আধুনিক বিশ্বের
পরিবর্তনশীল সমাজ-সভ্যতার অর্থব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে আমাদের মতো উন্নয়নশীল
দেশকে বিশেষ করে যেখানে অর্থ ব্যবস্থাপনা বা আর্থিক ব্যবস্থাপনার শিক্ষা নিয়মিত শিক্ষা
ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত নয় সেখানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা তৈরি এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে
বাজেটিং আয়-ব্যয়ের সমন্বয়, বিনিয়োগ, সঞ্চয় এবং ইত্যাদি আর্থিক ধারণার বিষয়ে ফাইন্যান্সিয়াল
লিটারেসির গুরুত্ব অপরিসীম। সহজ ভাষায় আর্থিক সাক্ষরতা বলতে বাজেটিং, বিনিয়োগ, ক্রেডিট
ম্যানেজমেন্ট এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা ইত্যাদির মতো আর্থিক ধারণাগুলোকে বোঝার এবং প্রয়োগ
করার সক্ষমতাকে বোঝায়। এছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে, আর্থিক সাক্ষরতা হলো টাকাকে সঠিক
পরিচালনা করার সক্ষমতা। এই সক্ষমতাগুলো অবসর, শিক্ষাসহ জীবনের বিভিন্ন উদ্দেশ্য অর্জন
করতেও সাহায্য করে থাকে।
বস্তুত আমাদের
দেশে শিক্ষা ও সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি পেলেও এখনো বেশিরভাগ মানুষ প্রকৃত অর্থে আর্থিক
সাক্ষরতা ও শিক্ষার ব্যাপারে সঠিকভাবে অবগত নয়, যে কারণে আমরা প্রায়ই দেখে থাকি নানা
ভুল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে এবং শুধু লোকের বলা কথায় কান দিয়ে সঠিকভাবে না জেনে অর্থ
বিনিয়োগ করার কারণে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণার শিকার হয় বা অপরিপক্ব ক্ষেত্রে অর্থ বিনিয়োগ
প্রকৃত অর্থে সঞ্চয় ও বাজেট না করার কারণে বিরাট আকারের অর্থনৈতিক লোকসানের মুখোমুখি
হতে হয়, তবে এমনটা হতো না যদি সকলে যথার্থভাবে আর্থিক শিক্ষায় শিক্ষিত হতো। আর্থিক
শিক্ষায় শিক্ষিত কোনো ব্যক্তি যে কোনো ধরনের বিনিয়োগের আগে তার নানা দিক ও বিষয় ভালোভাবে
বিচার-বিশ্লেষণ করে খতিয়ে দেখে এবং সে বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকিসমূহ
যাচাই করে তারপর সে অনুযায়ী বিনিয়োগের চিন্তা ভাবনা করে থাকেন। তাই বর্তমানে আমাদের
দেশের জন্য আর্থিক সাক্ষরতা অতীব প্রয়োজন। নিউইয়র্ক টাইমস-এর বেস্ট সেলার বই রিচ ড্যাড
পুওর ড্যাড লেখক রবার্ট টি. কিয়োসাকি যিনি পেশায় একজন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী
ও কলামিস্ট। তিনি ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসির গুরুত্ব সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন “Financial
literacy is the road map that helps you navigate through life.” মোটা দাগে ফাইন্যান্সিয়াল
লিটারেসি বলতে আর্থিক সাক্ষরতার বৈচিত্র্যময় আর্থিক দক্ষতা, সরঞ্জাম এবং পরিষেবাগুলো
শনাক্তকরণ এবং তাদের কার্যকরভাবে ব্যবহার করার সক্ষমতা দ্বারা সংজ্ঞায়িত করা যায়,
বিশেষত ব্যক্তিগত ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ কৌশল এবং বাজেটিং ও সঞ্চয় প্রসঙ্গে
এটি আলোকপাত করে থাকে।
দক্ষিণ এশিয়ার
উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে দারিদ্র্য, আর্থিক বৈষম্য ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতাসহ
অসংখ্য চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। আর্থিক শিক্ষা বা ফাইন্যান্সিয়াল
লিটারেসি এই চ্যালেঞ্জগুলোকে যথাযথভাবে মোকাবেলা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত
করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। আর্থিক শিক্ষা আমাদের দেশে ব্যক্তি পর্যায়ে,
ব্যবসা-বাণিজ্য বিনিয়োগ এবং উদ্যোক্তা নির্মাণেও কার্যকরী ভূমিকা রাখার পাশাপাশি তাদের
অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য অপরিহার্য।
ব্যক্তিক
দৃষ্টিকোণ থেকে, আর্থিক শিক্ষা মানুষকে তাদের ব্যক্তিগত অর্থ পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার
করতে শেখায় এবং একই সঙ্গে নিজেদের অর্থ নিয়ে ভবিষ্যত পরিকল্পনা করতে সহায়তা করে থাকে।
আমাদের দেশের মানুষেরা কষ্ট করে অর্থ উপার্জন করে থাকেন এক্ষেত্রে তাদের আর্থিক সাক্ষরতা
ও শিক্ষা থাকলে নিজেদের অর্থকে কার্যকরভাবে বাজেটিং, নিজেদের ঋণের বোঝা কমানো, স্বল্প
ও দীর্ঘমেয়াদি পরিসরে বিনিয়োগের কৌশল এবং ভবিষ্যতের যেকোনো জরুরি অবস্থার জন্য প্রয়োজনীয়
সঞ্চয় করতে এই শিক্ষা সহায়তা করবে। এছাড়াও আর্থিকভাবে শিক্ষিত ব্যক্তিরা অর্থ বিনিয়োগের
সময়ে জেনে বুঝে সিদ্ধান্তও নিতে পারেন, যেমন সম্পত্তি কেনা-বেচা বা যেকোনো ব্যবসা-
বাণিজ্য শুরু করা, আর এটি তাদের আর্থিক সাফল্যকে ব্যাপকমাত্রায় প্রভাবিত করতে পারে।
উপরন্তু,
ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি বাংলাদেশের মধ্যে ব্যবসা, ব্যবসায়ী এবং উদ্যোক্তাদের তৈরিতেও
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) বাংলাদেশের
অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ, এটি দেশের মোট জিডিপির প্রায় ২৫ শতাংশের কাছাকাছি
কিন্তু, অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এসএমই অর্থায়ন পেতে, নগদ প্রবাহ সচল রাখতে এবং
বিনিয়োগ সম্পর্কে জেনে বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে নানান সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকে।
যথাযথ আর্থিক শিক্ষা থাকলে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ব্যবসাগুলো এসকল চ্যালেঞ্জকে
কাটিয়ে উঠার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের ব্যবসা বৃদ্ধি করতে, কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারবে
এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের নিজেদের অবস্থান দ্বারা সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
সরকারের দৃষ্টিকোণ
থেকেও আর্থিক সাক্ষরতা ও শিক্ষার প্রয়োজন রয়েছে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য
কমাতে এটি সহায়তা করে থাকে এবং একইসঙ্গে সকলের অন্তর্ভুক্তকরণের মাধ্যমে আর্থিক পরিষেবার
মানুষের অংশগ্রহণ অর্থনৈতিক চাকাকেও গতিশীল করে যা আমাদের ডিজিটাল অর্থনীতি থেকে স্মার্ট
বাংলাদেশের অর্থনীতি বিনির্মাণের অন্যতম শক্তি হিসেবে কাজ করবে। আর এজন্যই বাংলাদেশ
সরকার আর্থিক অন্তর্ভুক্তকরণ ও আর্থিক সাক্ষরতার প্রচার বৃদ্ধির জন্য জাতীয় আর্থিক
অন্তর্ভুক্তি কৌশল অর্থাৎ National Financial Inclusion Strategy (এনএফআইএস) এবং বাংলাদেশ
ব্যাংকের মাধ্যমে আর্থিক সাক্ষরতা কর্মসূচি মতো বেশ কয়েকটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই
কর্মসূচির মূল লক্ষ্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আর্থিক পরিষেবাগুলোতে অংশগ্রহণের সুযোগ
প্রদান করা এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে আর্থিক সাক্ষরতা প্রচার বৃদ্ধি করা। আর এই কারণেই
অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২০-২০২৪ সালের স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানের আওতায়
আর্থিক সাক্ষরতা ও আর্থিক শিক্ষা উদ্যোগকে জোরদার করা গুরুত্বপূর্ণ মূল লক্ষ্য হিসেবে
চিহ্নিত করেছে।
যদিও বাংলাদেশের
আর্থিক সাক্ষরতার প্রচার কার্যক্রম উল্লেখযোগ্য কিন্তু এখনো নানা চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান
রয়েছে। এসবের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো আর্থিক পরিষেবাগুলোতে
এখন সকলের অংশগ্রহণের অভাব। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে মাত্র
৫০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্কের আনুষ্ঠানিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার
গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। সরকার ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই একযোগে
কাজ করতে হবে বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে আর্থিক সেবার প্রবেশাধিকার
বাড়ানোর ক্ষেত্রে।
তাছাড়া,
দ্রুত পরিবর্তিত প্রযুক্তির এই যুগে এসে বাংলাদেশের মোবাইল ব্যাংকিং এবং ডিজিটাল পরিষেবার
উত্থান হতে পারে অন্তর্ভুক্তকরণের অন্যতম পন্থা যদি সেখানে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের
মাধ্যমে আর্থিক সাক্ষরতা প্রোগ্রামগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়। সরকার এবং আর্থিক
প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই এই প্রযুক্তিগুলোর ওপর শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও প্রচার অভিযান
চালাতে হবে যাতে সব শ্রেণীপেশার মানুষেরা কার্যকরভাবে এবং নিরাপদে এই পরিষেবা ব্যবহার
করতে পারে।
পরিশেষে বলা
যায়, ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে ব্যবসা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ইত্যাদি ক্ষেত্রের জন্য
আর্থিক সাক্ষরতা ও শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয়। বিদ্যমান নানা চ্যালেঞ্জ
থাকা সত্ত্বেও, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বিত প্রচেষ্টায় আর্থিক সাক্ষরতা ও শিক্ষা
প্রচার প্রসার সঠিকভাবে করা সম্ভব হলে বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য
বিমোচন এবং দেশের জনগণ উন্নত আর্থিক কল্যাণের দিকে পরিচালিত করা সম্ভব হবে। তখন এই
আর্থিক সাক্ষরতা ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠী দেশের শক্ত স্মার্ট অর্থনীতির চালিকাশক্তিতে রূপান্তরিত
হবে, তাই আর্থিক সাক্ষরতার প্রসারের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার সকল নাগরিকের জন্য আরো সমৃদ্ধ
ও ন্যায়সংগত ভবিষ্যৎ দিতে পারে।
মো. আবিদ মঈন খান: সাংবাদিক










