দেশে স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের দিক থেকে চালের পরই আলুর অবস্থান। বর্তমানে বৈশ্বিক আলু উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। দেশে চাহিদার চেয়ে আলু উৎপাদন বেশি হচ্ছে। পণ্যটির উৎপাদন খরচও কম। তার পরও বাজারে পণ্যটির দাম উৎপাদন খরচের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি। দামের এ ব্যবধানের জন্য দায়ী মধ্যস্বত্বভোগী, মজুদদার ও ব্যবসায়ীরা। কেননা মৌসুমের শুরুতেই কৃষকদের কাছ থেকে তারা কম দামে পণ্যটি কিনে মজুদ করে। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এরপর তারা বেশি দামে পণ্যটি সরবরাহ করে। ফলে তাদের কারসাজির কারণেই পণ্যটির দাম বাড়ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে আলুর সর্বোচ্চ বার্ষিক চাহিদা ৮০ লাখ টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে আলু উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ১০ লাখ টনের কাছাকাছি। গত অর্থবছরে বাংলাদেশে আলু উৎপাদন হয়েছে চাহিদার চেয়ে অন্তত প্রায় ৩০ লাখ টন বেশি। আর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, এসব আলু উৎপাদনে কেজিপ্রতি খরচ পড়ে মাত্র ১০ টাকা ৫১ পয়সা। যদিও রাজধানীর খুচরা বাজারে এখন প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা দরে। উৎপাদন খরচের চেয়ে পাঁচ গুণের বেশি দাম কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়।
হিমাগার মালিকদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, চলতি বছর কৃষক আলুর কেজিতে ২০ টাকার বেশি লাভ করেছেন। আর তারা ভাড়ার বিনিময়ে আলু সংরক্ষণ করে থাকেন। হিমাগারে রাখা আলুর প্রায় ৭০ শতাংশই কৃষক ও ব্যবসায়ীদের। কৃষক পর্যায়ে আলুর কেজি ছিল ৩০ টাকা। তারা ১০ টাকা ভাড়া রাখেন। আর ৫ টাকা লাভ করার পর স্বাভাবিকভাবেই দাম পড়ে ৪৫ টাকা।
কিন্তু হিমাগার মালিকদের বক্তব্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কৃষকদের বক্তব্যের মিল নেই। কৃষকরা বলছেন, এ বছর কৃষকরা মাঠ থেকেই প্রতি কেজি আলু ১৫-২০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। সংরক্ষণের অভাবে ও চাষাবাদের জন্য আর্থিক প্রয়োজনে মৌসুমের শুরুতেই তারা তাদের সিংহভাগ আলু কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। এ সময় মজুদদার ও ব্যবসায়ীরা কম দামে কেনা আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেন। তাদের কারসাজির কারণে পণ্যটির দাম দ্রুত বাড়তে থাকে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বগুড়া ও জয়পুরহাট জেলায় এবার প্রায় ৯৪ হাজার হেক্টর জমিতে ২০ লাখ ১৭ হাজার টন আলু উৎপাদন হয়েছে। সংরক্ষণ জটিলতা ও খরচ তুলতে কৃষকরা বেশির ভাগ আলু মাঠ থেকেই বিক্রি করে দেন। বর্তমানে দুই জেলার ৬১টি হিমাগারে সংরক্ষিত আছে ৫ লাখ ২০ হাজার ৫০০ টন আলু। ব্যবসায়ী ও মজুদদাররা এসব আলু সংরক্ষণ করেছেন। হিমাগারে প্রতি কেজি আলু সংরক্ষণে ৭-৮ টাকা খরচ হয়। গত মৌসুমে ৬০ কেজি ওজনের এক বস্তা আলু হিমাগারে রাখতে ভাড়া ছিল ২৮০ টাকা। এ মৌসুমে সেই ভাড়া বাড়িয়ে করা হয়েছে ৩৫০ টাকা। হিমাগার পর্যায়ে আলুর দাম বেড়ে যাওয়ায় হিমাগার মালিকরা গুদাম ভাড়া বাড়িয়েছেন। গত মৌসুমে আলু সংরক্ষণ করে কয়েক গুণ মুনাফা করেছেন মজুদদারি ও ব্যবসায়ীরা। ফলে এবার অনেক নতুন ব্যবসায়ী হিমাগারে আলু সংরক্ষণে বিনিয়োগ করেছেন।
কিন্তু উৎপাদন পর্যায়ে পণ্যটির দাম ১৫-২০ টাকা থাকলেও তাদের কারসাজিতে বাজারে কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। দেশে বর্তমানে মূল্য অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাওয়া পণ্যগুলোর অন্যতম আলু। গত বছরও একই অবস্থা ছিল। সরকারের নানা পদক্ষেপেও পণ্যটির দাম নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এক পর্যায়ে আলু আমদানির অনুমতি দেয়া হয়। আমদানি এখনো উন্মুক্ত আছে। অথচ চাহিদার চেয়ে উৎপাদন বেশি হওয়ায় গত কয়েক বছর আলু রফতানি করে বাংলাদেশ। ২০২৩ সালে আলু রফতানির জন্য রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তিও করেছে সরকার। এখন রফতানির পরিবর্তে আলু আমদানির অনুমতি দেয়া হয়েছে।
এদিকে উৎপাদনের সরকারি তথ্য নিয়েও বড় ধরনের সংশয় প্রকাশ করছেন অনেকেই। সরকারি তথ্য-উপাত্তের প্রতি মানুষের আস্থা ফেরাতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্ভুল তথ্য প্রকাশে দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। এজন্য সরকারকেই উদ্যোগ নিয়ে কাজ করা দরকার। সঠিক তথ্য উপাত্ত থাকলে বাজার ব্যবস্থাপনা সরকারের জন্য সহায়ক হবে।
মজুদ করা দোষের কিছু নয়, এটি বিপণন কার্যক্রমের অংশ। তবে মজুদের মাধ্যমে পণ্যবাজার অস্থিতিশীল করা অপরাধ। পণ্যের দাম বাড়লে চরম বিপাকে পড়ে নিম্ন আয়ের মানুষ। মজুদদার ও ব্যবসায়ী চক্রের কাছে ভোক্তারা জিম্মি হয়ে পড়ে। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য আলুর বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকেই উদ্যোগী হতে হবে। প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা ও বাস্তব পরিকল্পনা। দেশের উৎপাদন ব্যবস্থার পুরোপুরি সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া পণ্য পরিবহন নির্বিঘ্ন রাখতে বিশেষ করে কৃষিপণ্যের সরবরাহে যাতে কোনো বাধার সৃষ্টি না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে সংশ্লিষ্টদের। আলুর দাম যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে প্রয়োজন বাজারের শক্ত তদারকি ও পদক্ষেপ। স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, কৃষি বিভাগ, জনপ্রতিনিধিসহ সবাই সম্মিলত উদ্যোগ নিলে আলুর দাম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।










