দেশের খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা বিধান, বেকার সমস্যার সমাধান ও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, জমির উর্বরতা বৃদ্ধি, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, নারীর ক্ষমতায়ন, সাধারণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন এবং মেধাসম্পন্ন জাতি গঠনের জন্য প্রাণিসম্পদ অপরিহার্য খাত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সূচিত পথ ধরে তারই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। দেশের ক্রমবর্ধমান প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগির টেকসই জাত উন্নয়ন এবং রোগ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে উৎপাদন দ্বিগুণ করার কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে কৃষিজ জিডিপিতে স্থিরমূল্যে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ১৬ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং জাতীয় দেশজ উৎপাদনে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান প্রায় ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ। জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ প্রত্যক্ষ ও ৫০ শতাংশ পরোক্ষভাবে প্রাণিসম্পদ খাতের ওপর নির্ভরশীল। দেশের প্রাণিজ আমিষের ৭০-৭৫ শতাংশ আমিষ এ প্রাণিসম্পদ খাত থেকে সরবরাহ হয়ে থাকে। সর্বোপরি, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি নিয়োগ, সক্ষমতা বৃদ্ধি, ভ্যালু চেইন ব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত সহায়তা বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব প্রাণিজাত পণ্য উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে রূপান্তরের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। নিম্নে দেশের জনগোষ্ঠীর উন্নত জীবন ও পুষ্টিনিরাপত্তা বিধানে প্রাণিজ আমিষের গুরুত্ব উপস্থাপন করা হলো:

দুধের উৎপাদন ও পুষ্টিগুণ: প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে সারা দেশে মোট ১৪০ দশমিক ৬৮ লাখ মেট্রিক টন দুধ উৎপাদন হয়েছে। ফলে দেশে মাথাপিছু দৈনিক ২৫০ মিলি দুধের চাহিদার বিপরীতে প্রায় ২২১ দশমিক ৮৯ মিলি দুধ সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে, যার পরিমাণ প্রতি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখানে উল্লেখ্য, সরবরাহকৃত ২২১ দশমিক ৮৯ মিলি দুধের মধ্যে তরল দুধ এবং দুধ হতে উৎপাদিত পণ্য যেমন: দই, ছানা, মিষ্টি, আইস ক্রিম, পনির, ঘি, মাঠা ও অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্য রয়েছে, যা খুবই পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত। দুধ একটি সম্পূর্ণ ও আদর্শ খাদ্য এবং এটি উৎকৃষ্ট আমিষের উৎস। আয়রন ছাড়া সব প্রয়োজনীয় ভিটামিন এবং মিনারেলস দুধে বিদ্যমান। দুধে এল-ট্রিপটোফেন নামক এমিনো অ্যাসিড থাকায় দুধ খেলে ভালো ঘুম হয়। দুধ থেকে তৈরি ইউগার্ট প্রবায়োটিক হিসেবে কাজ করে যা হজম শক্তি এবং শরীরের ইমিউন ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এক কাপ দুধে প্রায় ১৪০-১৫০ কিলোক্যালরি শক্তি, ৮-১০ মিলিগ্রাম মানসম্মত ফ্যাট, ৮-১০ মিলিগ্রাম উন্নত প্রোটিন, ১৩-১৫ মিলিগ্রাম শর্করা, ২৪-২৫ মিলিগ্রাম ঝুঁকিবিহীন কোলেস্টেরল, ৯৮-১০০ মিলিগ্রাম সোডিয়াম, ভিটামিন, মিনারেলস ও অন্যান্য পুষ্টি উপকরণ থাকে।

ডিমের উৎপাদন ও পুষ্টিগুণ: প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে সারা দেশে মোট ২ হাজার ৩৩৭ দশমিক ৬৩ কোটি ডিম উৎপাদন হয়েছে। ফলে দেশে মাথাপিছু বছরে ১০৪টি ডিমের চাহিদার বিপরীতে প্রায় ১৩৪টি ডিম সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে, যার পরিমাণ প্রতি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। সে অনুযায়ী বাংলাদেশ ডিম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। তবে সামগ্রিকভাবে দেশের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, সাধারণ জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিমের চাহিদা ও গ্রহণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং সে অনুযায়ী প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ডিমের এ চাহিদা পুনরায় নির্ধারণ করেছে। এ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১ বাস্তবায়নে বছরে মাথাপিছু ২০৮টি ডিমের চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ হিসাবে জনপ্রতি সপ্তাহে গড়ে চারটি ডিম এবং ডিম হতে উৎপাদিত পণ্য যেমন পুডিং, কেক, এগ এলবুমিন, এগ ইয়ক পাউডার ইত্যাদি গ্রহণ করবে, যা খুবই পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত। ডিম একটি সম্পূর্ণ নিউট্রিয়েন্ট পিল। ডিমের আয়রন হিম পদ্ধতিতে থাকে বিধায় মানবশরীরের রক্তে হিমোগ্লোবিন তৈরিতে দ্রুত সহায়তা করে। ডিম ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে ও শরীরের ওজন কমায় এবং বুড়িয়ে যাওয়া রোধ করে। চামড়া মসৃণ রাখে এবং ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। ডিম খেলে দৃষ্টিশক্তি ও স্মৃতিশক্তি প্রখর থাকে। ডিমের স্যাটাইটি ভ্যালু বেশি বিধায় ডিম খেলে পরিতৃপ্তি নিশ্চিত হওয়ার কারণে অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় খাবার গ্রহণ কম হয়ে থাকে। একটি সম্পূর্ণ ডিমে প্রায় ৬ গ্রাম মানসম্মত প্রোটিন, ৫ গ্রাম উন্নত ফ্যাটি অ্যাসিড, ৭০-৭৭ কিলোক্যালরি শক্তি, ১৭৫-২১০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল, ১০০-১৪০ মিলিগ্রাম কোলিন, ভিটামিন, মিনারেলস ও অন্যান্য পুষ্টি উপকরণ থাকে।

মাংসের উৎপাদন ও পুষ্টিগুণ: প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে সারা দেশে মোট ৮৭ দশমিক ১০ লাখ মেট্রিক টন দুধ উৎপাদন হয়েছে। ফলে দেশে মাথাপিছু দৈনিক ১২০ গ্রাম মাংসের চাহিদার বিপরীতে প্রায় ১৩৭ দশমিক ৩৮ গ্রাম মাংস সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে, যার পরিমাণ প্রতি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখানে উল্লেখ্য, সরবরাহকৃত ১৩৭ দশমিক ৩৮ গ্রাম মাংসের মধ্যে রান্না করা মাংস এবং মাংস হতে উৎপাদিত পণ্য, যেমন মিট বল, মিট বার্গার, মিট কাটলেট, চিকেন বার্গার, চিকেন নাগেট, ফ্রাইড চিকেন, চিকেন স্যান্ডউইচ ও অন্যান্য মাংসজাত খাদ্যপণ্য রয়েছে, যা খুবই পুষ্টিকর, উপাদেয় ও স্বাস্থ্যসম্মত। মাংস একটি উচ্চ আমিষের উৎস যেখানে সব অ্যামিনো অ্যাসিড বিদ্যমান। মাংস মানবদেহের অত্যাবশ্যকীয় ভিটামিন ও মিনারেলসের চাহিদা পূরণ করে। বয়স্কদের অস্থি ক্ষয়রোধ ও দুর্বলতা প্রতিরোধ করে। শিশুর দৈহিক বৃদ্ধি ও মেধার বিকাশ ঘটায়। প্রতি ১০০ গ্রাম মাংসে প্রায় ২২-২৬ গ্রাম মানসম্মত প্রোটিন, ৩-৪ গ্রাম উন্নত ফ্যাট, ১৪০-১৫০ কিলোক্যালরি শক্তি, ৭০-৭৫ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল, ৫৫-৬০ মিলিগ্রাম সোডিয়াম, ভিটামিন, মিনারেলস ও অন্যান্য পুষ্টি উপকরণ থাকে।

সুস্থ ও মেধাবী জাতি গঠনে প্রাণিজ আমিষের (দুধ, ডিম ও মাংস) উপযোগিতা নিম্নরূপ: শিশুর দৈহিক বৃদ্ধি ও মেধার বিকাশ ঘটায়, মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, মানবদেহের অত্যাবশ্যকীয় ভিটামিন ও মিনারেলসের চাহিদা পূরণ করে, বয়স্কদের অস্থি ক্ষয়রোধ ও দুর্বলতা প্রতিরোধ করে, স্ট্রোক, হৃদরোগ, আর্থ্রাইটিস ও ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়, মানবদেহের ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে, রক্তের ক্ষতিকর ট্রাইগ্লিসারাইডের উপস্থিতি হ্রাস করে, মানুষের দৃষ্টিশক্তি ও স্মরণশক্তি বৃদ্ধি করে ও সুস্থ সবল মেধাবী জাতি গঠনে সহায়তা করে।

দেশে করোনা মহামারীর মধ্যেও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর আপামর মানুষের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ, দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর ক্ষমতায়ন, চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্যাদি উৎপাদন ও রফতানিতে এবং বিশেষ করে খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তার ক্ষেত্রে কাজ করে যাচ্ছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার যথাযথ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক প্রণীত অষ্টম পঞ্চবার্ষিক, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট-২০৩০ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ফলে ২০৪১ সালে উন্নত দেশে রূপান্তরের লক্ষ্যে নিরাপদ প্রাণিজ আমিষের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রফতানি আয় বৃদ্ধিতে বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ ও সুষ্ঠু বাস্তবায়নের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মাণে এবং স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনে প্রাণিসম্পদ খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ড. হোসেন মো. সেলিম: উপপরিচালক (প্রাণিসম্পদ পরিসংখ্যান) 

পরিকল্পনা শাখা, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর