বিশ্ব যখন বিশেষায়িত জ্ঞানের দিকে এগোচ্ছে আমরা সেখানে এক অদ্ভুত ব্যবস্থায় চলছি। চিকিৎসক নির্ধারণ করতে চায় পররাষ্ট্রনীতি, মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নিয়ন্ত্রণ করেন কৃষিবিদ। নতুন গবেষণা ও জ্ঞান উৎপাদনে যেখানে বিশেষায়িত জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে সেখানে সংশ্লিষ্ট ডিসিপ্লিনে একাডেমিক পড়াশোনা না থাকা সত্ত্বেও তার তদারকি করা কতটুকু যৌক্তিক। বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশের জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় একটি অংশ পরিচালিত হচ্ছে সরকারি আমলাদের দিয়ে। তাদের অনেকেরই আবার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রায়োগিক অভিজ্ঞতা নেই। শিক্ষাজীবনে পড়াশোনার ক্ষেত্রও ছিল পুরোপুরি ভিন্ন। কেউ কেউ পদাধিকারবলে, আবার কেউ সরকারের নিয়োগের ভিত্তিতে এসব প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বণিক বার্তার অনুসন্ধানে আরো উঠে এসেছে, অন্তত এক ডজনের মতো গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা সংস্থার নেতৃত্ব দিচ্ছেন সরকারি আমলারা। সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতের অন্য একটি সংস্থা বা প্রকল্প পরিচালনার অভিজ্ঞতার জোরেই এসব সংস্থার নেতৃত্বে উঠে এসেছেন তারা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ, শিল্পোদ্যোক্তা, পরিকল্পনাবিদ, নীতিনির্ধারক, শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত তথ্যসেবা দেয়ার জন্য স্থাপন করা হয়েছে বাংলাদেশ ন্যাশনাল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল ডকুমেন্টেশন সেন্টার (ব্যান্সডক)। মহাপরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বে রয়েছেন সরকারের একজন অতিরিক্ত সচিব, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। পেশাগত জীবনে মাঠপর্যায়ে নানা দায়িত্ব পালনের পর তিনি চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের পরিচালক পদে ছিলেন। তার আগে ব্যান্সডকের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন একজন অতিরিক্ত সচিব ও দুজন যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণার জন্য ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় নজরুল ইনস্টিটিউট। এই ইনস্টিটিউটের পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন ১১তম বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তা। জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (নিপোর্ট) মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সরকারের এক অতিরিক্ত সচিব, যিনি এর আগে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। একই চিত্র দেখা গেছে, নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটে, যার মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সরকারের একজন যুগ্ম সচিব।
দেশে মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান (স্পারসো) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮০ সালে। মহাকাশবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান হলেও সংস্থাটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন একজন কৃষিবিদ। যদিও বিশ্বের অন্যান্য দেশে মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জ্যোতির্বিদরা। সম্প্রতি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত সফলভাবে চাঁদে মহাকাশযান উৎক্ষেপণের পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। স্পারসোর বর্তমান চেয়ারম্যান বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের পঞ্চদশ ব্যাচের কর্মকর্তা। স্পারসোয় যোগদানের আগে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে যোগদানের পর কেন্দ্রীয় ও মাঠ প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ডিগ্রি নিয়েছেন মানবসম্পদ উন্নয়ন, নীতিনির্ধারণী ধারণা, উন্নয়ন প্রশাসন, পরিবেশ উন্নয়ন ইত্যাদি বিষয়ে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেকেই নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষ না হলেও অফিসপ্রধান হওয়ার জন্য নানাভাবে লবিং-তদবির করেন। এর জোরেই সংশ্লিষ্ট বিভাগে নিয়োগ পান তিনি। অনেকেই নিজের যোগ্যতা দেখানোর জন্য নানা মাধ্যমে লেখালেখি করে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিজের জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা তুলে ধরার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেগুলোয় গভীরতা থাকে খুবই কম। এসব লেখার ক্ষেত্রে গুণগত মানের চেয়ে সংখ্যা প্রাধান্য পায় বেশি।
গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্দেশ্য সরকারের নীতিনির্ধারণে সহায়তা করা। কিন্তু এসব জায়গায় বিশেষজ্ঞদের পরিবর্তে আমলাদের নিয়োগের প্রধান কারণ হলো সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা। এতে সরকারের নীতিনির্ধারণে যথাযথ সহায়তা না হলেও শুধু কিছু মানুষের পদের সংস্থান হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলো যে উদ্দেশ্য নিয়ে গঠিত হয়েছিল, তা আর বজায় থাকেনি।
কুমিল্লার বার্ডের (বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি) শুরু হয়েছিল আখতার হামিদ খানের মতো গবেষকদের দিয়ে। যদিও তিনি প্রথম জীবনে আমলা ছিলেন, কিন্তু দুর্ভিক্ষের মধ্যে আমলাদের অত্যাচার দেখে তিনি পদত্যাগ করেন। তারপর তিনি বিশ্বখ্যাত গবেষক হয়েছিলেন। উন্নয়নশীল দেশে অংশগ্রহণমূলক পল্লী উন্নয়ন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আজীবন কাজ করেছেন। তার বিশেষ অবদান ছিল পল্লী উন্নয়নের জন্য। তার উদ্ভাবিত কুমিল্লা মডেল বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রশংসিত হয়। কিন্তু এখন সেখানে দায়িত্ব পালন করছে সরকারি আমলারা।
তবে ভিন্ন চিত্র দেখা যায় কৃষি খাতের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোয়। এ খাতে গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়েছে ১০টিরও বেশি। এসব সংস্থা ও ইনস্টিটিউটের প্রধানদের প্রায় সবাই শিক্ষাজীবনে ছিলেন কৃষিসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর শিক্ষার্থী। তাদের ক্যারিয়ারের বেশির ভাগ সময় কেটেছে কৃষিসংশ্লিষ্ট সংস্থায়। বিষয়টি উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিসহ কৃষি খাতের সার্বিক পারফরম্যান্স ভালো হওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সর্বত্রই যেন আমলাতন্ত্রের জয়জয়কার। এতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ন থাকলেও বিভিন্ন গবেষণা ইনস্টিটিউট যে উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা পূরণ হয় না। এলডিসিভুক্ত দেশ থেকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে পা রাখছে, স্বপ্ন মধ্যম আয়ের দেশ হওয়া। এক্ষেত্রে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কর্মযজ্ঞ বাড়ানো দরকার। নতুন যুগের চাহিদা পূরণে সক্ষম করে গড়ে তুলতে হবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে। এজন্য সংশ্লিষ্ট খাতে দক্ষতা রয়েছে এমন লোকদের দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা জরুরি।










