বছর ঘুরে আবার এল একুশে ফেব্রুয়ারি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে এ পর্যন্ত ৭২টি বছর পেরিয়ে গেল। আমাদের স্বাধীনতার ৫৩ বছর পূর্তি উৎসব চলছে। আত্মমূল্যায়ন করলে দেখতে পাই বাংলা ভাষার প্রতি যথার্থ মূল্যায়ন করতে আমরা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছি। এমনিতেই আমরা শিক্ষা ও গবেষণায় জাতি হিসেবে পিছিয়ে। তার ওপর ইংরেজি ভাষার ওপর অতিনির্ভরশীলতার জন্য নিজ ভাষায় জ্ঞান ও বিজ্ঞানচর্চার সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। আমরা শিক্ষিত বাঙালিরা এমন একটি জায়গায় পৌঁছে গেছি যে সামান্য কিছু সময়ও মিশ্রণ ছাড়া বাংলায় কথা বলার যোগ্যতা হারিয়েছি। অনেক মহাপ্রাণ বলিদান হলো। ৩০ লাখ মানুষের প্রাণ শহীদ হলো, দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জত লুণ্ঠিত হলো, বিনিময়ে স্বাধীনতা এল। কিন্তু সেই স্বাধীনতার মূলে যে ভাষা, যে আত্মত্যাগ তা চরমভাবে অবমূল্যায়িত হচ্ছে। 

মাতৃভাষা বাংলা আজ বিশ্বব্যাপী অনন্য মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত। প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি এলে সমগ্র বিশ্বে পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। পৃথিবীর দেশে দেশে যখন দিবসটি পালন হয় এবং প্রেক্ষাপট আলোচনা করা হয়, দিনটিতে বিশ্বের বিভিন্ন জাতি নিজস্ব মাতৃভাষার কথা আলোচনা করলেও অবধারিতভাবে প্রথমেই উঠে আসে বাংলার নাম। এক গৌরবের ইতিহাস আমরা ধারণ করে আছি। আর সেই ইতিহাসের এক বিশাল অংশ জুড়ে আমাদের ভাষা। 

বাংলা ভাষার ঐতিহ্য ও সাহিত্যসম্ভার বিপুল। কিন্তু জাতি হিসেবে আমরা তা আঁকড়ে ধরতে পারিনি। যে ভাষার জন্য আমাদের এ সংগ্রাম ও ত্যাগ সেই স্বাধীন দেশে নিজের মাতৃভাষাকে সঠিক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা ও সর্বস্তরে এ ভাষা প্রয়োগের স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল। আর তাই প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে বিষয়টি নতুন করে পীড়া দিয়ে যায়। 

ইংরেজি-হিন্দির মিশ্রণে যে বিকৃত বাংলা ভাষার চর্চা আমরা করি, তা আমাদের ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ আর উৎসর্গের প্রতি চরম অশ্রদ্ধা। নতুন প্রজন্মের মাঝে বাংলার প্রতি যে অনুৎসাহ ও অনীহা তা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। 

একুশ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আমরা তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারিনি। আমাদের ব্যর্থতার কারণে আমাদের নতুন প্রজন্ম তাদের মৌলিক সংস্কৃতি সম্পর্কে জানে না। আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই রম্য আর রঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপিত হতে দেখি নতুন প্রজন্মের অবক্ষয়। তারা ভাষা দিবস সম্পর্কে জানে না। তারা জানে না স্বাধীনতা দিবসের সঠিক তারিখ। তারা বাংলার ইতিহাস জানে না, জানে না সংস্কৃতি। এক কঠিন অস্তিত্ব সংকটের মধ্য দিয়ে আমরা এগোচ্ছি। যেখানে অভিভাবকসহ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাংলা ভাষার প্রতি চরম অনীহা। প্রযুক্তির নেশায় বুঁদ হয়ে আজকের প্রজন্ম আমাদের মৌলিক সংস্কৃতির লেশমাত্র জানে না। একটি জাতির মৌলিক সংস্কৃতি আর চেতনার জায়গায় যদি আঘাত করা যায় তাহলে সেই প্রজন্মকে সহজেই বদলে দেয়া যায়। আর প্রযুক্তির প্রভাবে অপসংস্কৃতি দখল করে নিয়েছে আমাদের নতুন প্রজন্মকে। 

বাংলা ভাষা ক্রমেই মর্যাদা হারাচ্ছে। আমরা ক্রমাগত অন্ধকারের দিকে এগোচ্ছি। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ যে দেশের ভাষা বাংলা, যে ভাষার জন্য বুকের তাজা রক্ত ঢালতে হলো রাজপথে, যে রক্তের স্রোতে অর্জিত হলো স্বাধীনতা সেই ভাষা অবহেলিত। মানুষের মুখে অবজ্ঞায় উচ্চারিত হয়—তখন তো আশঙ্কা সত্যিই জাগে বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে। এ দীনতা কার, বাংলা নাকি তথাকথিত শিক্ষিত নামধারী গুণী ব্যক্তিদের! নিজেদের জন্য এমন এক লজ্জার জন্ম দিচ্ছি। যার ভুক্তভোগী আমাদেরই হতে হবে। এক অপ-বিবর্তনের সাক্ষী আমরা। পরিশুদ্ধ বাংলা বলার ক্ষমতা যেন আমাদের নেই।৷ দীনতা এমন একটি পর্যায় ঠেকেছে যে আমাদের মাতৃভাষা, মাতৃভূমি ও দেশপ্রেম নিয়ে কপটতা প্রকাশ পাচ্ছে। যথেষ্ট রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের অভাব এবং বাংলা ভাষার প্রতি আমাদের মানসিক অনীহা এর অন্যতম কারণ।

একুশের চেতনা দিয়েই বাঙালি জাতির শুরু। যে চেতনায় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, যা পরবর্তী সময়ে ১৯৭১ সালে চূড়ান্তভাবে বিকাশ লাভ করে, তা থেকেই আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং আমরা পেলাম স্বাধীন বাংলাদেশ। 

আমরা স্বাধীন দেশ পেলাম কিন্তু আজও আমরা নিজের ভাষার চর্চা না করে অপসংস্কৃতিতে নিমজ্জিত। এ অপসংস্কৃতি, দেশপ্রেমহীনতা ও দুর্নীতি দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। আমরা এখন বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছি। অথচ চীন, কোরিয়া, জাপান, জার্মানি, তুরস্ক, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স এমনকি ইরানি জাতি নিজের ভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা করে বিশ্বে নিজেদের অবস্থান অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এসব জাতি দেশপ্রেমের অনবদ্য উদাহরণ তৈরি করেছে। অর্থনীতি, বিজ্ঞান, জ্ঞানে আজ দেশগুলো পরাশক্তি। 

অন্যের ভাষা শিখে আমরা যে আশ্রিত পরজীবী হয়ে সফলতার আনন্দ উপভোগ করতে চেয়েছি তা আমাদের জন্য লজ্জার অথচ নিজ ভাষায় উন্নয়নের সহজ রাস্তাটি আজও আমরা নির্ধারণ করতে পারিনি। বাংলা ভাষাকে আমরা এখনো রাষ্ট্রের সকল স্তরে, সকল বিভাগে পরিপূর্ণভাবে চালু করতে পারিনি। শিক্ষাঙ্গনগুলোরও একই অবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আমরা বেশির ভাগই ইংরেজিনির্ভর। স্বাস্থ্যশিক্ষা, প্রকৌশল নিয়ে একটি বিশ্বমানের বাংলা অনুবাদের বই আজও পাঠ্যপুস্তক হিসেবে পাওয়া যায় না। অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ চালু করার ক্ষেত্রে অনীহা। অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ নেই। অথচ ভাষার মাসে দরদে ষোলো আনা উপচে পড়ে তাদের কণ্ঠে—অবহেলায় টানানো দায়সারা গোছের ব্যানারে। অথচ যেখানে চেতনার অগ্নিস্পর্শে জ্বলে ওঠার কথা আমাদের, সেখানে আমরা মূল চেতনা থেকে সরে যাচ্ছি। যারা আমরা শিক্ষিত হিসেবে দাবি করি তাদের জন্য সত্যিকার অর্থেই ভীষণ লজ্জার বিষয়। ভাষার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাবোধ নেই, নেই আমাদের দেশপ্রেম। তাই এ অবক্ষয় আমাদের শক্তিহীন করে তুলছে দিন দিন। 

আমাদের প্রত্যয় হোক একুশের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে যথার্থ কাজটি দ্রুত সমাপ্ত করা। বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪০ কোটি বাংলা ভাষাভাষী মানুষ আছি আমরা। জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা বাংলা চাই অথচ নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বাংলা বই প্রকাশ করি না—এটা স্ববিরোধিতা। ঘুরে দাঁড়ানো ছাড়া আমাদের কোনো গত্যন্তর নেই। অতি দ্রুততার সঙ্গে এ অবস্থার পরিবর্তন করা আমাদের প্রধান দায়িত্ব, হয়তোবা একটি সামাজিক বিপ্লব বা তার সুস্থ পরিবর্তনের জন্য। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে পৌঁছে দিতে হবে আমাদের গৌরবের ইতিহাস।

ড. আবু ইউসুফ মো. আব্দুল্লাহ: অধ্যাপক, আইবিএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রেসিডেন্ট, নর্দান এডুকেশন গ্রুপ