতুন খাবার গ্রহণে আগ্রহী হয়।
পুষ্টিবিদদের বক্তব্য অনুযায়ী, শৈশবের শুরুতে প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার অতিগুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে পুষ্টির ঘাটতি শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। শিশুকে ছয় মাস পর্যন্ত শুধু মাতৃদুগ্ধ পান করাতে হয়। এ সময় এক ফোঁটা পানিও তার মুখে দেয়া যাবে না। জন্মের ছয় মাস পর মাতৃদুগ্ধের পাশাপাশি পুষ্টি চাহিদায় প্রয়োজন বৈচিত্র্যপূর্ণ খাবার। দেশে ৬-২৩ মাস বয়সী সিংহভাগ শিশুর নিয়মিত খাদ্যতালিকায় পুষ্টি উপাদানের বৈচিত্র্য নেই। ফলে পুষ্টির ঘাটতির মধ্যেই প্রারম্ভিক শৈশব পার হয়। এছাড়া শিশুর খাবারের বিষয়ে পরিবারের উপযুক্ত জ্ঞানের অভাবও রয়েছে।
জাতীয় পুষ্টিসেবা ও বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদ (বিএনএনসি) সূত্রে জানা যায়, পুষ্টি নিয়ে কাজ করা সরকারের ২২টি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে মোটা দাগে কাজ করছে ১৩টি। প্রত্যক্ষ পুষ্টি কার্যক্রমের মাধ্যমে অপুষ্টি উত্তরণের কাজ চলে। এর মধ্যে সরাসরি খাবার প্রদান, ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, আয়োডিন, এমআইএনটি পাউডার, মিনারেল খাওয়ানোর মতো কর্মসূচি রয়েছে। বিশেষ করে শিশু ও নারীদের এ ধরনের কার্যক্রমের আওতায় আনা হয়। প্রত্যক্ষ কার্যক্রমের মধ্যে চিকিৎসাও রয়েছে। অন্যদিকে পরোক্ষ কার্যক্রমে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে বা ভিন্নভাবে সভা, সেমিনার, প্রশিক্ষণ, সচেতনতা বৃদ্ধিসহ বহুমুখী কর্মসূচি পালন করা হয়। দেশে সরকারি ও বেসরকারিভাবে পুষ্টির বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় ৩০০টি কর্মসূচি চলছে। এর মধ্যে সরকারের বহুমুখী কর্মপরিকল্পনা (অপারেশনাল প্ল্যান—ওপি) রয়েছে ৩১টি, যার মধ্যে ১৯টি ওপি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করছে। প্রতি বছরই পুষ্টি কার্যক্রমের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে মোটা অংকের বরাদ্দ রাখা হয়। সরকারের বেশকিছু বহুমুখী পুষ্টি পরিকল্পনার সমন্বয়ে এনএনএস কর্মসূচি চলমান রয়েছে।
পুষ্টিবিষয়ক কার্যক্রমে সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে কঠোর পর্যবেক্ষণ জরুরি বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। কেননা ৬-২৩ মাস বয়সী শিশুদের মাতৃদুগ্ধের পাশাপাশি খাবারে বৈচিত্র্য দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নিত্যপণ্যের দাম দ্রুত বাড়ছে। ফলে মানুষ কোনো কোনো আদর্শ খাবার বাদ দিয়ে দিচ্ছে। বস্তুত শিশুর পুষ্টিকর খাবারে অনিশ্চয়তা থাকলে তাতে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যাহত হবে। তাই সরকারের যেসব কর্মসূচি রয়েছে তাতে আরো জোর দিতে হবে। এছাড়া শিশুর পুষ্টিনিরাপত্তার স্বার্থে নতুন কার্যক্রমে উদ্যোগী হতে হবে, যেন পরিবারগুলো শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য কিনতে সক্ষম হয়।










