কয়েকদিন পরপর কোনো না কোনো খাদ্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। কয়েক দশক ধরেই পেঁয়াজ, লবণ, চিনি ও চালের বাজারে নিয়মিত বিরতিতে অস্থিরতা দেখা গেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কাঁচামরিচ, টমেটোর মতো সবজিও এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে। বছর দুয়েক ধরে চলা করোনা মহামারী ও গত বছর শুরু হওয়া ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে খাদ্যপণ্যের বাজারে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি দেখা গেছে। এরই মধ্যে অনেক দেশ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হলেও বাংলাদেশ রয়ে গেছে ব্যর্থদের তালিকায়। গত বছর দেউলিয়া হওয়া শ্রীলংকাও যেখানে মূল্যস্ফীতি এক অংকে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে সেখানে তার দক্ষিণ এশীয় প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও পাকিস্তান হিমশিম খাচ্ছে। 

বাংলাদেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতির পেছনে বড় ভূমিকা রাখে অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা। মাঝেমধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগও এতে ভূমিকা রাখে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো। যেসব খাদ্যপণ্যের বাজারে নিয়মিত অস্থিরতা দেখা দেয় সেগুলোর উৎপাদন বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে উচ্চফলনশীল ফসল উৎপাদনে দেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। 

আমাদের প্রধান খাদ্যশস্যের জন্য অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা যে আমাদের নাজুক পরিস্থিতিতে ফেলছে তা বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়, বাংলাদেশে আমদানীকৃত চালের ৭৩ শতাংশ আসে ভারত থেকে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে গত বছর বাসমতী ছাড়া অন্যান্য চাল রফতানিতে ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল ভারত। এর পরও দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। গত বছরের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে চালের দাম বেড়েছে ৩০ শতাংশের বেশি। এ অবস্থায় গত ২০ জুলাই থেকে সব ধরনের নন-বাসমতী চাল রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ভারত সরকার। 

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত বিশ্ববাজারে চালের দাম ১৫-২০ শতাংশ বেড়েছে বলে আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইএফপিআরআই) তথ্যে উঠে এসেছে। প্রধান প্রধান খাদ্যশস্যের মূল্যবৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতি মাসে হালনাগাদকৃত বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা সংক্রান্ত ডাটাবেজের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীতে এখন খাদ্য মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বেশি ভেনিজুয়েলায়। জুনে দেশটিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৪১৪ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ায় এ সময় খাদ্য মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বেশি ছিল পাকিস্তানে—৩৯ দশমিক ৫ শতাংশ। বাংলাদেশ ছিল এর পরের অবস্থানে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে বাংলাদেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। সর্বশেষ গত মাসে তা আরো বেড়ে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৭৬ শতাংশে। আবার গত বছর নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করা শ্রীলংকা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এরই মধ্যে বেশ ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। জুনে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার মাত্র আড়াই শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে দেশটি।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, খাদ্যশস্য আমদানিতে একক একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বাংলাদেশকে খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ে নাজুক পরিস্থিতিতে ঠেলে দিয়েছে। আমদানিতে উৎসে বহুমুখিতা বা বৈচিত্র্য না থাকলে এবং একক উৎসে নির্ভরতা বেশি হলে ঝুঁকিও সবসময় বেশি হয়। নীতিনির্ধারকরা পূর্বপ্রস্তুতি ও ভূকৌশলগত মুনশিয়ানার পরিচয় না দেয়ায় সাধারণ জনগণকে বারবার এর খেসারত দিতে হচ্ছে বলে মনে করেন তারা। 

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট ১০ লাখ ৫৫ হাজার টন চাল আমদানি করে বাংলাদেশ। সরকারিভাবে চাল আমদানি করা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৩৪ হাজার টন। আর বেসরকারিভাবে চাল আমদানি করা হয়েছে ৪ লাখ ২১ হাজার টন। এ সময় দেশে গম আমদানি হয়েছে ৩৮ লাখ ৭৫ হাজার টন। এর মধ্যে সরকারিভাবে এসেছে ৬ লাখ ৭৯ হাজার টনের কিছু বেশি। বেসরকারিভাবে আনা হয়েছে ৩১ লাখ ৯৫ হাজার টনের বেশি। আগে বাংলাদেশের গম আমদানিতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের ওপর নির্ভরতা ছিল বেশি। যদিও সহজ উৎস হিসেবে এ দুই দেশের মধ্যে চলমান যুদ্ধ শুরুর আগেই গমের প্রধান আমদানি উৎস হয়ে উঠেছিল ভারত। যুদ্ধ শুরুর সময়েই গম আমদানিতে বাংলাদেশের ভারতনির্ভরতা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৭০ শতাংশে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ বাজার ঠিক রাখতে যুদ্ধ শুরুর পরের মাসেই (গত বছরের মার্চে) গম রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ভারত। এ অবস্থায় বাংলাদেশের জন্য বিকল্প উৎস নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

এদিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে ঘটা বিভিন্ন পরিবর্তনে আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ইউক্রেন-রাশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘‌কৃষ্ণ সাগরীয় শস্য চুক্তি’ বাতিল হওয়ায় গমের জন্য বড় সংকটে পড়বে বাংলাদেশ। এ চুক্তির অন্যতম সুবিধাভোগী ছিল আমাদের দেশটি। ভারতে গমের দাম বৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য আরো শঙ্কার। প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় ভারত থেকে আমদানি অনেকটা সহজ ও সাশ্রয়ী। বিকল্প উৎস হিসেবে মধ্য আমেরিকা বা ইউরোপের অন্যান্য দেশের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ালেও গমের মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো কঠিন হবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। 

খাদ্যশস্য আমদানিতে ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা খাদ্যশস্যের বাজারে অনিরাপত্তার অন্যতম কারণ। তুলনামূলক দাম কম ও পরিবহন খরচ কম হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই ভারত থেকে আমদানি বেশি করা হয়। কিন্তু সংকটকালে ভারত চাল ও গম রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা দিলে স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশ বিপদে পড়ে। কয়েক বছরে পেঁয়াজের দাম আকাশচুম্বী হওয়া, চাল ও গমের দাম বৃদ্ধি হওয়ার পেছনে অতিরিক্ত ভারতনির্ভরতার ভূমিকা রয়েছে। 

সাম্প্রতিককালে করোনা মহামারী ও ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে খাদ্যনিরাপত্তা কত জরুরি। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের জন্য আমদানিনির্ভরতা খাদ্যনিরাপত্তা বিঘ্নিত করে। এর অন্যতম ভুক্তভোগী আফ্রিকা ও এশিয়ার আমদানিনির্ভর দেশগুলো। অভ্যন্তরীণ খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে গবেষণার ওপর গুরুত্ব দেয়া জরুরি। জলবায়ুসহিষ্ণু জাত, উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাত উদ্ভাবনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। অল্প জমিতে স্বল্প সময়ে অধিক ফলন উৎপাদনের মাধ্যমে আমরা মৌসুমি বিভিন্ন সংকট মোকাবেলা করতে পারি। অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি আমলে নিয়ে নিজস্ব উৎপাদনে জোর দিতে হবে এবং প্রধান খাদ্যপণ্যগুলো উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের চেষ্টা করতে হবে।