কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে সারের জন্য ভর্তুকি যথাযথ গুরুত্বের দাবি রাখে। এক্ষেত্রে ভর্তুকি দেয়া হলেও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে কৃষক ন্যায্যমূল্যে সার পাচ্ছেন না, এমন অভিযোগ বারবার উঠে আসছে। যে কারণে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং উৎপাদনের ব্যয় বাড়ছে। অর্থাৎ যে উদ্দেশ্যে ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে, তা সফল হচ্ছে না। এতে শুধু অর্থের অপচয় ও সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে, কিন্তু বঞ্চিত হচ্ছে দেশের কৃষক সমাজ।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, আত্মসাৎ-দুর্নীতির মাধ্যমে সার খাতে দেয়া ভর্তুকির বড় একটি অংশ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে। গত ছয় বছরে ৫৭ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ সার খাতে ভর্তুকি হিসেবে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বছর বছর ভর্তুকির পরিমাণ এ সুবিধার সবটা কৃষকের কাছে পৌঁছেনি। মাঝপথেই এর বড় একটি অংশ মধ্যস্বত্বভোগীরা লুণ্ঠন করে নিয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া উভয় মিলিয়ে ২০১৭-১৮ থেকে ২০২২-২৩ সাল পর্যন্ত ছয় অর্থবছরে সার খাতে ভর্তুকি দেয়া হয়েছে ৫৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪ হাজার ৮৮৬ কোটি, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৭ হাজার ৪৭৩ কোটি, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৬ হাজার ৭১৬ কোটি, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৭ হাজার ৪২১ কোটি ও ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৪ হাজার ৯৪২ কোটি টাকার ভর্তুকি দেয়া হয়। এছাড়া ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে ১৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির ঘোষণা দেয়া হয়েছিল।
তবে আত্মসাৎ-দুর্নীতির কারণে ভর্তুকির বড় অংশই কৃষকের কাছে পৌঁছায় না বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। যেমন ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে সার খাতে মোট ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৮৮৬ কোটি টাকা। এর বড় একটি অংশ বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) মাধ্যমে আমদানির জন্য। কিন্তু পরে কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) দপ্তরের নিরীক্ষায় ধরা পড়ে, ওই বছর শুধু সার পরিবহনকারী ঠিকাদারদের মাধ্যমেই বিসিআইসির প্রায় ১ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকার সার আমদানিতে গুরুতর আর্থিক অনিয়ম হয়েছে।
অডিটে দেখা গেছে, পরিবহন ঠিকাদাররা সার উত্তোলনের পর বিসিআইসির নিয়ন্ত্রণাধীন বাফার গুদামে পৌঁছে দেয়ার চুক্তি থাকলেও নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ার দীর্ঘদিন পরও সে সার পৌঁছে দেন না। এতে সরকার হাজার কোটি টাকারও বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। খালাসের পর থেকে নির্ধারিত গুদামে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত এ সারকে ট্রানজিট সার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের পাশাপাশি কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন। কারণ সরকার এ খাতে অনেক বেশি ভর্তুকি দিচ্ছে, কিন্তু এর কোনো সুফল মিলছে না। অন্যদিকে দুর্নীতি হয় বলে ভর্তুকি কমানো যাবে না, বরং দুর্নীতি কমানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কেননা গত এক বছরে সারের দাম অনেক বেড়ে গেছে। কৃষকের উৎপাদনে তা প্রভাব ফেলছে।
ভর্তুকির অর্থ সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ দেয়া হয় ইউরিয়া সারের জন্য। ইউরিয়া সারের জন্য ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩ হাজার ২৯৯ কোটি, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২ হাজার ৯৫৪ কোটি, ২০২০-২১ অর্থবছরে ২ হাজার ৪৮৬ কোটি ও ২০২১-২২ অর্থবছরে ২ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হয়।
অন্যদিকে সরকারি কারখানাগুলোয় সার খাতে দেয়া ভর্তুকির অর্থ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এ ক্ষতিও সরকারকে বহন করতে হয়েছে। এছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠানের সার বিক্রির অর্থ আদায় নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অথচ এসব দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত না থেকেও ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ কৃষক, যার প্রভাব পড়ছে উৎপাদন খরচে। কারণ কৃষক ন্যায্যমূল্যে সার পাচ্ছেন না। এক্ষেত্রে আত্মসাতের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির মুখোমুখি করার পাশাপাশি সার বিপণন ব্যবস্থা কঠোরভাবে তদারকি করা উচিত। এজন্য সার উত্তোলন থেকে শুরু করে বাফার গোডাউনে স্থানান্তর পর্যন্ত পুরো সময় অটোমেশনে নিয়ে আসার যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে হবে। এছাড়া সার আত্মসাৎকারীদের বিষয়ে যেসব মামলা চলমান রয়েছে, সেগুলোর মীমাংসা হওয়া প্রয়োজন।
একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, কৃষককে বঞ্চিত করে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব হবে না। তাই কৃষকের জন্য ন্যায্যমূল্যে সার নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো রকম দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। কৃষক মাঠে ফসল উৎপাদন করে বলেই দেশের শিল্প-কারখানা সচল থাকে, আমাদের অন্নের জোগাড় হয়। সে কৃষককে অবহেলা করলে তার ফলাফল কখনই ইতিবাচক হবে না। এজন্য কৃষক যেন ন্যায্যমূল্যে সার পান, সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব কৃষি মন্ত্রণালয়ের। আমরা প্রত্যাশা করব, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এক্ষেত্রে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। কৃষকের মুখে হাসি ফুটুক, সব বঞ্চনা ও অবহেলার অবসান হোক। ন্যায্যমূল্যে সার পেয়ে কৃষক জমিতে ফসল ফলাক। কৃষকের সে হাসিমুখে ছেয়ে যাক বাংলার অবারিত প্রান্তর। আমাদের প্রশাসন কৃষিবান্ধব হোক, এটিই সবার কাম্য।










