জ্বালানি তেলের আমদানি, মজুদ ও সরবরাহের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় ২০২১-২২ অর্থবছরে লোকসানের মুখে পড়ে রাষ্ট্রায়ত্ত এ সংস্থা। তবে গত অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে তেলের দাম কমতে শুরু করে। কিন্তু দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আর সমন্বয় করা হয়নি। এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ দামের কারণ দেখিয়ে গত বছরের আগস্টে জ্বালানি তেলের রেকর্ড মূল্য বাড়ানো হয়। এতে গত অর্থবছরে বড় মুনাফা করতে সক্ষম হয় বিপিসি।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, গত অর্থবছরে (২০২২-২৩) জ্বালানি তেল বিক্রি বাবদ আয় বেড়েছে বিপিসির। যাবতীয় পরিচালন ও আর্থিক ব্যয় বাদ দিয়ে গত অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির কর-পূর্ববর্তী মোট মুনাফা হয়েছে ৬ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা। আর কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ৪ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। এ সময় সরকারি কোষাগারে আমদানি শুল্ক, ভ্যাট, লভ্যাংশ, আয়করসহ বিভিন্ন খাতে মোট ১৫ হাজার ৪৯২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা জমা দিয়েছে বিপিসি। 

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির লাভজনক অবস্থান নিঃসন্দেহে স্বস্তির। তবে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের যে উচ্চমূল্য বজায় রয়েছে, তা পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। কারণ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে উৎপাদন ও সরবরাহের বিষয়টি জড়িত। গত বছর ডিজেল-অকটেন-পেট্রলসহ সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর উৎপাদন ও পরিবহন খাতে খরচ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। 

এদিকে অর্থনীতির সব ‍সূচকে নিম্নমুখী পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার। এতে আগস্টেই জ্বালানি তেলের দাম সামান্য কমানো হয়। তবে এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে কমলেও দেশে আর তেলের দাম কমানো হয়নি। এর মধ্যে জ্বালানি তেলে ভর্তুকি বন্ধের শর্ত দেয় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। ঋণের শর্ত হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তেলের দাম প্রতি মাসে সমন্বয়ের শর্ত দেয়া হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে আইএমএফের পরামর্শে নীতিমালা করলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে। নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে বিপিসির মুনাফা বা লোকসান প্রায় শূন্য পর্যায়ে নেমে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বিপিসি ১০ শতাংশ মুনাফা দাবি করেছে। এটি হলে জ্বালানি তেলের দাম কমার সম্ভাবনা আর থাকবে না। তাই এ নিয়ে এরই মধ্যে আপত্তি উঠেছে।

বিশেষ করে চলমান মূল্যস্ফীতির ফলে জর্জরিত নির্দিষ্ট আয়ের মানুষকে একটু স্বস্তি দেয়ার জন্যই জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় দরকার। বস্তুত বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের কারণে বিপিসি গত অর্থবছরের প্রথমার্ধে লোকসানে ছিল। কিন্তু জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোয় সংস্থাটি লাভের মুখ দেখে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য আগের মতো অব্যাহত থাকলে বিপিসির লোকসান হতো। কিন্তু দাম কমায় ওই অর্থবছরে লাভে ফেরে।

দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদার মাত্র ৮ শতাংশ স্থানীয় উৎস থেকে পূরণ হয়। বাকি চাহিদার পুরোটাই পূরণ হয় আমদানির মাধ্যমে। বিপিসি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানি করে। এর বাইরে আটটি দেশ থেকে জিটুজি চুক্তির মাধ্যমে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। ভোক্তা পর্যায়ে পেট্রোলিয়াম পণ্যের মধ্যে এখন ডিজেলের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি পরিবহন খাতেও জ্বালানি হিসেবে পণ্যটির ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। এইচএফও বা ফার্নেস অয়েল শিল্প ও পরিবহন খাতে ব্যবহার হচ্ছে। বিপিসির ভাষ্যমতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে জ্বালানি তেলের অতি উচ্চমূল্য কাটিয়ে সব ধরনের সমস্যা মোকাবেলা করে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কারণে দেশ এ সংকট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে।

বিপিসি সবসময় লাভজনক থাকুক, এটিই আমাদের প্রত্যাশা। কিন্তু এ লাভ করতে গিয়ে জনগণের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় কিছুতেই কাম্য নয়। এজন্য আন্তর্জাতিক বাজার বিবেচনায় জ্বালানি তেলের দাম পুনর্মূল্যায়ন করে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা হিসেবে বিপিসির উচিত সাধারণ মানুষের স্বস্তির বিষয়টি চিন্তা করা।