বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম উৎস প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ। এ অর্থ সামষ্টিক অর্থনীতির ভিতকে শক্তিশালী করছে। তবে প্রবাসের শ্রমবাজার আমাদের শ্রমশক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রস্থল হলেও হুমকিস্বরূপও বটে। প্রবাসে দেশের শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত প্রতারণা, হয়রানি, নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এমনকি প্রাণও হারাচ্ছেন। কিন্তু এর প্রতিকার নেই বললেই চলে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী জানা যায়, এসব বিষয়ে ভুক্তভোগী কিংবা দেশে থাকা স্বজনরা প্রতিকার চেয়ে জনশক্তি কমর্সংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোয় (বিএমইটি) অভিযোগ করে থাকেন। তবে বছরে কয়েক হাজার অভিযোগ জমা পড়লেও তা নিষ্পত্তির হার অর্ধেকেরও কম। গত পাঁচ বছরে হয়রানি-নির্যাতন নিয়ে সংস্থাটির কার্যালয়ে যত অভিযোগ জমা পড়েছে, তার ৬১ শতাংশ প্রবাসীই কোনো প্রতিকার পাননি। এমনকি যারা প্রতিকার পাচ্ছেন, ক্ষতিপূরণ হিসেবে তার পরিমাণও যৎসামান্য। 

প্রবাসীরা বিএমইটিতে মূলত চার ধরনের অভিযোগ করেন। এর মধ্যে বিদেশে গিয়ে চাকরি না পাওয়া, আকামা জটিলতা, বেতন ও চুক্তি অনুযায়ী কাজ না পাওয়া। এসব বিষয়ে সরকারের দপ্তরটিতে অভিযোগ জানালে তা তদন্ত ও অনুসন্ধান শেষে নিষ্পত্তি করে বিএমইটি। নানা বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে প্রতি বছরই বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশী কর্মীর সংখ্যা বাড়লেও সে তুলনায় প্রবাসী আয় বাড়ছে না। ২০২৩ সালের প্রথম ১১ মাসেই ১২ লাখ ১০ হাজার কর্মী বিদেশে গেছেন। ২০২২ সালে এ সংখ্যা ছিল ১১ লাখ ৪০ হাজার। সংশ্লিষ্টদের মতে, রেমিট্যান্স প্রবাহ না বাড়ার পেছনে দায়ী প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর হওয়া নির্যাতন ও প্রতারণা।

বিদেশে যেতে অনেক প্রবাসী জমি বিক্রি, ধার-দেনা এমনকি ঋণ করে সর্বস্ব হারাচ্ছেন। ভুয়া এজেন্সির মাধ্যমে, দালালের মাধ্যমে ‍বিদেশে গিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন। এসব নানামুখী চ্যালেঞ্জ নিয়ে সেখানে গিয়ে কাজ না পাওয়া, বেতন ঠিকমতো না হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেই চলছে। প্রতারিত হয়ে দেশ থেকে পাঠানো টাকায় কোনো রকমে দিন যাপন করেন অনেকে। দেশে ফিরতেও পারেন না কিংবা খালি হাতে ফিরে আসেন অনেকেই। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য বলছে, গত বছর ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত শূন্য হাতে দেশে ফিরে এসেছেন ৮০ হাজার ৮১১ প্রবাসী। প্রবাসে এসব হয়রানি-নির্যাতন বন্ধে বিএমইটির কাজের গতি ও তদারকি বাড়ানো আবশ্যক। অভিযোগ নিষ্পত্তির হার বাড়াতে হবে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে এটি করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে তদারকি জোরদার করতে হবে। 

সাধারণত বিএমইটির কাছে কোনো প্রবাসী হয়রানি কিংবা নির্যাতনের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ করলে সেটি এক মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু তথ্য-উপাত্ত বলছে, বছরের পর বছর নিষ্পত্তি না হওয়া অভিযোগের সংখ্যাই বেশি। দিনের পর দিন সংস্থাটির দোরগোড়ায় ঘুরেও প্রতিকার পান না ভুক্তভোগী ও তাদের স্বজনরা। তবে প্রতিকার পেতে এবং এ ধরনের বিপদ এড়াতে প্রবাসীদের সচেতন হওয়াও অতীব জরুরি। বিদেশে যাওয়ার জন্য কর্মীরা যে এজেন্সির কাছে টাকা দেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ লেনদেনের কোনো লিখিত কাগজপত্র থাকে না। ফলে কর্মীরা অভিবাসনের ক্ষেত্রে বিদেশে গিয়ে কোনো বিপদে পড়লে এবং বিএমইটিতে অভিযোগ করে ক্ষতিপূরণ চাইলে তার যথাযথ ক্ষতিপূরণ আদায় হয় না। এক্ষেত্রে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো যেমন পার পেয়ে যায়, তেমনি অভিযোগেরও সুরাহাও হয় না। 

সরকারিভাবে বিদেশ যেতে যে অর্থ ব্যয় হয়, তুলনামূলক রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে অনেক বেশি পরিমাণ অর্থ দিতে হয়। আবার রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে যাওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকিও থাকে অনেক বেশি। তবু প্রবাস যেতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা কেন সরকারিভাবে না গিয়ে এজেন্সির মাধ্যমে যায় তা জানা দরকার। সে অনুসারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অনেকের অভিযোগ, এ মন্ত্রণালয়ের ধীরগতির পন্থা ও ব্যর্থতায় প্রবাসে থাকা কর্মীদের হয়রানি-নির্যাতন বছরের পর বছর বেড়েই চলেছে।

বিদেশে গিয়ে কোনো কর্মী যেন হয়রানি-নির্যাতনের শিকার না হন এবং প্রতারিত হয়ে ফিরে না আসেন তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে; বাংলাদেশ মিশনগুলোকে তদারকি বাড়াতে হবে। হয়রানি ও প্রতারিত হওয়া থেকে প্রবাসী কর্মীদের রক্ষা করতে হলে প্রতিটি নিয়োগ ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখতে হবে। কাগজপত্র ঠিক থাকা সত্ত্বেও কর্মীরা যেন বিদেশে হয়রানির শিকার না হন, গন্তব্য দেশে তাদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এর পরও যদি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দেশে নানামুখী পদক্ষেপ সত্ত্বেও কোনো প্রবাসী কর্মী দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন, তাহলে দেশে তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার জন্য পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। আবার তারা যেন আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে আয় করতে পারেন সেজন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা তাদের নিশ্চিত করতে হবে। তবে অনেক সময় দেখা যায়, প্রবাসী কর্মীরা ফিরে আসেন অদক্ষতার কারণে।

কর্মীদের বিদেশ গমনের আগে যথাযথ ট্রেনিং দেয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। উন্নত প্রযুক্তির যুগে দক্ষতা ছাড়া মানবসম্পদকে কাজে লাগানো ভবিষ্যতে আরো মুশকিল হয়ে পড়বে। সেজন্য প্রয়োজনীয় প্রণোদনার মাধ্যমে প্রবাসী কর্মীদের জন্য দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে তারা প্রবাসে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে উপার্জন বাড়াতে পারবে।