মানবসভ্যতার অগ্রগতিতে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ভূমিকা রেখেছে। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তি নির্মাণে নারীর ভূমিকা কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা ও প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি নারীকে পুরুষের তুলনায় দুর্বল গণ্য করে। যে কারণে কর্মক্ষেত্রে নারী যথাযথ আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে শহরাঞ্চলে নারীর শ্রমের মূল্য ও কাজের পরিবেশ পুরুষের তুলনায় ভারসাম্যপূর্ণ না হওয়ায় নারী শ্রমিকরা গ্রামমুখী হচ্ছেন এমন পরিসংখ্যান উঠে এসেছে।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, দেশের শিল্প, কৃষি ও সেবাসহ সব খাতের কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তবে এক দশক ধরে নারীদের জন্য সংকুচিত হচ্ছে শহরের কর্মসংস্থান, যার প্রভাবে শহরকেন্দ্রিক কর্মে নারীর অংশগ্রহণ কমেছে। বিপরীতে এ সময়ে গ্রামে তাদের কর্মসংস্থান বেড়েছে। এছাড়া অনেকে অভিবাসী হিসেবে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপে নারীর শহরকেন্দ্রিক কর্মসংস্থান হ্রাস ও গ্রামাঞ্চলে বৃদ্ধি পাওয়ার পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শহরে শিল্পায়নের প্রসার, কর্মক্ষেত্রের পরিসর বৃদ্ধি এবং নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও জীবনযাত্রার ধারাবাহিক ব্যয় বৃদ্ধি, কভিড-পরবর্তী প্রভাব ও মূল্যস্ফীতির কারণে নারীরা শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। 

বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ৭ কোটি ৩৪ লাখ শ্রমশক্তি রয়েছে। এর মধ্যে ৪ কোটি ৭৪ লাখ পুরুষ ও ২ কোটি ৫৯ লাখ নারী। ২০১৩ সালে গ্রামীণ এলাকায় নারী শ্রমশক্তি ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ, যা ২০২২ সালে ২ কোটি ৯ লাখে দাঁড়ায়। সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র দেখা যায় শহর এলাকায়। ২০১৩ সালে ৪৫ লাখ নারী শ্রমশক্তি শহর এলাকায় কাজ করলেও ২০২২ সালে তা ৪০ লাখে দাঁড়ায়। শতাংশের হিসাবে এক দশকে গ্রামে ১৭ দশমিক ১৯ শতাংশ নারী শ্রমশক্তি বেড়েছে। অন্যদিকে শহরে এক দশকে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ শ্রমশক্তি কমেছে।

এভাবে শহরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীদের অংশগ্রহণ হ্রাস মোটেও ইতিবাচক ইঙ্গিতবাহী নয়। এতে অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা তৈরির শঙ্কা রয়েছে। কারণ নারী-পুরুষের সক্রিয় ভূমিকার ফলেই অর্থনীতির চাকা সচল থাকে। তবে হঠাৎ করে এমন প্রেক্ষাপট তৈরির পেছনে কভিড মহামারীকে দায়ী করা হচ্ছে। তখন অনেক নারী শ্রমিক শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যান। পরবর্তী সময়ে কভিড নিয়ন্ত্রণে এলেও শহরে ফিরে এসে জীবনযাপনের উচ্চ ব্যয়ের ধকল সামলাতে না পেরে আবারো গ্রামে চলে যেতে হয়েছে। 

এদিকে গার্মেন্ট ও উৎপাদন শিল্পে নারীর অংশগ্রহণ কমায় শহর এলাকায় নারী শ্রমশক্তি কমে যাওয়ার পেছনে বড় কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) ভাষ্য অনুযায়ী, আগে গার্মেন্ট ও অন্যান্য উৎপাদন শিল্পে নারী শ্রমিকরাই কাজ করতেন। আশির দশক থেকে শুরু করে চলতি শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত নারীর কর্মসংস্থান বেশি ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে প্রযুক্তির ব্যবহার যতটা বেড়েছে, তত বেশি নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ কমে পুরুষ শ্রমিকের আধিক্য তৈরি হচ্ছে। সাধারণ কাজেও পুরুষ শ্রমিকের অংশগ্রহণ বাড়ছে। আশির দশকে গার্মেন্ট খাতে নারীর অংশগ্রহণ ৯০ শতাংশ থাকলেও এখন তা ৬০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

তবে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে ভিন্নমত পাওয়া গেছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) মতে, শহরে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে, সে অনুযায়ী বেতন বাড়েনি, যে কারণে তরুণীরা শহরে কাজ করতে আর আগ্রহ পাচ্ছেন না। আবার শহর এলাকাগুলোয় নারীরা অনানুষ্ঠানিকভাবে কাজ করেন। পরিসংখ্যান তৈরির সময় সেগুলো কতটুকু ধরা হয় তা নিয়ে প্রশ্ন করার অবকাশ থাকে। এক্ষেত্রে তথ্যের ঘাটতি থাকার বিষয়টিও উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইনভিত্তিক ব্যবসায় বহু নারী কাজ করেছেন। এমন পরিপ্রেক্ষিতে শহর এলাকায় আগে যারা আনুষ্ঠানিক উপায়ে কাজ করতেন সেগুলোর তথ্য সংরক্ষণ হতো। পরবর্তী সময়ে সেখান থেকে অনানুষ্ঠানিক কাজে যোগদান করলে সে তথ্য সংরক্ষণ না হলে পরিসংখ্যানে প্রকৃত বিষয় উঠে আসতে নাও পারে।

সব মিলিয়ে কভিড, শহরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের বিষয়ে বলা হলেও এক্ষেত্রে নারীদের প্রতি অবহেলার বিষয়টি একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। কারণ গার্মেন্টসে পুরুষরা কাজ করলে অনেক রাত পর্যন্ত কাজ করানো যায়। মাতৃত্বকালীন ছুটি দিতে হয় না, এছাড়া নানা সুবিধা আছে। সেজন্য গার্মেন্টসে পুরুষরা নারীদের তুলনায় অগ্রাধিকার পাচ্ছেন। অন্যদিকে রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‌্যাপিড) ভাষ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো পুরুষরা করেন। মেয়েদের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে দেখা যায় না। যে কারণে অনেক ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের ছাঁটাই করা হচ্ছে। এছাড়া গ্রামাঞ্চলে কৃষিভিত্তিক কাজে নারীরা অনেক বেশি সহায়তা করতে পারেন। কাজ হিসেবে কৃষিকাজ ঝুঁকিপূর্ণ নয়। সেখানে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগও অনেক বেশি।

তাছাড়া শিল্পায়নের কারণে এখন নারী শ্রমিকের সংখ্যা কমছে। দেশের প্লাস্টিক খাতে ৮০ শতাংশ পুরুষ ও ২০ শতাংশ নারী শ্রমশক্তি হিসেবে কাজ করছেন। বড় কারখানাগুলোয় নারী শ্রমশক্তির হার ৩০ শতাংশ হলেও মাইক্রো পর্যায়ের কারখানাগুলোয় তা মাত্র ৫ শতাংশ। ক্ষুদ্র কারখানায় ২১ ও মাঝারি মানের কারখানায় ২৫ শতাংশ নারী শ্রমিক কাজ করেন।

অন্যদিকে শহরে নারী শ্রমশক্তি কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে নারীর অভিবাসনকে দেখা হচ্ছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর এক লাখের কম নারী শ্রমশক্তি বৈদেশিক কর্মসংস্থান গ্রহণ করেন। এর মধ্যে ২০১৩ ও ২০১৪ সালে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার কর্মী পাঠানো হয়। ২০১৫-১৯ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর দেশের বাইরে যাওয়া নারী অভিবাসীর সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে যায়। এরপর ২০২০ ও ২০২১ সালে কমলেও ২০২২ সালে ফের নারী অভিবাসীর হার লাখ ছাড়ায়।

সব মিলিয়ে উপযুক্ত কাজের পরিবেশ না থাকা, মজুরির ক্ষেত্রে বৈষম্য এবং গ্রামে কম ঝুঁকিপূর্ণ কৃষিকাজে নিয়োজিত হওয়ায় নারীর গ্রামমুখিতা বাড়ছে। এক্ষেত্রে শহরে কাজ করায় নারীর আয়ের যে স্বাধীনতা ছিল, তা হারিয়ে যাচ্ছে। এতে সর্বোপরি অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এজন্য শহরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর যথাযথ মূল্যায়ন প্রয়োজন। তাহলে নারী-পুরুষের আর্থিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হবে না এবং অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়বে।