বাংলাদেশের রাজস্বনীতি নিয়ে অনেক সমালোচনা রয়েছে। পুরনো আয়কর আইন দিয়ে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়া দুষ্কর। বিদ্যমান রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতি নিয়ে বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠীও সমালোচনা করেছে। এছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আয়কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার জন্য এনবিআরের কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও অদক্ষতা দায়ী। ট্যাক্স আইডেনটিফিকেশন নাম্বার (টিআইএন) সংখ্যায় বাড়লেও সেই অনুপাতে কর আহরণ বাড়ছে না। এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) যখন ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ঋণ অনুমোদন করল তখন কিছু শর্তও জুড়ে দিয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আয়কর ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে গত বছর জাতীয় সংসদে ‘আয়কর বিল-২০২৩’ পাস হয়। এ আইনের অধীনে ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের কর নির্ধারণ হবে ‘গাণিতিক ফর্মুলা বা ‘স্বনির্ধারণী’ পদ্ধতিতে। এনবিআর মনে করছে, এ পদ্ধতিতে কর আদায় দ্রুত হবে। আপিল সংখ্যার পাশাপাশি কমবে ভোগান্তিও। নতুন আইনে অটোমেশনে জোর দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন আইনে রিটার্ন জমা, করপোরেট কর, কর কর্মকর্তাদের ক্ষমতা ইত্যাদি বিষয়ে পরিবর্তন আনা হয়েছে। উদ্যোগটি ভালো। রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আইনটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হবে বলে প্রত্যাশা। তাই আইনটির যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এর মাধ্যমে বাস্তবে যাতে করদাতাদের ভোগান্তি কমে সে বিষয়েও নজর রাখতে হবে।

১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশ দিয়ে চলছিল দেশের কর ব্যবস্থা। তবে বিভিন্ন সময়ে সেই আয়কর অধ্যাদেশের সংশোধন করা হয়েছে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন অনুসারে, গত বছর আইনটি সংসদে পাস হলেও চলতি অর্থবছর তা প্রয়োগ হয়নি। আগামী অর্থবছরে (২০২৪-২৫) কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে এ আইন অনুসারে ‘গাণিতিক ফর্মুলা’ বা ‘স্বনির্ধারণী’ পদ্ধতি প্রয়োগ হবে। 

সর্বশেষ আয়কর সেবা মাসের সময় দুই মাস বৃদ্ধি ও সেবা নিতে রিটার্ন দেয়ার বাধ্যবাধকতার ক্ষেত্র বাড়ানো এবং নতুন আয়কর আইন প্রণয়নসহ নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তার পরও বাড়েনি কাঙ্ক্ষিত আয়কর রিটার্ন জমার পরিমাণ। এনবিআরের তথ্যানুসারে, সেবা মাস শেষে টিআইএন নিয়েছেন ৯৯ লাখ ৭২ হাজার জন। কিন্তু আয়কর রিটার্ন জমা পড়েছে মাত্র ৩৫ লাখ ৪০ হাজার ৪০৬টি। ২০২২-২৩ অর্থবছরের সেবা মাস শেষে আয়কর রিটার্ন জমার পরিমাণ ছিল ৩০ লাখ ২৮ হাজার ৬৬১টি। সে হিসাবে চলতি অর্থবছর জমার সংখ্যা বেড়েছে মাত্র ৫ লাখ ১১ হাজার। এক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন জমার পরিমাণ বাড়াতে দরকার সমন্বিত ডাটাবেজ। যার মাধ্যমে শনাক্ত করা যাবে কারা আয়কর জমা দিয়েছেন বা দেননি। এ উদ্যোগের কথা বিভিন্ন সময়ে অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা বললেও তার বাস্তবায়ন হয়নি। তবে আশা করা যাচ্ছে, এ আইনের অধীনে আয়কর প্রদানের সবকিছুই ডিজিটাইজেশন করা হবে। ফলে কর ফাঁকির পরিমাণ কমে আসবে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত কয়েক বছর বিভিন্ন সেবা নিতে রিটার্ন জমার প্রমাণপত্রের ক্ষেত্র বেড়েছে। এতে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই রিটার্ন জমা বেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। এক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ বাড়ানো উচিত। কর আহরণের ডাটাবেজকে ইন্টিগ্রেটেড করা উচিত, যাতে সহজেই এনবিআর দেখতে পারে কে রিটার্ন জমা দিয়েছে বা দেয়নি। তাই এনবিআর আয়করের ক্ষেত্রে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তা কার্যকর হয়নি। 

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির দাবি, ধনী ও উচ্চ মধ্যবিত্তদের অধিকাংশই আয়কর দেন না। কর প্রশাসনের অদক্ষতা ও কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ করে তারা এ কর ফাঁকি দেন। এ কারণে কখনই এনবিআর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারে না। 

বাংলাদেশে বছরে কোটি টাকা আয় করেন এ রকম জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই কর আওতার বাইরে। এরা যে বৃহৎ কর পরিশোধের ইউনিটের মধ্যে তা নয়। এরা সারা দেশেই ছড়িয়ে আছে। কিন্তু এদের করের আওতায় আনা যাচ্ছে না। তাই এ জনগোষ্ঠীকে করের আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। 

আইএমএফের ঋণের শর্তের মধ্যে অন্যতম হলো রাজস্ব আদায় বাড়ানো, কর প্রশাসনের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি। কিন্তু চলতি অর্থবছরেও এনবিআর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রা কমানোয় তা এখন দাঁড়াল ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি হয়েছে ২৩ হাজার ২২৭ কোটি টাকা। এ প্রেক্ষাপটে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা কমানো হলেও তা অর্জন করা শেষ পর্যন্ত সম্ভব হবে না মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

দেশে প্রত্যক্ষ কর মোট করের ৩০ শতাংশ, বাকি ৭০ ভাগ পরোক্ষ। অথচ দেশে প্রত্যক্ষ করের পরিমাণ বেশি হওয়ার কথা ছিল। প্রত্যক্ষ কর আদায়ে এনবিআর সবসময় পিছিয়ে থাকে। তারা সবসময় পরোক্ষ কর বারবার বাড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তাই এনবিআরকে প্রত্যক্ষ কর আহরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। কেননা পরোক্ষ করের চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীলতা ক্রমান্বয়ে হ্রাস করতে হবে। এতে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর করের চাপ কমবে। আর দেশে প্রত্যক্ষ কর বা আয়কর আদায়ে সবার শীর্ষে থাকা উচিত, যা ব্যক্তির আয়ের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু দেশে এখনো কর-জিডিপির অনুপাত ১০ শতাংশের ঘরে যা এশিয়ায় সর্বনিম্ন। প্রত্যক্ষ কর আদায় বাড়ানোর পথে প্রধান বাধা এনবিআরের দুর্নীতি ও অদক্ষতা। দেশের প্রত্যক্ষ করের চেয়ে পরোক্ষ করের পরিমাণ বেশি আহরণ করা হয়ে থাকে। এটি একটি বড় দুর্বলতা। 

কর ছাড়া কোনো দেশই চলতে পারে না। আর এর অন্যতম হলো প্রত্যক্ষ কর। নতুন আইনটি যত সহজ এবং স্পষ্ট হোক না কেন সব করদাতার কাছ থেকে ঠিকঠাক কর আদায় হচ্ছে কিনা তা নিয়ে চিন্তা করা দরকার। বর্তমানে করদাতা এবং করগ্রহীতার মধ্যে বিশ্বাসের অভাব রয়েছে। কারণ করদাতা কোনো কিছু জমা দিলে করগ্রহীতা ভেবেই নেয় যে এটা ভুল। এ মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে কর জমাদানের প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। আবার করগ্রহীতার কোনো কিছুই করদাতাদের কাছে সঠিক মনে হয় না। তাদের একে অন্যের প্রতি আস্থা বাড়ানোর জন্য কর অঞ্চল অথবা সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। উভয়ের মধ্যে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করে কর প্রদানে জটিলতা কমিয়ে আনতে হবে। এক্ষেত্রে করদাতা যেভাবেই রিটার্ন ফাইল জমা দিক সেটা করগ্রহীতার গ্রহণ করার প্রস্তুতি থাকতে হবে। তবে শর্ত থাকবে যে, যদি কোনো অমিল বা অসৎ প্রমাণিত হয় তাহলে শাস্তি পেতে হবে। এতে করদাতার সংখ্যাও বাড়বে এবং বিশ্বাসের জায়গাও সৃষ্টি হবে। 

আয়কর আদায়ে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে প্রত্যক্ষ কর প্রশাসন-ব্যবস্থাপনা-প্রয়োগ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। ধার্য ও আদায়কৃত আয়কর যথাসময়ে ও প্রকৃত পরিমাণে কোষাগারে আসার ব্যাপারে নজরদারি ও পরিবীক্ষণ বাড়ানো জরুরি। করারোপ, হিসাবায়ন ও জমাদান পদ্ধতি বা প্রক্রিয়া করদাতাবান্ধব বা সহজ করতে হবে। এতে দূরত্ব কমবে করদাতা ও আহরণকারীর মধ্যে। আর এভাবে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি হলে কর নেটের সম্প্রসারণ ঘটতে থাকবে বলে আশা করা যায়। এ কথা অনস্বীকার্য যে, সার্বিক রাজস্ব আয়ের খাতে প্রত্যক্ষ করকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আসার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। রাজস্ব আইন সংস্কারের সব উদ্যোগের আগ্রহ বা অভিপ্রায়ে কোনো কমতি নেই বা ছিল না। কিন্তু সংস্কারকৃত আইন কতটা বাস্তবায়নসম্মত, আয়কর আহরণকারী এবং দাতার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও বাধ্যবাধকতার প্রয়োজনীয়তা সেখানে প্রতিফলিত হয়েছে কিনা সেটা দেখা দরকার।

এছাড়া দেশে জনসংখ্যার অনুপাতে আয়কর দাতার সংখ্যা খুবই কম। এ অনুপাতে এশিয়ায় সর্বনিম্নে বাংলাদেশ। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ লাখ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। এবার ৬৭ হাজার কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায় করতে হবে এনবিআরকে। আইএমএফ জিডিপির তুলনায় কর আদায়ের অনুপাত ৭ দশমিক ৮ থেকে বাড়িয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার শর্ত দিয়েছে।

দেশে এখন পরিপূর্ণ আয়কর আইন প্রণীত হয়েছে। প্রথমেই যে সেই আইনে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে তেমনটা আশা করা যায় না। এখন এ আইনকে ভিত্তি ধরে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও পরিমার্জনের মাধ্যমে সময়ের পরিক্রমায় হয়তো আইনটি পরিপূর্ণ মাত্রা পাবে। আয়কর বিভাগের লোকবল বাড়ানো ও সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিদ্যমান লোকবল ও কাঠামোকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। স্মার্ট বাংলাদেশে স্মার্ট আয়কর ব্যবস্থাপনার প্রবর্তন হবে খুব দ্রুতই। তখন এ আয়কর আইন ২০২৩ সংশোধন, পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে ডিজিটাল আয়কর আইনে রূপান্তর করতে পারলে হয়তো উল্লিখিত বিষয়গুলোর ভালো সমাধান হয়ে যাবে বলেই আমাদের প্রত্যাশা।