যে শিশুটির জন্ম হয়েছিল শিশু নাম নিয়ে, তার জীবনের সময়টাও ছিল শিশুদের মতোই হাসিখুশিতে ভরা, জীবনের শেষের দিনগুলোতেও শিশুসুলভ আচরণ করে গেছেন। বলছি প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কথা। তিনি যে কত বড় মনের ও মাপের মানুষ ছিলেন, তার কাছের মানুষগুলো সেটা অনুধাবনই করতে পারেননি। তার চলে যাওয়ার আগের দিনগুলোর জন্য বেশ খারাপ লাগে, অথচ শারীরিক অসুস্থতায় তার শেষের দিনগুলো হয়তো এত কষ্টের নাও হতে পারত!
ছোট ভাই আমাদের সবার প্রিয় মানুষ ছিলেন (উল্লেখ্য পরিবারের সকলে তাকে ভালোবেসে ছোট ভাই ডাকত)। তিনি যখন যার কাছে যেতেন, তখন তিনি ছোট ভাইয়ের মানুষ হয়ে যেতেন। ছোট ভাইয়ের জ্ঞানের পরিধি কত সুপ্রসারিত ছিল, সেটা এ দেশের মানুষের অনুধাবন করা কষ্টসাধ্য ছিল। তাই হয়তো অনেক সময় বিতর্কিত হতেন। কিন্তু তিনি তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকতেন।
তার স্কুলজীবন থেকে লেখাপড়ার শেষ অধ্যায় পর্যন্ত নিচের দিকে তাকাননি। উচ্চ থেকে উচ্চতরে উঠেছেন। তাকে ওপরওয়ালা ধূমকেতুর মতো টেনে নিয়ে চলেছিলেন। ছোট ভাইয়ের পেছনে ফেরার সময় নেই, চলছেন তো চলছেন। বিদেশে থেকেও দেশের সম্মান অক্ষুণ্ন রেখেছিলেন। তার মতো জ্ঞানের অধিকারী মানুষকে নিয়ে বাংলাদেশ গর্ব বোধ করতে পারে। বাংলাদেশ যে কী হারিয়েছে সেটা দেশ ও সরকার আরো কিছু দিন পর বুঝতে পারবে।
ছোট ভাই যখন এরশাদ সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন, তখন জেনারেল এরশাদের সঙ্গে মতবিরোধ দেখা দিলে তিনি মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেন। জাতিসংঘে চাকরি নিয়ে চলে যান। তার কিছুদিন পর জাতিসংঘে আন্ডার সেক্রেটারি হিসেবে নাম আসে তার, তখন এরশাদ তাকে নমিনি দেননি, যেহেতু তিনি তার মন্ত্রিত্ব ছেড়ে গিয়েছিলেন তাই। এরশাদ সরকার বুঝলই না তারা কত বড় ভুল করেছে দেশ ও দশের জন্য। তাতে কী হয়েছে! জীবনে তার জ্ঞানের বিস্ফোরণ যেখানে হওয়ার, সেটা হয়েছে।
দেশ একজন বিদগ্ধ পণ্ডিত ব্যক্তিকে হারিয়েছে। তাকে তুলনা করার মতো এ দেশে আর কেউ নেই, সব লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে ছিলেন তিনি। নিজের বেলায় যা প্রয়োজন তার থেকে বেশি কখনই গ্রহণ করেননি। নিজের পরিবারের বেলায় তাই করেছেন। তার পরিবারের সবাই শিক্ষিতও।
এ দেশেও অনেক শিক্ষিত মানুষ বলে আছে—নিজের দেশের জাতীয় অনুষ্ঠানগুলোও তার প্রতিষ্ঠানে পালন করা হয় না। কারণ দেশীয় কিছু তার পছন্দ নয়। অথচ এ দেশের নাম দিয়েই তো তিনি নোবেল বা ৮২টা অনারারি ডিগ্রি নিয়েছেন।
যা-ই হোক একেই বলে শিক্ষা। মুহিত ভাই যখন বিদেশে লেখাপড়া করেন বা চাকরি শেষ করে দেশে ফিরে এসেছেন, তিনি ফিরেছেন নিজের টানে নয় দেশের টানে। দেশের জন্য কিছু করতে চান এবং করেছেনও। দেশকে মধ্য আয়ের উন্নয়নশীল দেশে পরিণত করেছেন।
তিনি নিজে কীভাবে চলবেন—এটা কখনো চিন্তা করেননি। এখানে নিজের দিকে না তাকিয়ে সবার জন্য করেছেন। অনেক রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা তার থেকে অনেক সুবিধা নিয়েছেন। অথচ আজ তাদের একটি বারের জন্যও মুহিত সাহেবের নামটিও স্মরণ করতে দেখি না।
ছোট ভাই যখন সবশেষ সিলেটে গেলেন, তখন বুবুকে বলেছিলেন তিনি দেখতে খারাপ হয়ে গেছেন। বুবু বলেছিলেন, তোমার থেকে আমি চার বছরের বড়, আমি ভালো আছি। তুমি কেন খাও না। তিনি হেসে বলেছিলেন, খেতে ইচ্ছা হয় না। ছোট ভাইয়ের কোথায় যে কষ্ট ছিল, বলতে পারি না। তিনি কারো কাছে মুখ খোলেননি। যত কষ্ট নিয়ে গেছেন বা যত কষ্ট পেয়ে গেছেন, সেটা ভাষায় প্রকাশ করা কষ্টসাধ্য। তার এক ছোট ভাই বলেছিলেন, মুহিত ভাই ছোটবেলা থেকে লেখাপড়ায় এত ভালো ছিলেন যে তার সঙ্গে তাল মেলাতে আমাদের কষ্ট করতে হতো। তার ভাইবোন সবাই ভালো ও শিক্ষিত। পরিবারের ভেতরে একটা পারিবারিক বন্ধন ছিল। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সেটা কমে আসছে। এটাই হয়তো স্বাভাবিক। নতুন বংশধরদের চিন্তা ভিন্ন, তাই পারিবারিক বন্ধনও খাপছাড়া।
মুহিত ভাইয়ের জ্ঞানের পরিধি কত ব্যাপক ছিল, তা আমার জন্য পরিমাপ করা কঠিন। তবে এটা ঠিক যে তিনি তার জ্ঞান দিয়ে পুরো পৃথিবী জয় করেছিলেন। তবে নিজের পরিবারের কাছে সে জ্ঞানের পরিধির বিকাশ ও ব্যবহার করতে পারেননি—এটাই তার জীবনের ব্যর্থতা। এটা সত্যি, প্রদীপের নিচে অন্ধকার। নীড়ের পাখি যেমন বুঝতে পারে না, তার নীড় কতটা শক্ত আছে, তেমনি তার ঘরের মানুষও বোঝেনি তিনি কতটা মজবুত বা শক্ত ছিলেন।
২০১৫ সালের কথা। নিউইয়র্কে একবার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন কোরবানি ঈদের সময়। তখন ঈদের অনুষ্ঠান ছিল, সে অনুষ্ঠানে যখন আমি আসি, দেখি সামনের দিকে বেশকিছু লোক বসে আছেন। রাউন্ড টেবিলের সামনে চেয়ার দুটো খালি ছিল। আমি যখন একটাতে বসতে চাই, একজন বাধা দেয়। আমাকে সামনে থেকে মুহিত সাহেব খেয়াল করেছিলেন, কিছুক্ষণ পর সবাই বসে গেলেন। অনুষ্ঠান শুরু হয়নি তখনো, আমাকে মুহিত ভাই হাতের ইশারা করে ডাক দিলেন, এদিকে আসো। আমি গেলাম। এ সুযোগে প্রধানমন্ত্রীকে সালাম দেয়ার সুযোগ পেলাম। তাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করলাম। কিছুক্ষণ আমি দাঁড়িয়ে তাদের সঙ্গে কথা বললাম। এর কিছুক্ষণ পর তিনি হেসে বললেন, যাও এখন বসো। কিছুক্ষণ পর আমি বুঝতে পারলাম তিনি আমাকে ডেকেছিলেন কেন? তিনি নিঃশব্দে অন্যদের বুঝিয়ে দিলেন, আমার বসার স্থান সামনের ওই সারিতেই।
ছোট ভাই খুব পড়ালেখা করতেন। যা পেতেন, তা-ই পড়তেন। আর প্রচুর লিখতেনও। তার বইগুলো আজও পাঠকদের কাছে আগ্রহের বিষয়, অনেক গবেষকই এখনো মুহিত ভাইয়ের বইয়ের খোঁজ করেন। তিনি সবশেষ একটা বইয়ের কাজ করছিলেন, ‘হিস্ট্রি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’। তিনি জানিয়েছিলেন যে বইটার কাজ শেষ। একটু এডিট করতে হবে, কিছু জায়গায় তথ্য সংযোজন-বিয়োজন করতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, বইটি আর প্রকাশ হয়নি। এ বইটা যদি বের হতো, তাহলে শুধু বাংলাদেশের নয়, পৃথিবীর মানুষের অনেক উপকারে আসত। মানুষের সৃষ্টি থেকে শুরু করে শেষ দিন পর্যন্ত কী করা দরকার, কী দরকার নয়—সবকিছুই ছিল ওই বইটিতে লেখা। সেটি এখনো বের হয়নি, জানি না কবে হবে।
ছোট ভাই যখন আমাদের বাসায় আসতেন, অনেক গল্প করতেন আর বলতেন, এখন বাসায় খাচ্ছি, সন্ধ্যায় বাইরে খেতে যাব এবং সবাইকে নিয়েই যেতেন। তিনি অনেক ভোজনবিলাসী ছিলেন, তিনি খেতে ও খাওয়াতে ভালোবাসতেন। ছোট ভাই গৌরবময় উজ্জ্বল নক্ষত্রের আলো ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে। তার এ বর্ণাঢ্য জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে আজকের এই দিনেই। শিশু ফিরে গেছেন মায়ের কোলে, আজ তার একটি বছর অতিবাহিত হলো। উপরওয়ালা ছোট ভাইকে ওপারেও ভালো রাখুন।
সেলিনা মোমেন: পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সহধর্মিণী










