টিকে গ্রুপ মূলত আমদানিভিত্তিক কোম্পানি। একই সঙ্গে আমরা স্থানীয় পর্যায়ে পণ্য মজুদ ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করি। এ কাজগুলো করতে গিয়ে আমাদের কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু কথা বলব।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রায় ১৩০০। ভারতে এ সংখ্যা ৫০০-এর কম। পাকিস্তানে জনসংখ্যার ঘনত্ব ৪০০-এর নিচে। এ প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে যদি স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের বাংলাদেশের কথা বলি, সে সময় এ দেশকে আমরা চিনতাম দুর্ভিক্ষের দেশ, বন্যার দেশ হিসেবে। এমন অনেক চ্যালেঞ্জ নিয়ে আমরা স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে যাত্রা শুরু করেছিলাম। সেগুলো উতরে আমরা দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসেছি এবং অনুপ্রাণিত হওয়ার মতো অনেক অর্জন আমাদের আছে। তার পরও মনে করি সন্তুষ্ট হওয়ার মতো সুযোগ নেই। কারণ আমরা অতিমাত্রায় জনঘনত্বের দেশ। অতিরিক্ত মানুষের বাসস্থান সংস্থানের জন্য আবাদযোগ্য জমি অধিগ্রহণ করে চলেছি।
আমাদের প্রধান খাদ্যশস্য ধান। চাল উৎপাদনে আমরা বিশ্বে অষ্টম অবস্থানে রয়েছি। প্রতি হেক্টরে আমরা ধান উৎপাদন করি ৪ দশমিক ৫ টন, যেখানে অস্ট্রেলিয়া ১০, মিসর ৯, আমেরিকা ৮ দশমিক ৫ টন। চীন ৭, ভারতও ভালো করছে। মিয়ানমারও ৪ টন চাল উৎপাদন করছে। আমাদের এক্ষেত্রে উন্নয়ন ঘটানো প্রয়োজন।
ন্যায্যতা হলো ক্ষমতা ধারণ। একজন কৃষক তার উৎপাদিত শস্যের ওপর কতটা কর্তৃত্ব রাখেন এবং ক্রেতার সঙ্গে দরকষাকষি করতে পারেন সেটি হলো ওই কৃষকের ন্যায্যতা। এ ক্ষমতা কীভাবে আমরা কৃষককে দিতে পারি সেটা নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে।
আমরা লক্ষ করেছি প্রতি বছর উৎপাদনের মৌসুমগুলোয় সবজির দাম কমে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সবজির দাম ১৫ বা ২০ টাকায় নেমে আসে। মৌসুম শেষে সেসব সবজির দাম আবার ৬০-৮০ টাকা হয়ে যায়। অর্থাৎ হঠাৎ মূল্যস্তর ঊর্ধ্বমুখী হয়ে গেল। এটি খাদ্যপণ্য সরবরাহের সঙ্গে জড়িত।
মূল্যস্তরের এ হঠাৎ স্ফীত হওয়াটা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় তা নিয়ে ভাবতে হবে। এক্ষেত্রে কিছু পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। প্রথমত, কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হলে কৃষকদের শস্যের ওপর কর্তৃত্ব বজায় রাখার সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য একটি কাঠামোয় আনা প্রয়োজন। তাদের শস্য মজুদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি শস্য উৎপাদনের জন্য যা কিছু প্রয়োজন সেগুলোর সমন্বয় ঘটাতে হবে।
শুরুতেই কৃষক বা খামারিদের কীভাবে একটা কাঠামোয় আনা যায় সেটি নিয়ে বলা যাক। তাদের একক কাঠামোয় আনতে হলে সমবায় ব্যবস্থা খুবই প্রয়োজন। আমাদের সমবায় ব্যবস্থা কোনোভাবেই একটি আদর্শ দেশের জন্য উপযুক্ত নয়। আমাদের কৃষকরা নিজেদের জোগান নিজেরাই দেন। কিছু ক্ষেত্রে কৃষি মন্ত্রণালয় ও কিছু এনজিও সহযোগিতা করে। কিন্তু বেশির ভাগই নিজেদেরই করতে হয়। সমবায় ব্যবস্থা শক্তিশালী না হওয়ায় কোন মৌসুমে কী ধরনের শস্য উৎপাদন করবে, বৈচিত্র্যপূর্ণ শস্য উৎপাদনে জমির উর্বরতা বাড়বে কিনা সে বিষয়গুলো তারা জানেন না। তারা জানতে পারেন না কীভাবে উৎপাদিত শস্য বিক্রি করবেন, কীভাবে বাজারে প্রবেশ করবেন। এক্ষেত্রে আমাদের সরকারি ও বেসরকারিভাবে জোর দেয়া উচিত।
বাংলাদেশের কৃষিতে সবচেয়ে সমস্যা হলো কো-অপারেশনের অভাব। উৎপাদন, সরবরাহ, মজুদ, প্রক্রিয়াকরণে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে কৃষক ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে এটা না থাকা। যেমনটা দেখা যায় তাইওয়ানে। সেখানে কৃষকের জন্য কো-অপারেটিভ অফিস আছে, তারা ব্যাংক সুবিধাও পান। তাদের সুন্দর একটি ব্যবস্থাপনা রয়েছে এবং সেখানে কৃষকদের সহজ প্রবেশের সুযোগ থাকে। যার কারণে অনেকে চাকরিজীবন শেষে গ্রামে ফিরে কৃষিকাজ করেন। বাংলাদেশেও এ খাতে গুরুত্ব দেয়া জরুরি।
সেই সঙ্গে জরুরি কৃষিসংক্রান্ত নির্ভুল তথ্য। আমাদের কৃষিসংক্রান্ত যে তথ্যগুলো আছে, সেগুলোয় এখনো আস্থার ঘাটতি আছে। এক্ষেত্রে আস্থা ফেরাতে হবে। আমরা যদি সে ডাটাবেজগুলো জনপরিসরে নিয়ে আসতে পারি তাহলে তা কৃষক ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে মজুদের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে আমাদের বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। মজুদ না করার কারণে অনেক ফল বা সবজি নষ্ট হয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা মজুদ ব্যবস্থাপনা কম। কৃষকরা তাদের পণ্য উৎপাদন করেন ঠিকই, কিন্তু অতিরিক্ত উৎপাদিত পণ্য মজুদ করার সুযোগ পান না। যার কারণে অনেক শস্য নষ্ট হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে আমরা যদি মজুদের ব্যবস্থা করতে পারি তাহলে পরবর্তী সময়ে সেটি চাহিদা মেটাতে পারবে। এজন্য প্যাকেজিংয়ের মানও উন্নয়ন করা যেতে পারে। বাংলাদেশে অনেক ভালো মৌসুমি ফল পাওয়া যায়—কলা, আনারস, কাঁঠাল। বিদেশে এগুলোর চাহিদা আছে। কিন্তু অনেক বিদেশী কোম্পানি এগুলো সংগ্রহে এসে খালি হাতে ফেরত যায়। কারণ আমাদের প্যাকেজিং উন্নত নয়। ডিহাইড্রেশন প্লান্ট নেই আমাদের। যথাযথ পদ্ধতিতে সংরক্ষণের অভাবে মূলত মৌসুমগুলোয় খাদ্যপণ্যের দাম পড়ে যেতে দেখি আমরা। উন্নত প্যাকেজিং ব্যবস্থার পাশাপাশি উন্নত শুকানো পদ্ধতির প্রচলন করা যেতে পারে। অনেকে সময় দেখা যায় আর্দ্রতার কারণে ধান নষ্ট হয়। ধান সূর্যের তাপ বা কৃত্রিম পদ্ধতিতে যথাযথভাবে শুকিয়ে নিতে পারি।
এভাবে সঠিক উপায়ে পণ্য মজুদ করা জরুরি। কারণ প্রতি বছর যদি ১০-১৫ শতাংশ পণ্য মজুদের অভাবে নষ্ট হয় তাহলে মুনাফা করা সম্ভব নয়। প্রতি বছর সরকারের কাছে আরো ভর্তুকি চাইতে হবে। সেই সঙ্গে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশে বীজ, সার, কীটনাশক উৎপাদন করার উদ্যোগ প্রয়োজন।
কৃষিপণ্য উৎপাদনে কৃষকের প্রয়োজন বীজ, সার, কীটনাশক ইত্যাদি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এগুলোর ক্ষেত্রে আমরা আমদানিনির্ভর। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন খুব কম।
উৎপাদনের শুরু থেকে বিপণন পর্যন্ত আমাদের সঠিক নীতিমালা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে কৃষিপণ্যের প্রকৃত চাহিদা, কোন পণ্য কোথায় বেশি উৎপাদন হয় এসব তথ্য নিশ্চিত করা আবশ্যক। সরকার যদি এসব উদ্যোগ নিতে পারে ও এর বাস্তবায়ন হয় তাহলে কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বাড়বে বলে মনে করি।
মোহাম্মাদ মুস্তাফা হায়দার: গ্রুপ ডিরেক্টর, টিকে গ্রুপ
[বণিক বার্তা আয়োজিত কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও প্রাণ-প্রকৃতি সম্মেলনের ‘খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষকের ন্যায্যতা’ বিষয়ক অধিবেশনে প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে]










