কভিড-১৯ মহামারী এবং ইউক্রেনে যুদ্ধের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে, যা বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করেছে। গত বছর বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য যে চূড়ায় পৌঁছেছিল তা থেকে নিচে নেমেছে, কিন্তু এতেই তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলা উচিত হবে না। কারণ বিশ্বের খাদ্য সংকটের সমাধান এখনো অনেক দূরে। দ্রব্যমূল্যের অস্থিরতার ঝুঁকি এখনো অনেক বেশি। 

একদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কৃষ্ণ সাগরীয় শস্যচুক্তি বাতিল করা, অন্যদিকে ইউক্রেনের রফতানি অবকাঠামোর ওপর আক্রমণ। এর ফলে শস্যের মূল্য আবারো ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। কিন্তু ত্রুটিপূর্ণ খাদ্যবাজার দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিতে রয়েছে। গমের মূল্য মহামারীপূর্ব থেকে দ্বিগুণেরও বেশি ব্যয়বহুল হয়েছে। সর্বোপরি, খাদ্যের মূল্যস্ফীতি বেশির ভাগ উন্নয়নশীল দেশে এখনো ৫ শতাংশের অধিক, রুয়ান্ডা ও মিসরের মতো দেশগুলোয় যা ৩০ শতাংশ ছুঁয়েছে। খুব সম্ভবত খাবারের মূল্যের আরেকটি উল্লম্ফন ঘটতে চলেছে। 

আসল সমস্যা হলো, অধিকাংশ কৃষি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমবর্ধমান বাজার শক্তি যা খাদ্যমূল্যের চরম পরিবর্তনের ঝুঁকিকে স্বাভাবিক করে তুলছে। 

সার খাতের দিকে তাকানো যাক। ২০২০-২২ সালে সারের মূল্য তিন গুণ বৃদ্ধিতে বেড়েছিল খাদ্যমূল্য। প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধিতে নাইট্রোজেন সারের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু গ্রেইন/আইএটিপি থেকে প্রাপ্ত উপাত্তে দেখা গেছে, শীর্ষস্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সংগতি রেখে যে দাম বাড়ানোর কথা তার চেয়ে বেশি বাড়িয়েছে। এতে বিক্রির পরিমাণ কমলেও তাদের পরিচালন মুনাফা ৩৬ শতাংশ বেড়েছে। উৎপাদন ব্যয়ের বিপরীতে মুনাফার অনুপাত ইউক্রেন যুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় তিন গুণ বেড়েছে, যা এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের তালিকাভুক্ত শীর্ষ ৫০০ প্রতিষ্ঠানের ১৩ শতাংশ গড় মুনাফার চেয়ে বেশি। 

বৈশ্বিক শস্য কোম্পানিগুলো সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে রেকর্ড মুনাফা করেছে। ২০২২ সালের মাঝামাঝিতে বহুজাতিক শস্য কোম্পানি আর্চার-ড্যানিয়েলস-মিডল্যান্ড (এডিএম) রেকর্ড প্রান্তিকীয় মুনাফা করেছে। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী কারগিলও রেকর্ড মুনাফা ঘরে তুলেছে। তাদের মোট আয় ২৩ শতাংশ বেড়েছে। 

এমন মুনাফা অর্জন সম্ভব হয়েছে খাদ্য ও সার খাতে পুঞ্জীভূত করপোরেট প্রভাব বৃদ্ধির ফলে। এডিএম, কারগিল, বাঞ্জ ও ড্রেফাস এ চার জায়ান্ট কোম্পানি একত্রে ‘এবিসিডি’ হিসেবে পরিচিত। তারা বিশ্ব শস্যবাজারের আনুমানিক ৭০-৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। কেবল এ চার সংস্থাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৭৫ শতাংশ নাইট্রোজেন সার এবং বিশ্বের ৭২ শতাংশ পটাশ সার উৎপাদন করে। 

দশকের পর দশক এসব প্রতিষ্ঠান একত্রীকরণ ও অধিগ্রহণের মাধ্যমে তারা সরবরাহ চেইনের ওপর তাদের প্রভাব বাড়াতে পেরেছে, একই সঙ্গে বাজারের বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করেছে। বর্তমানে পণ্যবাজারের বৃহৎ প্রতিষ্ঠান গ্লেনকোর’র শস্য বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান বাংগি এবং ভিটেরার একত্রীকরণের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত ৩৪ বিলিয়ন ডলার যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে সয়াবিন ও ক্যানোলা প্রক্রিয়াকরণ এবং বাজারজাতে অধিক মনোযোগ নিবদ্ধ করবে।

শীর্ষস্থানীয় কৃষিভিত্তিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিশাল সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও মূল্য নির্ধারণ ক্ষমতা তেলের বাজারে ওপেকের ন্যায় ভূমিকা উপভোগ করে। তারা এ ক্ষমতা ব্যবহার করতে সংকোচ বোধ করে না। বাজারে অস্থিরতার পূর্ববর্তী পর্বগুলো, যেমন ১৯৭০ দশক ও ২০০৮-১১ সালে সার ও শস্য-বাণিজ্য খাতে উচ্চমুনাফার দিকে পরিচালিত করে। ২০২১ মার্কিন নিয়ন্ত্রকদের কাছে পাঠানো এক নথিতে বিশ্বের বৃহত্তম সার কোম্পানি নিউট্রিয়েন জানায়, উচ্চ কাঁচামাল ব্যয়ের কারণে তারা বিক্রয়মূল্য বাড়িয়েছে এবং এতে বিক্রির পরিমাণ কমেছে। 

বিশ্বের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে এতটুকু খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির প্রভাবও ব্যাপক। কারণ তারা তাদের আয়ের ৬০ শতাংশই খাদ্যের পেছনে ব্যয় করে। খাদ্য ও সারের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধিতে অনেক নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশ ৬০ বছরের সবচেয়ে ভয়াবহ ঋণ সংকটে ভুগছে। 

এদিকে কৃষকরা এ খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি থেকে লাভবান হতে পারছেন না। কেননা কৃষিসামগ্রী, যেগুলোর জোগান দেয় বাজারে বিপুল ক্ষমতা থাকা বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, তাদের খরচ নিত্যপণ্যের খরচের চেয়েও দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। একদিকে কৃষকরা নিম্নমূল্যে পণ্য বিক্রি করছেন, অন্যদিকে কৃষিঋণের উচ্চ সুদহারের ভারে নাভিশ্বাস উঠে এসেছে। 

রাশিয়ার শস্যচুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্তে ভবিষ্যৎ সরবরাহ বাজারে ফের গমের দাম বাড়তে পারে। এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে খাদ্যমূল্য সতর্কতা ছাড়াই বাড়তে পারে। সামনের দিনগুলোয় আরো সংকট আসতে পারে এতে কোনো সন্দেহ নেই। বিশ্বের খাদ্য ব্যবস্থার ওপর কয়েকটি কোম্পানি যদি ভবিষ্যতেও এ ধরনের একক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে তাহলে এর পরিণতি আরো ভয়াবহ হতে পারে। এ কারণে পরবর্তী সংকট আসার আগেই সরকারগুলোকে অবশ্যই প্রণোদনা পরিবর্তনে কাজ করতে হবে।

কৃষি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর অভাবনীয় লাভের ওপর কর আরোপ করে এবং সেই তহবিলকে জলবায়ু সহনশীল খাদ্য ব্যবস্থায় পুনর্বিনিয়োগের জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে। সেই সঙ্গে কৃষক সমাজের দাবি অনুযায়ী সারের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি সরকারের যাচাই-বাছাই করার পাশাপাশি অত্যধিক একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ রোধ করতে প্রতিযোগিতা নীতির শক্তিশালী প্রয়োগ প্রয়োজন। সরকারগুলোর উচিত একচেটিয়া বাণিজ্য ভাঙার জন্য পদক্ষেপ নেয়া, যা তারা কয়েক দশক ধরে করতে পারেনি।

বাঞ্জ-ভিতেরা একীভূতকরণ একটি আদর্শ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে কোন ধরনের একত্রীকরণ সত্যিই জনগণের স্বার্থে করা হয় তা মূল্যায়ন করার জন্য। এবং একটি সতর্কবার্তার সময় এসেছে, খাদ্য সংকট থেকে অতিরিক্ত মুনাফা করা বরদাস্ত করা হবে না।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]


জেনিফার ক্ল্যাপ: আইপিইএস-ফুড প্যানেল বিশেষজ্ঞ, জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের ভাইস চেয়ারম্যান এবং ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। 

ফিল হাওয়ার্ড: আইপিইএস-খাদ্য প্যানেল বিশেষজ্ঞ, মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির কমিউনিটি সাসটেইনেবিলিটির অধ্যাপক।

ভাষান্তর: সাবরিনা চৌধুরী