চলতি বছর আমন ধানের রেকর্ড উৎপাদন হয়েছে। এর পরও বাজারে চালের দাম বাড়ছে। অভিযোগ উঠেছে, মিল মালিকরা পারস্পরিক যোগসাজশে চালের দাম বাড়াচ্ছেন। কারণ ভরা মৌসুমে এভাবে চালের দাম বৃদ্ধি অযৌক্তিক। 

বণিক বার্তায় প্রকাশ, আমন মৌসুমের ধান কাটা-মাড়াই প্রায় শেষের দিকে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ বছর আমনের উৎপাদন আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। বাজারে আমনের চাল সরবরাহও হচ্ছে ডিসেম্বরের শুরু থেকে। এ সরবরাহ পুরোদমে থাকলেও এখন মিল, পাইকারি ও খুচরা প্রায় সব পর্যায়ে চালের দাম বাড়ছে। শুধু পাইকারিতেই গত এক সপ্তাহে চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৪-৬ টাকা। সংশ্লিষ্টদের মতে, সাধারণত নতুন মৌসুমের চাল বাজারে আসার আগে দাম বাড়তে দেখা যায়। কিন্তু এবার আমনের চাল সরবরাহের ভরা মৌসুমেও হঠাৎ দাম বাড়তে দেখা যাচ্ছে। অভিযোগ উঠছে, মুনাফা বাড়ানোর প্রবণতা থেকে মিল পর্যায়েই কৃষকদের থেকে কম দামে কেনা চালের মূল্য বাড়ানো হচ্ছে। 

চাল আমাদের প্রধান খাদ্য। চালের দাম বাড়লে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে। একটি পরিবারের খাদ্য বাবদ ব্যয়ের সিংহভাগ চাল কেনার ক্ষেত্রে চলে যায়। চালের মূল্য বৃদ্ধির ফলে দরিদ্র মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। দুর্মূল্যের বাজারে চাল কিনতে গিয়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তদের মাছ, মাংস, ডিম, দুধ অর্থাৎ আমিষজাতীয় খাবার কেনা অনেকটা কমিয়ে দিতে হয়।

চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয়। উৎপাদন ভালো হলেও বাংলাদেশের বাজারে অদৃশ্য সিন্ডিকেটের কারসাজিতে চালের দাম নিয়ন্ত্রণ হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে উৎপাদন ও সরবরাহ বেশি থাকলে পণ্যের দাম কমে—অর্থনীতির এ নিয়ম চালের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না। এমনকি মন্ত্রী পর্যায় থেকে প্রশাসনের দৌড়ঝাঁপেও চালের দাম কমে না। ফলে সিন্ডিকেট অযৌক্তিক মুনাফা করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়। আবার চালের দাম বাড়ার ফলে অন্যান্য পণ্যের দামও বেড়ে যায়। তাই চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেয়া উচিত। এছাড়া আমনের ভরা মৌসুমে চালের দাম বৃদ্ধির ঘটনা এবারই প্রথম ঘটেছে এমনটি নয়, গত বছরও এ সময়ে চালের দাম বেড়েছে। তখনো মিল মালিক ও ব্যবসায়ীদের দোষারোপ করা হয়েছে। এমনকি ২০২২ সালেও চালের বাজার অস্থিতিশীল ছিল। অথচ সে বছরও আমন ধানের ভালো ফলন হয়। আবার আমনের পর বোরো মৌসুমে ধান উৎপাদনের রেকর্ড হলেও বাজারে চালের দাম বেড়েছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে চালের বাজারে সিন্ডিকেশন নতুন কিছু নয়। প্রতি বছরই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজার অস্থিতিশীল করে তোলা হচ্ছে। চলতি বছর এক্ষেত্রে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রভাবকেও সামনে আনা হয়েছে। তবে নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পরও বাজারে চালের মূল্য কমেনি। সে হিসেবে সিন্ডিকেটের প্রভাবকেই দায়ী করা হচ্ছে। যথাযথ সরকারি তদারকির অভাবে তারা সব সময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে বলে ধরে নেয়া হয়। এছাড়া বাজারে চালের দাম বৃদ্ধিতে বর্তমানে মিলার, আড়তদার, পাইকারদের পাশাপাশি মৌসুমি ব্যবসায়ী ও অনলাইন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত চাল মজুদের ভূমিকা রয়েছে। এক্ষেত্রে খুচরা বাজারের ব্যবসায়ীরা বেশি দামে পাইকারদের কাছ থেকে কেনার বিষয়টি তুলে ধরেন।

বর্তমানে চাল আমদানি বন্ধ রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকটের কারণে আমদানিতে সংকোচনমূলক নীতির ফলে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কিন্তু চালের বাজারে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করলে আমদানির সিদ্ধান্তে ফিরে যাওয়ার বিকল্প নেই বলে অর্থনীতিবিদরা মত দিয়েছেন। এছাড়া চালের দামের ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে চালের দাম বৃদ্ধির প্রভাবটিকেও কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ বিশ্ববাজারে চালের দাম এখন এক যুগের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। এ দাম বৃদ্ধি নিয়ে বিশ্লেষকরা আগেই আভাস দিয়েছিলেন। তবে দেশের চালের বাজার দীর্ঘদিন উচ্চ মূল্যে স্থিতিশীল থাকার পর অস্থিতিশীল হওয়ার পেছনে মিল মালিকদের কারসাজিকেই দায়ী করা হচ্ছে। এজন্য চালের দাম কমার ক্ষেত্রে বাজারে নতুন চাল আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে, এমনটিও ধরে নিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

অতীতের ধারাবাহিকতায় দেখা যাচ্ছে, চালের বাজারে এ ধরনের সংকট নতুন নয়। দেশের খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থে এ রকম মাৎস্যন্যায় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এজন্য ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (টিসিবি) সক্রিয় করে খোলাবাজারে সীমিত আয়ের মানুষের কাছে নিয়মিত চাল বিক্রির উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমাতে সর্বোচ্চ পদক্ষেপের বিকল্প নেই। কারণ দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থে চালের বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা দরকার। এক্ষেত্রে সরকারের বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা নিয়ে যে অভিযোগ রয়েছে, তা দূর করতে হবে। কারণ যথাযথ মনিটরিংয়ের অভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এ পরিপ্রেক্ষিতে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে সিন্ডিকেটের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ যেন না হয় সেটি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে সীমিত পরিমাণে হলেও চাল আমদানির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত। এছাড়া আমন ধান উৎপাদনের প্রকৃত তথ্য যাচাই করার ক্ষেত্রে সমন্বয় সাধন করা জরুরি। তাহলে চাল উৎপাদন ও আমদানি নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে। আমরা প্রত্যাশা করি, সরকারের সঠিক সিদ্ধান্তে চালের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। এজন্য কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ভূমিকা কাম্য।