দেশের মূল ভূখণ্ডের কেবল পূর্বাংশে এলাকা বিশেষে অনুসন্ধান জোরালো হয়েছে। তবে দেশের দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর অংশে গ্যাসের অনুসন্ধান সামান্য। এমনকি পূর্বাংশের পার্বত্য চট্টগ্রামও জোরালো অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়নি। দেশের সম্ভাবনাময় সমুদ্রবক্ষও জোরালো গ্যাস অনুসন্ধানের আওতায় এখনো আসেনি। এ পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করার স্বার্থে সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে অতিদ্রুত সময়োচিত সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার জোরালো অনুসন্ধান করে যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের অভাবে এক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে পড়েছি। দেশটি গ্যাস খাতে যথেষ্ট সম্ভাবনাময়। দেশে ২০১৭ সাল থেকে গ্যাস উৎপাদন কমতে থাকে, তা বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে। দেশের শিল্প, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খাতে গ্যাসের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। সরকার যখন শিল্প, বিদ্যুৎ ও আবাসিক খাতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ বা সীমিত করে তখন তা দৃশ্যমান হতে থাকে। গ্যাস সংকট লাঘবের জন্য বাংলাদেশ ২০১৮ সালে উচ্চমূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি শুরু করে। দেশের বিরাজমান গ্যাস সংকট মোকাবেলায় আমদানিনির্ভরতাকেই বেছে নেয় জ্বালানি বিভাগ, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হিসেবে বিবেচিত এবং ভবিষ্যতে এর ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে। এতে উৎপাদন ব্যয়েও পড়ছে প্রভাব। এলপিজি আমদানি করেও দেশের চলমান সংকট নিরসন হচ্ছে না।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, দীর্ঘ সময় ধরে দেশে আবাসিকে পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ বন্ধ। যেসব লাইন রয়েছে সেখানেও গ্যাসের তীব্র সংকট। একই সঙ্গে শিল্প-কারখানায় প্রতিনিয়ত গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিয়ে অসন্তোষে ব্যবসায়ীরা। এসব কারণে দেশে এলপিজির ব্যবহার বাড়ছে, যার বার্ষিক চাহিদা ১৪ লাখ টন। এর ৯০ শতাংশের ব্যবহার বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে। এরই মধ্যে অটোগ্যাস হিসেবে এটি গাড়িতে ব্যবহার শুরু হয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সংযোগ না থাকায় ভারী ও মাঝারি শিল্পের অন্তত পাঁচ শতাধিক কারখানাও এখন এলপিজি ব্যবহার করছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বর্তমানে বিভিন্ন খাতের অন্তত এক হাজারের বেশি কারখানায় এলপিজির সংযোগের কাজ চলছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, শিল্পে এলপিজি ব্যবহারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এটি প্রাকৃতিক গ্যাসের তুলনায় ব্যয়বহুল। তবে ডিজেলের তুলনায় সাশ্রয়ী। বর্তমানে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম শিল্পে ৩০ টাকা। আর এলপিজির দাম প্রতি কেজি ১১৯ টাকা ৪০ পয়সা, প্রতি লিটারের (অটোগ্যাস) দাম ৬৫ টাকা ৭৬ পয়সা। এ দাম শুধু জানুয়ারির জন্য কার্যকর। জানা গেছে, দেশের বাজারে এলপিজি সরবরাহে নিয়োজিত রয়েছে ৩০টি দেশী ও বহুজাতিক কোম্পানি। এর মধ্যে বসুন্ধরা, ওমেরা, ফ্রেশ, যমুনা, বিএমসহ আরো কয়েকটি কোম্পানি বাজারজাতের শীর্ষ তালিকায় রয়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে এরই মধ্যে সরকার পিএসসির (প্রডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট) অনুমোদন দিয়েছে। তবে অনুমোদনের ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত দরপত্র আহ্বান করা যায়নি। এক্ষেত্রে দেশে গভীর ও অগভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে ‘মডেল পিএসসি ২০২৩’ অনুযায়ী এক্সনমবিলের মতো জায়ান্ট কোম্পানির প্রস্তাবের বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে এখনো সে প্রস্তাবের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এছাড়া তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে কনোকো-ফিলিপসের সঙ্গে চুক্তি হলেও তা সাফল্যের মুখ দেখত বলে মত এসেছে। একদিকে দেশী প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার ঘাটতি, অন্যদিকে বিদেশী কোম্পানির সঙ্গে ফলপ্রসূ চুক্তি না হলে গ্যাস উত্তোলনে বাংলাদেশকে সুদীর্ঘকাল অপেক্ষা করতে হবে, এমনটিই মত বিশেষজ্ঞদের।
দেশের চলমান জ্বালানি সংকট নিরসনে দেশীয় গ্যাসের মজুদ বাড়ানো বা অবশিষ্ট মজুদ থেকে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। দেশের নিজস্ব গ্যাসের জোগান বজায় রেখে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনা দরকার। এ জ্বালানি সংকট কাটিয়ে উঠতে টেকসই কার্যক্রম হাতে নেয়া দরকার। দেশে প্রতি বছর অনুসন্ধান কূপের সংখ্যা বাড়াতে হবে। দেশের মূল ভূখণ্ডের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকায় এখনো জোরালো অনুসন্ধান হয়নি। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অধীনে এটি চলমান থাকা সামগ্রিকভাবে গ্যাস সংকট সমাধানের মোক্ষম উপায়। এসব উদ্যোগ টেকসই হবে। দেশে নিজস্ব কারিগরি ও ব্যবস্থাপনা সক্ষমতাকে বাড়াতে হবে।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি করতে গিয়ে তীব্রভাবে আর্থিক সংকটে পড়েছে পেট্রোবাংলা। সংস্থাটি পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে কখনো গ্যাস উন্নয়ন তহবিল, আবার কখনো আন্তর্জাতিক ঋণদাতার দ্বারস্থ হয়েছে। জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা দেশে গ্যাস খাত দেনার দায়ে জর্জরিত হওয়ার পেছনে স্থানীয় পর্যায়ে জ্বালানি অনুসন্ধানে বিমুখতা ও এলএনজির আমদানি বাড়ানোকে দায়ী করেছেন। অথচ এক্ষেত্রে বিনিয়োগ করে বাংলাদেশের প্রতিবেশী দুটি দেশ ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে। তাই গ্যাস সংকট অবসানে আর কালক্ষেপণের সুযোগ নেই। প্রতিবেশী দেশগুলোর মডেল অনুসরণ করে আমাদেরও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এক্ষেত্রে আরো বিলম্ব করলে জ্বালানি খাতের নিরাপত্তা অধরাই থেকে যাবে।










