এখন আমন ধানের মৌসুম চলছে। এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উৎপাদন বেশি হতে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আশঙ্কার চেয়ে কম হওয়া ও হেক্টরপ্রতি ফলন ভালো হওয়ায় এমন পূর্বাভাস সম্ভব হচ্ছে। এদিকে চালের উৎপাদন ভালো হওয়ার বিষয়টিকে বাজার ব্যবস্থাপনার জন্য বিশেষজ্ঞরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। এতে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা বিশেষ করে চালে একটি স্বস্তিকর অবস্থা বিরাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। 

বণিক বার্তায় প্রকাশ, চলতি আমন মৌসুমে প্রায় ১ কোটি ৭২ লাখ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা হাতে নিয়েছিল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)। এরই মধ্যে এ মৌসুমে আবাদকৃত ধানের ৭৫ শতাংশ কাটা হয়েছে। বাড়তি ফলনের কারণে এবার আমন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াবে বলে ডিএইর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি আমন মৌসুমে চালের মোট উৎপাদন হবে প্রায় ১ কোটি ৭৫ লাখ টন। দেশে মোট চাল উৎপাদনের ৪০ শতাংশ আমন মৌসুমে হয়। প্রত্যাশা অনুযায়ী আবাদ না হলেও ডিএইর হিসাব অনুযায়ী, এবার চালের উৎপাদন সংস্থাটির লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াতে যাচ্ছে। ধান কাটা শেষ হওয়া জমির গড় ফলন হিসাবে নিয়ে এবার আমন মৌসুমে মোট ১ কোটি ৭৪ লাখ ৯৮ হাজার টন চাল উৎপাদন হতে পারে বলে জানিয়েছে ডিএই।

এদিকে ডিএই চাল উৎপাদনের প্রাথমিক পরিসংখ্যান তৈরি করলেও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) চূড়ান্ত পরিসংখ্যান তৈরি করে। কিন্তু প্রতি বছরই এ দুই তথ্যের মধ্যে বৈসাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। এছাড়া আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্যে উৎপাদন আরো কম দেখানো হয়। পরিসংখ্যানগত এ বিভ্রাট সরকারের নীতিনির্ধারকদেরও ভোগান্তির কারণ হয়। কারণ উৎপাদনের সঠিক তথ্যের অভাব যথাযথ নীতি গ্রহণের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। তবে এবার সার্বিকভাবে আমন মৌসুমে ধানের ফলন তুলনামূলক ভালো হয়েছে বলে কৃষকসহ খাতসংশ্লিষ্টদের অনেকেই জানিয়েছেন। 

অবশ্য গত বছরও আমন মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪ শতাংশ বেশি চাল উৎপাদন হয়েছে। মূলত ২০২১ সাল থেকেই দেশের দ্বিতীয় প্রধান ধানের জাত আমনের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করছে। এর ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকা নিঃসন্দেহে কৃষি খাতের জন্য বড় অর্জন। কৃষি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, আমনের ভালো ফলনের জন্য পরিষ্কার সূর্যালোক, অধিক সৌর বিকিরণ, অধিক গড় তাপমাত্রা, কম আপেক্ষিক আর্দ্রতা এবং মেঘমুক্ত আকাশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়া গ্রামে এখন কৃষিকাজে কায়িক শ্রমের চেয়ে যন্ত্রের প্রচলন অনেক বেড়েছে। জমি চাষ, ফসল মাড়াই, ধান ভানা সবই মেশিনে হচ্ছে। তাতে মানুষের পরিশ্রম কমছে ও ধান উৎপাদন-পরবর্তী কাজ দ্রুত শেষ করা সম্ভব হচ্ছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এখন সরকারিভাবে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টন চাল মজুদ রয়েছে। এর পাশাপাশি আমন সংগ্রহ চলছে। চলতি আমন মৌসুমে দুই লাখ টন ধান, চার লাখ টন সেদ্ধ চাল ও এক লাখ টন আতপ চাল কেনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। 

এদিকে ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রায় ১০ লাখ ৫৬ হাজার টন চাল আমদানি হয়। তবে চলতি অর্থবছরে এখনো কোনো চাল আমদানি হয়নি। গত অক্টোবরে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের (এফপিএমইউ) সভায় আমন মৌসুমের চাল বাজারে আসা পর্যন্ত চাল আমদানি না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এ বছর চালের বাজার অনেকটাই স্থিতিশীল রয়েছে। গত মাসে মোটা ও মাঝারি আকারের চালের দাম কিছুটা বাড়লেও আমনের চাল বাজারে উঠতে শুরু করলে দাম কিছুটা কমে আসে। 

এ বছর আমন ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে এমন আশাবাদই তৈরি হয়েছে। আমরা প্রত্যাশা করব চলতি অর্থবছরে বিদেশ থেকে চাল আমদানি করার প্রয়োজন পড়বে না। চাহিদার অতিরিক্ত যে চাল উৎপাদন হয় তার মাধ্যমে এ বছর চালের বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে। চাল আমদানির প্রয়োজন না পড়লে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সংকটের এ সময়ে সিদ্ধান্তটি ইতিবাচক হিসেবেই গণ্য হবে। বাংলাদেশ চাল উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। এর পরও আমরা বিগত বছরগুলোয় প্রচুর পরিমাণে চাল আমদানি করেছি। এক্ষেত্রে গত অর্থবছরেও আমাদের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয় ছিল। এর প্রধান একটা কারণ অপচয়। এক হিসাবে দেখা যায়, প্রতি বছর ১৬ লাখ টন চাল ক্রাশিং করার সময় সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। মোটা চাল মেশিনে চিকন করা এর প্রধান কারণ। মিল মালিকরা ভোক্তাদের আকৃষ্ট করার জন্য অপেক্ষাকৃত মোটা চাল চিকন করে বাজারে সরবরাহ করে থাকেন। 

যা-ই হোক, এখন আমন ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার দিকেই মনোযোগী হতে হবে। আমাদের যেহেতু প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হয়। এতে আমন ধানের ক্ষতিও হয়। এ বছর সময়মতো বৃষ্টিপাতও হয়নি। তার পরও আমন ধানের ভালো ফলন কৃষি খাতে অগ্রগতির দৃষ্টান্ত। এটি ধরে রাখতে পারলে আমাদের ভবিষ্যতে চাল আমদানি করতে হবে না। তবে চালের বাজার যেন স্থিতিশীল থাকে, এজন্য নিয়মিত বাজার তদারকি করতে হবে। বর্তমানে সরকারিভাবে চালের মজুদ সক্ষমতা আগের চেয়ে বেড়েছে। এটি আরো বাড়াতে হবে। কৃষক ধান বিক্রি করে ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন। এটিও ধরে রাখতে হবে। আমন ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হোক। কৃষকের হাসিমুখ অম্লান থাকুক। বিদেশ থেকে চাল আমদানি না করে বাংলাদেশী কৃষকদের কাছ থেকে বাজারদরে চাল সংগ্রহের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হোক। তাতে নিঃসন্দেহে কৃষকরা উপকৃত হবেন এবং আগামী বোরো মৌসুমের জন্য তা প্রণোদনা হিসেবে কাজ করবে। পাশাপাশি বোরোর উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়। তাতে চালের বাজার স্থিতিশীল থাকবে। চলতি মৌসুমে আমনের উৎপাদন ভালো হওয়ায় সরকারিভাবে অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ বৃদ্ধি করার সুযোগও বাড়বে। দেশের খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থে এ সুযোগ কাজে লাগানো উচিত।