দেশের অর্থনীতি ঝুঁকির মধ্যে আছে, এমনটিই মত বিশেষজ্ঞদের। অর্থনীতির সব সূচকে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান নিম্নমুখী। আমাদের রফতানি আয় ও রেমিট্যান্স আহরণ দুটোই কমেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দৈনন্দিন জীবনের খরচ মেটাতে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ হিমশিম খাচ্ছে। এফডিআইয়ের পাশাপাশি কমেছে বেসরকারি বিনিয়োগও। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ও রিজার্ভ ক্ষয় অব্যাহত রয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চলতি অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমে ৫ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে। যদিও গত এপ্রিলে সংস্থাটি ৬ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আভাস দিয়েছিল।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, সরকারের বিভিন্ন উৎস থেকে প্রকাশিত পরিসংখ্যান থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সেগুলোর ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংকের তৈরি করা প্রতিবেদন ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট, নিউ ফ্রন্টিয়ার্স ইন পভার্টি রিডাকশন’-এ এসব তথ্য জানানো হয়েছে। এদিকে আসন্ন নির্বাচন কেন্দ্র করেও এক ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে। তাই চলমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ কমাতে ব্যাংক ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন খাতে দ্রুত ও জোরালো সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। যথাযথ ও দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরো দুরূহ হতে পারে এবং এতে মূল্যস্ফীতিসহ সার্বিক সংকট দীর্ঘ হতে পারে বলে সংস্থাটি মনে করছে।
সংস্থাটির পরামর্শের মধ্যে রফতানি ও রেমিট্যান্স বাড়াতে দ্রুত নীতি পরিবর্তনে জোর দেয়ার তাগিদ রয়েছে। এক্ষেত্রে ডলারের দাম বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়বে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। এছাড়া মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে ব্যাংক ঋণের ওপর থেকে ক্যাপ তুলে নেয়ার বিষয়েও পরামর্শ রয়েছে। তদুপরি আর্থিক খাতের দুর্বলতা কাটাতে কার্যকরী ব্যাংক ব্যবস্থাপনা ও নজরদারির প্রতি গুরুত্বারোপের বিষয়ে মনোযোগ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ বাড়ার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন তিনটি মূল চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে প্রথমেই রয়েছে মূল্যস্ফীতি। বহিঃস্থ খাতের পাশাপাশি আর্থিক খাতের দুর্বলতাও অন্যতম চ্যালেঞ্জ। তবে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার জন্য কাঠামোগত পরিবর্তন দরকার, যেখানে কার্যকর মুদ্রানীতি ও বাজারভিত্তিক ডলারের মূল্য নির্ধারণ অন্যতম পদক্ষেপ বিবেচিত হতে পারে। এছাড়া রাজস্ব বৃদ্ধিও সমস্যার উত্তরণে বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
মূল্যস্ফীতি বাড়ার কারণ হিসেবে জ্বালানির উচ্চমূল্য, দুর্বল মুদ্রানীতি, টাকার অবমূল্যায়ন, পণ্যের সরবরাহ সংকট ও আমদানি নিয়ন্ত্রণকে প্রভাবক হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। পাশাপাশি মজুরি না বাড়ায় মানুষের ভোগ ব্যয় কমছে, যা জিডিপি প্রবৃদ্ধিসহ অন্য ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বাজারে কোনো প্রভাব ফেলতে পারছে না। বরং ব্যাংকের ঋণখেলাপি, পুনঃতফসিল ও ঋণ অবলোপন বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যালান্স অব পেমেন্টে চাপ তৈরি করছে। রেমিট্যান্স কমায় রিজার্ভও ধারাবাহিকভাবে কমছে। সরকারের আমদানি নিয়ন্ত্রণ পদক্ষেপে কর আহরণও দুর্বল হয়েছে। এমনিতেই রাজস্ব আহরণে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার সর্বনিম্ন। আবার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হ্রাস পাওয়ায় সরকারের ব্যাংকনির্ভরতা বেড়েছে। এতে আয় না বাড়লেও সরকারের ঋণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে দারিদ্র্য কমলেও বৈষম্য বাড়ছে।
পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে কিছু কাঠামোগত সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। যেমন ডলারের একই দর নির্ধারণ, রাজস্ব বাড়াতে ভ্যাট ও আয়কর আদায় বাড়ানোর পরামর্শ উঠে এসেছে। এছাড়া দুর্বল ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনায় জোর দেয়ার বিষয়টিও বলা হয়। এরই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে নিত্যপণ্যের শুল্ক হ্রাসের পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
এদিকে বাংলাদেশকে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে সংস্থাটি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেছে। বিশ্বব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হতে যাচ্ছে, যেখানে ২ হাজার থেকে ৫ হাজার ডলার মাথাপিছু আয় হবে। সুতরাং নিম্ন আয়ের দেশের সারি থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশ আরো বেশি ঋণ পেতে পারে। এটি বিদ্যমান বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমাতে সহায়তা করবে বলে সংস্থাটি আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।
তথাপি বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক পরিস্থিতির বিষয়টিকেও আলোকপাত করেছে বিশ্বব্যাংক। এক্ষেত্রে বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে স্থানীয় পলিসির সমন্বয় করে সমস্যার সমাধানে তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি। তাছাড়া নির্বাচনকালীন উদ্বেগ সব দেশেই থাকে বলে বিষয়টিকে তারা আপৎকালীন হিসেবে গণ্য করছেন। কেননা এ সময়ে বিনিয়োগকারীরা পরিস্থিতি বোঝার জন্য অপেক্ষায় থাকেন। বাংলাদেশও বর্তমানে সে অবস্থায় রয়েছে।
বিগত কয়েক বছরজুড়ে সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকায় বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে নিয়ে আশাবাদী। কারণ তরুণ জনগোষ্ঠী বেশি থাকা, পাশাপাশি রফতানির বাজারেও বাংলাদেশের অংশীদারত্ব বাড়ছে।
বিশ্বব্যাংক যে পরামর্শগুলো দিয়েছে, তা হেলাফেলার বিষয় নয়। কারণ তারা সরকারি বিভিন্ন পরিসংখ্যানের আলোকেই প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এজন্য আর্থিক খাতের দুর্দশা অতিক্রম করতে সংস্থাটির পরামর্শ বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীলতার পথে হাঁটবে এ প্রত্যাশা করা যায়।










