রঘুরাম জি রাজন ।সাবেক গভর্নর,রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া(আরবিআই) । বর্তমানে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের বুথ স্কুল অব বিজনেসে ফাইন্যান্স বিভাগে অধ্যাপনা করছেন। এমআইটি প্রেস থেকে সম্প্রতি ‘মনিটারি পলিসি অ্যান্ড ইটস আনইনটেন্ডেড কনসিকোয়েন্স’ শিরোনামে তার একটি বই প্রকাশ হয়েছে। প্রজেক্ট সিন্ডিকেটকে দেয়া এ সাক্ষাৎকার বাংলায় ভাষান্তর করেছেন সাবরিনা স্বর্ণা

২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় নীতিনির্ধারকরা যে মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছিল তার অভিঘাত পড়েছিল সর্বত্রই। আপনার নতুন বই ‘মনিটারি পলিসি অ্যান্ড ইটস আনইনটেন্ডেড কনসিকোয়েন্স’ শীর্ষক বইয়ে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। এ নিয়ে সংক্ষেপে যদি বলতেন। 

মুদ্রানীতিকে অনেকেই ভোঁতা অস্ত্র মনে করেন। আবার ক্রিয়াশীল আর্থিক খাতে অনিশ্চিত পরিণতি নিয়ে আসতে পারে এটা। কারণ কঠোর মুদ্রানীতিতে আর্থিক খাতে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব পড়তে পারে। যেমন সুদহার ধরে বেঁধে রাখার নীতিতে অর্থনীতিতে ঝুঁকি গ্রহণ কমে যায়। এতে যেকোনো ধরণের নীতিগত পরিবর্তনের ফলে আর্থিক খাতকে লোকসানের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

এমন ঘটনা এতবার ঘটেছে যে কেউ আর অবাক হওয়ার দাবি করতে পারে না। তবুও মুদ্রানীতি প্রণয়নকারী কর্তৃপক্ষ মাঝেমধ্যে এমন ভান ধরে যে তাদের নীতি থেকে উৎসারিত অভিঘাত সামলানোর দায় ব্যাংক ব্যবস্থাপনা, ব্যবস্থাপক ও তত্ত্বাবধায়কদের। এভাবে বলির পাঁঠা বানিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সর্বদা দায়সারা থেকে যায়। সিলিকন ভ্যালি ব্যাংকের পতন সম্পর্কে ফেডারেল রিজার্ভ প্রণীত ‘বার রিপোর্ট’টিও তেমন একটি ঘটনা। ফেডের ভাইস চেয়ারম্যান মাইকেল এস বার প্রণীত প্রতিবেদনটি গতানুগতিকভাবে ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে সাধারণভাবে যাদের দিকে সন্দেহের তীর ছোড়া হয় সেদিকেই ছুড়েছে। কিন্তু ফেড নীতির পরিমাণগত সহজীকরণ এবং পরবর্তী সময়ে পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়াও দায়ী হতে পারে—এমন কোনো ইঙ্গিত নেই ওই প্রতিবেদনে। 

অবশ্য উৎস দেশের বাইরেও আর্থিক নীতির অভিঘাত পড়ে। এ প্রভাব মূলত ছড়িয়ে পড়ে মূলধন প্রবাহের মাধ্যমে। উৎস দেশের অর্থের কিছু মাত্রায় আন্তঃসীমান্ত প্রবাহ ভালো। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেটি সংকটময় হতে পারে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বহুদূর প্রসারিত পদক্ষেপগুলো তাদের এমন অবস্থানে টেনে নিয়ে গেছে যেখানে রাজস্ব ব্যয় বেড়েছে এবং প্রধান সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে মুদ্রাস্ফীতি। এটি আপনি আপনার বইয়ে লিখেছেন। সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতি নিয়ে ২০২১ সালে আপনার পর্যবেক্ষণে বলেছিলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানা অজুহাত দেখিয়ে জনসাধারণকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে, এটা যেন এমনি এমনি গায়েব হয়ে যাবে। কিন্তু মোদ্দা কথা হলো, যুক্তরাষ্ট্রেও মূল্যস্ফীতি হয়েছে কিন্তু সরবরাহ চেইন সংক্রান্ত জটিলতা থেকে। ২০২৪ সালে সুদহার বৃদ্ধি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ যে পূর্বাভাস দিয়েছে তা কি অতিরিক্ত আশাব্যঞ্জক?

করোনা মহামারীর ফলে সৃষ্ট সরবরাহ চেইন সংকটের কারণে নাকি বড় আকারের আর্থিক প্রণোদনা ও শিথিল মুদ্রানীতির কারণে সৃষ্ট চাহিদার ফলে মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি হলো এ নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। 

২০২২ সালের মার্চ থেকে কঠোর মুদ্রানীতি শুরু হয়। ২০২৪ সালের শুরুর এ সময়টায় মূল্যস্ফীতির অভিঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। অভিবাসন চাঙ্গা হলেও শ্রমবাজারে লক্ষণীয় শ্রমঘাটতি রয়েছে। নীতিনির্ধারকদের এ দ্বিমত করার যথেষ্ট জায়গা নেই যে ‘চিন্তার কিছু নেই, সবকিছুই সাময়িক।’”প্রকৃতপক্ষে এখন পর্যন্ত কঠোর মুদ্রানীতি মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে পারেনি যদিও আমরা সহনীয় অবস্থায় পৌঁছতে পেরেছি। 

এদিকে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার ফলে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে ফেডের কাজ কঠিন হয়ে পড়ে। চীনের অর্থনীতিতেও শ্লথগতি দীর্ঘদিন ধরে বিরাজ করছে। তবুও মার্কিন অর্থনীতিতে সাম্প্রতিক উৎপাদনশীলতা ফেডকে কিছুটা সাহায্য করছে এবং এ-সম্পর্কিত মূল্যবৃদ্ধি যেমন প্রাথমিকভাবে ফেডের কাজকে কঠিন করে তুলেছিল তেমনি চীনা অর্থনীতির সংকটাপন্ন অবস্থা, অভিবাসন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক উৎপাদনশীলতা দেরিতে হলেও ফেডকে সাহায্য করছে। আমাদের আর্থিক সংকোচন সত্ত্বেও মূল্যচাপ যতটা কল্পনা করা হয়েছিল ততটা বাড়েনি। আমার মনে হয় বাজারের প্রাক্কলিত সুদহার হ্রাস ২০২৪-এর শুরু বিবেচনায় বেশ আশাজাগানিয়া। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সুদহার হ্রাস কতটা আশানুরূপ চলবে তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েই যায়।

আপনি ‘মনিটারি পলিসি অ্যান্ড ইটস আনইনটেন্ডেড কনসিকোয়েন্স’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো অনেক কিছু করতে গিয়ে মূল্য স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মতো মৌলিক দায়িত্বে অবহেলা করেছে এবং আর্থিক অস্থিতিশীলতা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। যার কারণে আপনি যুক্তি দেখিয়েছেন যে আর্থিক স্থিতিশীলতাকে বিবেচনায় রেখে ফেডের সুদহার নীতি গ্রহণ করা উচিত। এর বাস্তবিক প্রয়োগ কীভাবে হবে এবং ব্যাংক ব্যতীত আর্থিক ব্যবস্থাপনার অন্য খাতে স্থিতিশীলতা জোরদার করতে নীতিনির্ধারকদের করণীয় কী হতে পারে? 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নিদেনপক্ষে একটি আর্থিক স্থিতিশীলতা কমিটি থাকা উচিত যা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে নেই। মুদ্রানীতি ব্যবস্থাপনা থেকে উদ্ভূত ঝুঁকিসহ যেকোনো পলিসির সঙ্গে যুক্ত ঝুঁকি বোঝার এবং মোকাবেলা করার দায়িত্ব ন্যস্ত করতে হবে ওই কমিটির ওপর। একই সঙ্গে চেয়ারম্যানসহ আর্থিক স্থিতিশীলতা কমিটির কিছু সদস্য, বিশেষত মুদ্রানীতি কমিটির সদস্য হবেন, যেমনটি যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।

আর্থিক স্থিতিশীলতা কমিটি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেবে। এ কমিটির যেকোনো ঝুঁকি মোকাবেলায় এবং স্থিতিশীলতা রক্ষার্থে যেকোনো পরীক্ষিত সুরক্ষা নীতি (যেমন বিনিয়োগ ঋণ) ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক খাতে আরোপ করার ক্ষমতা থাকা উচিত। একই সময়ে আর্থিক নীতি কমিটিকে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গৃহীত টেকসই চরম নীতিনির্ধারণের পরিণতিগুলোকে যাচাই-বাছাই করা উচিত এবং দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। এটি সরাসরি মুদ্রানীতির প্রবাহিত বাতাসের প্রতিকূলে না গিয়ে কিছুটা গা বাঁচিয়ে চলার উপায় মাত্র। 

আপনার বইয়ে উপসংহার টেনেছেন এই বলে যে আমরা একটি নিম্ন মূল্যস্ফীতি ও নিম্ন প্রবৃদ্ধির বিশ্বের দিকে ধাবিত হচ্ছি। বিষয়টি অনেক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকই ভালো করে বুঝে উঠতে পারছে না। নতুন এ পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কোন কোন নীতি গ্রহণ করতে পারে? 

উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আমি প্রথাগত লক্ষ্য নির্ধারণের মাধ্যমে এগোনোর পক্ষপাতী। যতদিন পর্যন্ত সর্বগ্রাসী মূল্যসংকোচন হানা না দেয় ততদিন পর্যন্ত নিম্ন মূল্যস্ফীতির পক্ষে আমি। বরং খুশি হব প্রথাগত মূল্যস্ফীতি কাঠামো যদি মূল্যস্ফীতিকে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখে, উন্নত বিশ্বের জন্য যা ২ শতাংশের আশপাশে। 

প্রায় দুই দশক আগে ও পরে দেয়া একই মন্তব্যের আলোচনার মাধ্যমে আপনি দেখিয়েছেন যে আপনার অবস্থান একই জায়গায় আছে। আপনি লিখেছেন যে আপনি হয়তো একরোখা এবং সংশোধনাতীত কিংবা নির্দোষদের পক্ষে। গত কয়েক দশকে আপনার চিন্তাচেতনায় কী ধরনের পরিবর্তন হয়েছে এবং এতে কোন ঘটনা প্রভাব রেখেছে? কোন কোন ক্ষেত্রে আপনি ভিন্ন উপসংহারে পৌঁছেছেন? 

বেসরকারি আর্থিক খাতে ইতিবাচক প্রণোদনা রয়েছে এবং এটা নিজের দেখভাল নিজেই করতে পারে—এমনটা আর ভাবছি না আমি। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক মহামন্দার পর থেকেই আমার চিন্তায় এ রূপান্তর হয়েছে। এছাড়া আর্থিক খাতের নানা সংকট নিরসনে নীতিনির্ধারকরা সবগুলো দিক দেখতে পারেন এ ব্যাপারেও আমি সন্দিহান। আর্থিক স্থিতিশীলতা অর্জন কখনই সহজ কোনো কাজ নয়। কারণ এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক প্রভাবক নিয়েই আগাম পূর্বাভাস দেয়া দুরূহ। আর্থিক খাতে ঝুঁকি হ্রাসের প্রক্রিয়াটা তাই বেশ কঠিন। 

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]