দেশে ডেঙ্গু ভাইরাসজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েই চলেছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। আক্রান্ত রোগীর অনুপাতে মৃত্যুর হারও এবার সর্বোচ্চ। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবকে মহামারী (এনডেমিক) হিসেবে অভিহিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সামনে এ পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে বলে জাতিসংঘের সংস্থাটির আশঙ্কা। ফলে সংস্থাটির পক্ষ থেকে দ্রুত বহুমুখী পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ডব্লিউএইচও। দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি মহামারী (এনডেমিক) হয়ে উঠেছে এমন কথা প্রতিবেদনটিতে বেশ কয়েকবার উল্লেখ করা হয়েছে। এনডেমিক বা মহামারী বলতে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) ব্যাখ্যায় একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় রোগের ক্ষেত্রে অপ্রত্যাশিত বৃদ্ধির হারকে বলা হয়। এক্ষেত্রে দেখা হয় রোগের হার স্পষ্টভাবে একটি সম্প্রদায় বা অঞ্চলে প্রত্যাশিত ঘটনার চেয়ে বেশি।
সংক্রমণের প্রাবল্য দেখা দেয়ায় দেশে ২০০০ সালে ডেঙ্গুকে রোগতত্ত্বের গুরুত্ব দেয়া হয়। বিশ্বে ১৭৮০ সালে প্রথম ডেঙ্গু দেখা দেয়। এরপর ১৯৫০ সালে এশিয়ার থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনে ডেঙ্গু সংক্রমণ ছড়ায়। পরে ১৯৬৩ সালে ভারতের কলকাতা ও ১৯৬৪ সালে ঢাকায় সংক্রমণ ঘটায় ডেঙ্গু। সে কারণে তখন ডেঙ্গুকে ঢাকা ফিভার নামে অভিহিত করা হয়। কিন্তু ডেঙ্গু এখন শুধু ঢাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এর সংক্রমণ পুরো দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গু রোগী ও মৃত্যুর যে তথ্য জানায় তা পরিপূর্ণ নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অধিদপ্তরের ভাষ্যমতে, মূলত রাজধানী ঢাকায় ২০টি সরকারি ও ৫৭টি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগী ও সব জেলা থেকে সরকারিভাবে প্রাপ্ত তথ্য দেয়া হচ্ছে। এর বাইরে অসংখ্য রোগী দেশের বিভিন্ন ক্লিনিক, ছোট-বড় হাসপাতাল ও বাড়িতে চিকিৎসা নিলেও সে তথ্য সংশ্লিষ্টদের কাছে নেই। যে কারণে পরিপূর্ণ তথ্য না থাকায় দেশে ডেঙ্গুর প্রকৃত চিত্র জানা যাচ্ছে না বলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য। তাদের ভাষ্যে, সঠিক তথ্য যেকোনো রোগের বিরুদ্ধে কর্মকৌশল নির্ধারণে সাহায্য করে। আর কোনো রোগই হাসপাতালকেন্দ্রিক সীমাবদ্ধ নয়। হাসপাতালের বাইরে যেসব রোগী রয়েছে তাদের পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে না। সব মিলিয়ে মশাবাহক রোগ নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি, এলাকাভিত্তিক রোগ ও রোগী ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। ফলে ডেঙ্গু দেশের অন্যতম সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের শতাধিক দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব থাকলেও রোগীর অনুপাতে মৃত্যু বাংলাদেশে বেশি।
এদিকে ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোনো কোনো এলাকায় বেশ মারাত্মক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রে কীটতত্ত্ববিদদের মাধ্যমে জরুরি পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। এছাড়া চিকিৎসাসেবার বিষয়টি সমন্বিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। এডিস মশা নির্মূল, রোগ ও রোগী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কারিগরি পদক্ষেপের ঘাটতিও লক্ষণীয় রয়েছে। সব মিলিয়ে দেশে ডেঙ্গুর জন্য জনস্বাস্থ্যের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলা যায়।
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, ডেঙ্গু ভাইরাসজনিত রোগে প্রতি বছর ৪০ কোটি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। সংস্থাটির মতে, পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক মানুষ এখন ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশ্বব্যাপী গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপগ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলবায়ুতে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব হয়। এদিকে ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। প্রাথমিকভাবে শনাক্তকরণ ও উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা রোগীকে সুস্থ করে তোলে এবং মৃত্যুহার কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়।
ডেঙ্গু বর্তমানে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এখনই যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এ কারণে সরকারকে আরো সচেষ্ট হতে হবে। বিশেষ করে করোনার সময় যেভাবে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছিল, তা ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে করা হচ্ছে না। এটি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কেননা ডেঙ্গু শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়। কভিড-১৯ মহামারীর সময় সারা দেশে যেমন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল, সেটি ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও কার্যকর করা উচিত। এতে পুরো দেশের ডেঙ্গুর চিত্র জানা সম্ভব হবে। মূলত যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তার চেয়ে প্রকৃত তথ্য নিঃসন্দেহে আরো ভয়াবহ।
এমন পরিস্থিতিতে কোনো ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী যেন চিকিৎসাবঞ্চিত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। এক্ষেত্রে সাধারণ প্র্যাকটিশনারদের মাধ্যমে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। ডেঙ্গুর গাইডলাইন অনুযায়ী চিকিৎসা যেন সব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে প্রদান করা হয় তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আর ডেঙ্গুর ভয়াবহতা এড়াতে বহুমাত্রিক সমন্বিত পদক্ষেপের কোনো বিকল্প নেই। এছাড়া এডিস মশাকে নির্মূলে কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি আগেও দেখা গেছে। এ কারণে সমন্বয়হীনতার যে অভিযোগ বর্তমানে তোলা হচ্ছে, তা নতুন কিছু নয়। এক্ষেত্রে অবহেলা আমাদের জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলবে। সেই সঙ্গে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নিতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে এর বিকল্প নেই। পাশাপাশি চিকিৎসা উপকরণ ও ওষুধের কোনো সংকট যেন না দেখা দেয় সেক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে। তার পরও প্রয়োজন দেখা দিলে পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় জনস্বাস্থ্যের জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিষয়টি খতিয়ে দেখা যেতে পারে।










