মূল্যস্ফীতির চাপে জীবনযাত্রার ব্যয় এরই মধ্যে আকাশছোঁয়া। চলমান সংকটে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ পরিস্থিতি তৈরি করবে এমন আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছিল, যদিও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য মতে, ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এ তথ্যও জানান দিচ্ছে আগামীতে বিদ্যুতের দাম বেড়ে ফুলে-ফেঁপে উঠবে মূল্যস্ফীতি। এতে দৈনন্দিন জীবনের ভোগান্তি যেমন বাড়বে, পাশাপাশি বাড়বে শিল্প খাতে সংকট। যেহেতু উৎপাদনের একটি বড় উপকরণ বিদ্যুৎ খাত। তাই বিদ্যুতের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা গেলে মূল্যস্ফীতিকে সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সহায়ক হবে বলে আশা করা যায়।
এক্ষেত্রে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর যৌক্তিতার পর্যালোচনা দরকার। সরকারি ভাষ্যমতে, বিদ্যুৎ খাতে অপ্রতিহত লোকসান এবং ভর্তুকি কমাতে দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে এবং সে মোতাবেক কাজ পরিচালিত হচ্ছে। গণশুনানির মাধ্যমে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর একক ক্ষমতা ছিল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি), কিন্তু গত বছর থেকে সরকারের নির্বাহী আদেশে দাম বাড়ানোর জন্য আইন করা হয়। বণিক বার্তার প্রতিবেদন বলছে, বিদ্যুতের অব্যাহত লোকসানের চাপ সামাল দিতে না পেরে গত বছর তিন দফা খুচরা পর্যায়ে মোট ১৫ শতাংশের কিছু বেশি দাম বাড়ানো হয়। এর মধ্যে গত বছরের ১২ ও ৩১ জানুয়ারি এবং তৃতীয় দফায় বিদ্যুতের খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানো হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি। এছাড়া ২০২২ সালের নভেম্বরে পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ানো হয় মোট ২৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ। বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি একেবারে উঠিয়ে দিলে দাম সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। বলা হচ্ছে, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শ মেনেই ভর্তুকি থেকে পর্যায়ক্রমে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। এছাড়া বিদ্যুতের দামে অর্থ বিভাগ ভর্তুকি সহায়তা দেয়। ফলে ঠিক কী পরিমাণ ভর্তুকি সরকার দিতে পারবে সে বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বিদ্যুৎ বিভাগ। ভর্তুকি পাওয়ার পর ঠিক কী পরিমাণ দাম বাড়ানোর প্রয়োজন পড়বে সেটিও বিবেচনায় রাখবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভর্তুকি শূন্য করতে হলে পাইকারি দাম বাড়িয়ে প্রতি ইউনিট ১২ টাকা ১১ পয়সা করতে হবে। তখন গ্রাহক পর্যায়ে দাম বেড়ে হবে ১৪ টাকা ৬৮ পয়সা। ধাপে ধাপে দাম সমন্বয় করলে জনগণের জন্য তা সহনীয় হবে।
দেশে গ্যাস সংকট ও জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে এরই মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, জ্বালানি আমদানির জন্য ২০২২-২৩ অর্থবছরে অতিরিক্ত ১৩ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়। এছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বহুগুণে বেড়ে গেছে কিন্তু বিপরীতে সক্ষমতা কমেছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্যানুযায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ টাকা ৮৬ পয়সা। ফলে দিন দিন পিডিবির অর্থ সংকটও তীব্র হচ্ছে। আবার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বড় অংশ বসে থাকায় বিদ্যুৎ চাহিদা ও উৎপাদনে অন্তত আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হয়েছে বিতরণ কোম্পানিগুলোকে। সুতরাং এসব বিবেচনায় বলা যায়, এ মুহূর্তে আগামীতে লোডশেডিং মোকাবেলায় ও পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো ব্যতীত ভিন্ন পথ অবলম্বন করা মুশকিল। কিন্তু গণমানুষের দুর্ভোগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় এই সমাধানে যাওয়া সংকট বাড়াবে ছাড়া কমাবে না। তাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে এবং বাস্তবায়নে তৎপর হওয়া জরুরি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি আর অপব্যয় রোধ করা গেলে বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়েও পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চত করা সম্ভব। এছাড়া জ্বালানি ও আমদানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে সরে আসতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত সৃষ্টি করে এবং কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে অগ্রসর হওয়া দরকার।
দেশের বিদ্যুৎ খাত মূলত নির্ভরশীল গ্যাসের ওপর। পরিসংখ্যান বলছে, চাহিদার তুলনায় বর্তমানে গ্যাসের উৎপাদন অতি নগণ্য। গ্যাস সংকটে চট্টগ্রাম, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার শিল্প এলাকার টেক্সটাইল মিলগুলো প্রায় অচলাবস্থায় দাঁড়িয়েছে। গত ১০ বছরে বড় কোনো মজুদ আবিষ্কার করা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো-ভিত্তিক কনসালট্যান্সি ফার্ম গুস্তাভসন অ্যাসোসিয়েটসের সমীক্ষামতে, দেশে গ্যাসের মজুদ পাওয়ার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশ। অনুমান করা হয় খনিগুলোয় গ্যাসের সম্ভাব্য মজুদ আছে ৩৮ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে সহায়ক হতে পারে গ্যাসের উত্তোলন বৃদ্ধি। সেক্ষেত্রে গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধানে আমাদের তৎপরতা বাড়াতে হবে। তাছাড়া কয়লার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনতে হবে। বর্তমানে ডলারের বাজার অস্থিতিশীল হওয়ায় আমদানি সংকটও তীব্র রূপ ধারণ করছে। অবশ্য ডলার সংকটের জন্য বিদ্যুতের অপ্রতুলতাও দায়ী। যেহেতু বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন খাত ও রফতানি বাণিজ্যও হুমকির মুখে। তাই বিদ্যুৎ সংকট সমাধান করতে দাম বাড়ানো আদৌ খুব বেশি সুফল বয়ে আনবে না। কেননা দাম বাড়া নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করছে না। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে। তাই দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়ানো এখন পরিস্থিতির দাবি। এতে আশা করা যায়, বিদ্যুৎ খাতের লোকসান দূর হবে এবং সরকারের ভর্তুকির দায়ও কমে আসবে।










