উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো নীতি সুদহার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে বাজারে অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার জন্য অর্থনীতিবিদরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদনীতির সমালোচনা করে আসছিলেন। সরকারের মধ্যেও এ নিয়ে অসন্তোষ ছিল। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল, দেশের বিরাজমান মূল্যস্ফীতি টাকার অবমূল্যায়নের ফল। এতে সুদহারের ভূমিকা খুব বেশি নেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার বাড়ানোর সিদ্ধান্তে উপনীত হলো।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, নীতি সুদহার বা রেপো রেট এক ধাক্কায় দশমিক ৭৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে বর্তমান রেপো রেট ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। এর আগে গত জুনে নীতি সুদহার ৬ থেকে বাড়িয়ে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।
নীতি সুদহারে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলো টাকা ধার নেয়। সুদহার বাড়ানোয় এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বেশি সুদে অর্থ ধার করতে হবে। এর প্রভাব দেশের সরকারি-বেসরকারি সব খাতের ওপর পড়বে। দেশের ব্যাংকগুলো ঋণের পাশাপাশি আমানতের সুদহারও বাড়াবে। বাজারে অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে রেপো রেট বাড়ানো হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
কিন্তু রেপো রেট বাড়িয়ে সত্যি কি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে? কারণ তিন মাসের মধ্যে দ্বিতীয়বার এবং গত বছরের মে মাসের পর থেকে ষষ্ঠবারের মতো নীতি সুদহার বাড়ানো হলো। ২০২২ সালের মে মাসে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের নিচে ছিল। চলতি বছরের মে মাসে যা ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।
কয়েক মাস ধরেই দেশে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি হারে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ভাষ্যমতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি ভূমিকা রাখতে পারেনি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, যার ফলে নীতি সুদহার বাড়ানো হলো।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যায়। জ্বালানি ও তেল, খাদ্যশস্যসহ পণ্যের দাম বাড়ায় প্রায় দেশই মূল্যস্ফীতির চাপে পড়ে। চলতি বছর যুক্তরাজ্যের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় আবারো নীতি সুদহার বাড়ায় ব্যাংক অব ইংল্যান্ড। চলতি বছর প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হারে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশীয় পয়েন্ট নীতি সুদ বাড়ায় ব্যাংকটি। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদহার ৫ শতাংশে পৌঁছে। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের মুদ্রানীতি কমিটি ৭-২ ভোটে নীতি সুদহার বৃদ্ধির পক্ষে রায় দেয়। ফলে ২০০৮ সালের পর দেশটির নীতি সুদহার সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপনীত হয়। মূল্যস্ফীতির হার ও মজুরি প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অসন্তোষ থাকায় আবারো নীতি সুদহার বৃদ্ধির পথে যায় ব্যাংক অব ইংল্যান্ড।
এর আগে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশীয় হারে নীতি সুদহার বাড়িয়েছে। সেই পথ ধরে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডও নীতি সুদহার বাড়ায়। এদিকে নীতি সুদহার বাড়ানোর সুফল পেতে শুরু করেছে ইউরোপ। গত বছর মূল্যস্ফীতির কারণে ইউরোপ কঠিন সময় পার করেছে। এক বছর পর সেই ইউরোপে মূল্যস্ফীতির হার দুই বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। বর্তমানে ইউরোপের দেশগুলোর নীতিপ্রণেতারা মনে করছেন, মূল্যস্ফীতির হার কমে আসার কারণে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদহার বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা রইল না এবং অর্থনীতির পালে আবার হাওয়া লাগবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। এদিকে শ্রীলংকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকও চরম অর্থনৈতিক সংকটের সম্মুখীন হয়, কিন্তু নীতি সুদহার বাড়ানোর মাধ্যমে ঋণকে আরো ব্যয়বহুল করে ২০ মাসব্যাপী বিদ্যমান দুই অংকের মূল্যস্ফীতিকে এক অংকের ঘরে নামিয়ে আনতে পেরেছে। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার গভর্নর শক্তিকান্ত দাস ছয়বার রেপো রেট বাড়িয়ে সফলভাবে মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রও নীতি সুদহার বাড়ানোর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির তাণ্ডবকে শান্ত করতে পেরেছে। চীনও মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে রেপো বা নীতি সুদহার বাড়িয়েছে।
মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে অনেক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার বাড়িয়েছে। গত জুলাইয়ে চতুর্থবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদহার বাড়ায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সুদহার গত বছরই বাড়ানো উচিত ছিল বলে অর্থনীতিবিদদের মত উঠে এসেছে। কারণ অর্থনীতিতে যখন রেপো সুদের হার কম থাকে, তখন টাকার প্রবাহ তুলনামূলকভাবে বেড়ে যায়। আর টাকার প্রবাহ বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। ফলে যখন মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায় তখন নীতি সুদহার বাড়িয়ে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর প্রধান কারণ হলো টাকার প্রবাহ আগের চেয়ে কমিয়ে আনা। এতে ধীরে ধীরে মূল্যস্ফীতি কমে আসে।
তবে রেপো রেট বা নীতি সুদহার বাড়ানোর ফলে মূল্যস্ফীতি নাও কমতে পারে, এমনও মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। কারণ গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের সুদহার স্মার্ট রেটের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়, যা অনেকটাই ফিক্সড বলা যায়। এছাড়া এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার নীতি সুদহার বাড়ানোর পরও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।
বস্তুত উচ্চ মূল্যস্ফীতিসহ দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকটগুলোর মূলে অব্যবস্থাপনা, অর্থ পাচার, দুর্নীতি, সুশাসনের ঘাটতিসহ নানা কারণ রয়েছে। এ কারণে শুধু নীতি সুদহার বাড়ানোর ফলে মূল্যস্ফীতি কমার সম্ভাবনা ক্ষীণ। অর্থনীতির সংকট কাটাতে মূল্যস্ফীতিসহ দেশের আর্থিক খাতে বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে বলে অর্থনীতিবিদরা দাবি করছেন। তাছাড়া নীতি সুদহার বাড়ানোয় ব্যাংকগুলো এখন ঋণের সুদহার বাড়াবে। ফলে অর্থ সরবরাহ আরো সংকুচিত হয়ে যাবে। এতে ব্যাংকগুলো ঋণপ্রবাহ আরা কমাবে। উচ্চ সুদহারের কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হতে পারে। এতে কর্মসংস্থান কমার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বিশ্বের অন্য দেশগুলোর ভূমিকাকে উদাহরণ হিসেবে নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক্ষেত্রে অগ্রসর হওয়া উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সিদ্ধান্ত সফলতার মুখ দেখুক, এটিই সবার কাম্য।










