ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সম্প্রতি বেশকিছু হালকা ও মাঝারি ধরনের ভূকম্পন এ ঝুঁকির মাত্রা বাড়িয়ে তুলেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশে বড় মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে। এজন্য ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে বিশেষজ্ঞরা এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। বস্তুত ভূমিকম্প এমন একটি দুর্যোগ, যার পূর্বাভাস পাওয়া যায় না। এজন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। 

বণিক বার্তায় প্রকাশ, রাজধানীসহ সারা দেশে শনিবার সকালে আবারো ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে উৎপত্তি হওয়া ভূকম্পনটির মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৬। আর মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্যে তা ৫ দশমিক ৫। এর আগে চলতি বছরেই মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত চার মাসে দেশে তিন দফায় ভূমিকম্প হয়েছে। সবগুলোরই উৎপত্তিস্থল ছিল বাংলাদেশ ও সীমান্তবর্তী অঞ্চল। 

মাঝারি মাত্রার এসব ভূমিকম্পে তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবে দেশের অভ্যন্তরে উৎপত্তি হওয়া ভূমিকম্প বিপজ্জনক মাত্রা ছাড়ালেই বিশেষজ্ঞরা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় বিপর্যয়ের মাত্রা ভয়াবহ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। গত কয়েক দশকে ঢাকার সম্প্রসারণ দ্রুত ও অপরিকল্পিতভাবে হয়েছে। ঢাকার পুরনো অংশটি শক্তিশালী গঠনের মাটির ওপর গড়ে উঠেছিল। কিন্তু গত কয়েক দশকে বর্ধিত হওয়া অংশে মাটির গঠন দুর্বল। এসব এলাকার বড় অংশই মূলত ভরাট হওয়া জলাভূমির ওপর গড়ে উঠেছে। রিখটার স্কেলে ৭ বা এর চেয়ে বেশি মাত্রার ভূমিকম্পে এসব এলাকায় বড় ধরনের প্রাণ ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি যথাযথভাবে পাইলিংয়ের মাধ্যমে নির্মিত ভবনগুলোও এ বিপর্যয়ের আওতামুক্ত নয়। 

ঢাকার ভবনগুলো সম্পর্কে এ ধরনের আশঙ্কা দীর্ঘদিন ধরেই বলা হচ্ছে। কিন্তু কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ এখন পর্যন্ত লক্ষণীয় নয়। এ ধরনের উদাসীন মনোভাবের ফল ব্যাপক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে পেতে হবে কিনা এমন দুশ্চিন্তা সচেতন নাগরিকদের মনে ফুটে ওঠে। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই জীবন অতিক্রম হওয়ায় এবং বড় ভূমিকম্প না হওয়ায় বিষয়টি সেভাবে গুরুত্ব পায় না। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক প্রভাবের ফলে ভূমিকম্প এখন তরুণ প্রজন্মের একাংশের থ্রিল পাওয়ার মুহূর্তে উপনীত হয়েছে। এভাবেই প্রশাসন থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক, সবার মধ্যেই উদাসীনতা কাজ করায় ভূমিকম্প প্রতিরোধী স্থাপনা নির্মাণ সম্ভব হচ্ছে না। আর এসবের উদাহরণই মিলছে ভূমিকম্পগুলোয় স্থাপনার দুর্বলতা প্রকাশের মাধ্যমে। এগুলো মূলত সচেতন হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে, কিন্তু আমরা কতটুকু উপলব্ধি করছি তা প্রশ্নসাপেক্ষ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে পরিকল্পিত নগরায়ণ জরুরি। সেটি যেহেতু হয়নি, তাহলে কীভাবে দুর্যোগ মোকাবেলা করা যাবে এখন সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। সত্যি বলতে ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকা শহরে ভূমিকম্প হলে মানবিক মহাবিপর্যয় ঘটবে, যা কল্পনারও বাইরে। আমরা ইরান, তুরস্ক, আফগানিস্তান প্রমুখ দেশের ভূমিকম্প থেকে শিক্ষা নিতে পারি। দেশগুলো কতটা বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছিল, সাধারণ মানুষকে কতটা অবর্ণনীয় কষ্ট পোহাতে হয়েছে তা সবার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এসব উদাহরণ বস্তুত আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য সতর্ক সংকেত। কারণ এমন বিপর্যয় হলে প্রচুর মানুষ মারা যাবেন। অপ্রশস্ত রাস্তাঘাটের দরুন ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত দালানের নিচে চাপা পড়া মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা খুব কঠিন হয়ে যাবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, ২০১৫ সালে নেপালে ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর দেশে ‘ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার’ স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হলেও সেটি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এর আগে ফায়ার সার্ভিসের উদ্যোগে ভূমিকম্প মহড়া হলেও সেটি আর অব্যাহত নেই। এমনকি ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এনডিএমআইএস) নামে যে ওয়েবসাইট নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছিল সেটিও আলোর মুখ দেখেনি। এমন উদাসীনতায় সাধারণ মানুষের সচেতনতাও বৃদ্ধি পায়নি। সবাই যেন ধরেই নিয়েছে যা হওয়ার হবে, আগে হোক তখন দেখা যাবে। কিন্তু এভাবে পুরো দেশ তো আত্মঘাতী ভাবনায় ধাবিত হতে পারে না। দেশটাকে তো সঠিক কর্মপন্থায় এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

এজন্য প্রশাসনের ভূমিকা সর্বাগ্রে জরুরি। প্রস্তাবিত ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) যেন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) যথাযথ অনুমোদন নিয়ে স্থাপনা নির্মাণ হোক, সেটিই প্রত্যাশা। এক্ষেত্রে কঠোর তদারকি বজায় রাখতে হবে। সামান্য দুর্নীতি ও অবহেলা এক্ষেত্রে বড় ধরনের ক্ষতি বয়ে আনতে পারে। ভূমিকম্পের ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সাধারণ নাগরিকদেরও ভূমিকা রয়েছে। বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণসহ রাস্তার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা ছেড়ে বাড়ি নির্মাণ করতে হবে। জলাধার ভরাট করে বাড়ি নির্মাণ করা যাবে না। ভূগর্ভস্থ পানির যত্রতত্র ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। বাড়িগুলোর মাঝে ফাঁকা জায়গা রাখার যে নিয়ম রয়েছে, সেটিও মেনে চলা প্রয়োজন। নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করা যাবে না। সর্বোপরি ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কিত হয়ে হুড়োহুড়ি না করে দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যেতে হবে। এছাড়া বিশেষজ্ঞরা যেসব পরামর্শ দিয়েছেন, সেগুলো মেনে চলতে হবে। সর্বোপরি, নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে ভবন নির্মাণের অনুমোদনসহ ভূমিকম্প প্রতিরোধী স্থাপনা নির্মাণে সতর্ক ভূমিকা প্রয়োজন। কারণ প্রশাসনিক ক্ষেত্রে নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটলে তার প্রভাব সর্বত্র পড়তে বাধ্য। এজন্য শুধু অর্থ উপার্জনের বিষয়টি মাথায় রাখলে চলবে না। জীবননাশের ঝুঁকি এড়াতে ভূমিকম্প প্রতিরোধী স্থাপনা নির্মাণে সচেতন হতে হবে। ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ কারো কাম্য নয়। এজন্য ভূমিকম্পের ঝুঁকি এড়াতে সবার সচেতন ভূমিকা প্রয়োজন। পাশাপাশি যথাযথ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে ভূমিকম্পের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।