গত কিছুদিন মেট্রোরেলে নারীদের বগিতে পুরুষরা উঠেছেন এবং এটাকে অনেকভাবে বাহবা দেয়া হয়েছে। আমি এমন অনেক নারীকেও দেখেছি যারা ভাবেন সংরক্ষিত আসন তাদের জন্য অপমানজনক। এ সংরক্ষিত যাত্রী আসনের বিষয়টা ইতিবাচক বৈষম্য হিসেবে করা হয়েছে, যা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। এর আইনি তাৎপর্য নিয়ে অনেকেই অবগত নন।
ইতিবাচক বৈষম্য শুনলেই মনে হতে পারে যেন সোনার পাথরবাটি বা কাঁঠালের আমসত্ত্বের মতো ব্যাপার-বৈষম্যের মতো আগাগোড়া একটা নেতিবাচক বিষয় আবার ইতিবাচক হয় কীভাবে? বিষয়টি তাই আমাদের সবার জানা উচিত, বিশেষ করে যখন আমরা সেই সব মানুষের কথা বলি যারা একই সঙ্গে নানাভাবে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যেতে পারে। ধরুন বাংলাদেশে এখন ফেসবুক ও ইন্টারনেট বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, যার একটা ফেসবুক প্রোফাইল আছে, সেই ফেসবুক ব্যবহার করতে পারবে। যার একটি ডিভাইস আছে, সেই ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবে, অর্থাৎ এক্ষেত্রে আসলে এক ফেসবুক বা ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সঙ্গে আরেকজনের কোনো পার্থক্য নেই। কারণ ফেসবুক আর ইন্টারনেট ব্যবহারের নিয়ম তো সবার জন্যই এক, সবার জন্য সমান।
কিন্তু চিন্তা করলেই দেখা যাবে বিষয়টি এত সহজ না। যেমন ধরুন, ‘ক’ ঢাকা শহরের একটি সচ্ছল পরিবারে জন্ম নিয়েছে। জন্মের পর থেকেই ‘ক’ তার বাড়িতে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সংযোগ পেয়েছে এবং তার কাছে সবসময় ওয়াই-ফাই এবং মোবাইল ডাটা থাকে। সে ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়েছে, ফলে ইংরেজি খুব সহজে পড়তে ও বুঝতে পারে।
তারপর ‘খ’-এর কথা ভাবুন। ‘খ’-এর পরিবারে দুটি মাত্র মোবাইল ডিভাইস, কোনো ল্যাপটপ নেই। একটি পিসি আছে তার বাবার ঘরে। পুরুষ তত্ত্বাবধান, অর্থাৎ ভাই বা বাবা বসে না থাকলে ‘খ’ ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারে না। ‘খ’-এর পরিবারের মোবাইল ডিভাইসগুলো তার মা আর বাবার কাছে থাকে এবং ‘খ’-এর প্রয়োজন হলে বাবা-মাকে বলে তারপর সে মোবাইল ব্যবহার করে।
‘ক’ আর ‘খ’ দুজনই এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে।
‘গ’ কেবল চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছে। সে একজন পেশাদার ট্রাকচালক। তার কাছে একটি স্মার্টফোন আছে। কিন্তু পেশার কারণে সে ওয়াই-ফাই ব্যবহারের সুযোগ খুব কম পায়। মোবাইল ডাটা ছাড়া সে ফেসবুক ব্যবহার করতে পারে না। সে যে রুটে গাড়ি চালায় সেখানে আবার নেটওয়ার্ক খুব দুর্বল থাকে।
এখন চিন্তা করে দেখা যাক, ‘ক’, ‘খ’ আর ‘গ’ তিনজনই একই ফেসবুক সার্ভিস ব্যবহার করছে। ফেসবুকের ফাংশন আর সুযোগ-সুবিধা আপাতভাবে যেকোনো ব্যবহারকারীর জন্য এক। কিন্তু তার পরও ‘ক’, ‘খ’ আর ‘গ’ কিন্তু সমানভাবে ফেসবুক ব্যবহার করতে পারছে না।
আইনের চোখেও ‘ক’-‘খ’-‘গ’ নাগরিক যারা সবাই সমান, কিন্তু সত্য কথা এই যে ‘খ’ ও ‘গ’ অপেক্ষাকৃতভাবে পিছিয়ে আছে। কারণ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত দিক থেকে তাদের ‘ক’-এর চেয়ে কম সুযোগ-সুবিধা পেয়েছে। ফলে আগামীকাল যদি ইন্টারনেট ব্যবহার করে কোনো সরকারি সাহায্য নিতে হয় যা সব নাগরিকের একইভাবে পাওয়ার অধিকার আছে, সেখানে ‘খ’ ও ‘গ’-এর সাহায্য পাওয়ার সুযোগ এবং দক্ষতা ‘ক’-এর চেয়ে কম থাকবে।
সমান অধিকার তাদেরকেই সাহায্য করে যারা সমান। অসমানদের সমান করার জন্য আগে বাড়তি কিছু দিয়ে সমান-অসমানের ফাঁক পূরণ করতে হবে। বিশেষ করে নারীদের ইতিবাচক বৈষম্যকে খুব ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়। মেয়েদের জন্য ইতিবাচক ব্যবস্থা নিলে অনেকেই সেটাকে বাড়তি সুবিধা ভাবেন। যেমন কেন মেয়েদের আলাদা বাসের সিট, কেন ট্রেনে মেয়েদের আলাদা কামরা থাকবে, কেন সংসদে নারীদের সংরক্ষিত আসন থাকবে, কেন নারী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা উপবৃত্তি থাকবে। যারা আপত্তি জানান তাদের যুক্তি হলো, নারী-পুরুষ যদি সমানই হয়, তবে এত সুবিধা কেন? মেয়েরা যদি দুর্বল-ই না হয়, তবে পুরুষরা কেন এসব সুবিধা পাবেন না?
এ প্রশ্নগুলো কিন্তু ফেলে দেয়ার মতো নয়! মানবাধিকার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমি দেখেছি, ষষ্ঠ শ্রেণীর শিশু থেকে অভিজ্ঞ শিক্ষক এমনকি পরিপক্ব সরকারি কর্মকর্তারাও এ প্রশ্ন তুলে থাকেন। এর মানে, বিষয়টি পরিষ্কার নয়। ইতিবাচক বৈষম্য নাগরিক জীবনে নারীদের সমতা নিশ্চিত করে (দুঃখজনকভাবে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ক্ষেত্রে বৈষম্যের জন্য কোনো আইন এ দেশে নেই। ক্ষেত্র বিশেষে, পারিবারিক সহিংসতা আইন সাহায্য করে)।
এই যে ওপরের গল্পে ‘ক’, ‘খ’ আর ‘গ’-এর পার্থক্য একে আমরা বলি ইন্টারসেকশনালিটি। এর অর্থ, একজন মানুষ তার জন্মগত নানা পরিচয়ের কারণে একাধিক বৈষম্যের শিকার হওয়া ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়া। এ বঞ্চনা হওয়ার কারণ সমাজ বা রাষ্ট্র ব্যবস্থা ওই মানুষের প্রয়োজন মাথায় রেখে আইন ও নীতি গঠন করে না। যেমন একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বৈষম্যের শিকার হতে পারেন যখন একটি দালানে কোনো র্যাম্প না থাকে। একজন সংখ্যালঘু ব্যক্তি বৈষম্যের শিকার হতে পারেন, যখন কোনো প্রতিষ্ঠানে তার উৎসবের জন্য নির্দিষ্ট ছুটি না রাখা হয়। একজন নারী বৈষম্যের শিকার হতে পারেন যখন কোনো প্রতিষ্ঠানে তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না থাকে।
এখন ‘ঘ’ একজন সংখ্যালঘু নারী, যার শারীরিক প্রতিবন্ধিতা রয়েছে। তিনি বাসে উঠতে পারেন না। কারণ ঢাকা শহরের বাসে কোনো র্যাম্প নেই, যার মাধ্যমে তিনি হুইলচেয়ারে বসে বাসে উঠবেন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে র্যাম্প না থাকায় তাকে প্রতিদিন সহায়কের সহায়তায় লিফট পর্যন্ত যেতে হয়। কোনো কোনো অফিসে নারীদের জন্য আলাদা শৌচাগারের ব্যবস্থা নেই। পুরুষদের শৌচাগারে হুইলচেয়ার নিয়ে ঢোকার মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই, ফলে ‘ঘ’-কে অফিস চলাকালীন নানা অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়।
এখন ‘ঘ’-এর অসুবিধার কথা মাথায় রেখে অফিসে যদি তার জন্য র্যাম্প কিংবা শৌচাগারের ব্যবস্থা করা হয় যেখানে সক্ষম ব্যক্তিরা যাবে না, তখন তাদের কাছে মনে হতে পারে, ‘ঘ’-কে বিশেষ সুবিধা দেয়া হচ্ছে, যে সুবিধা সক্ষমরা পাচ্ছে না। এ বৈষম্যই ইতিবাচক বৈষম্য। অর্থাৎ শারীরিক অবস্থাগত কারণে কোনো কিছু থেকে বঞ্চিত হওয়া মানুষের জন্য রাষ্ট্র বাড়তি কোনো ব্যবস্থা করলে সেটা আসলে বিশেষ সুবিধা নয়, বরং সেই বাড়তি সেবা পাওয়া সেই ব্যক্তির অধিকার। এটি এমন এক বৈষম্য যা ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টির জন্যই করা হয়, এ বৈষম্য বিগত ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে করা হয়, পার্থক্য ঘোচাতে করা হয়।
বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৮(৪) অনুসারে ইতিবাচক বৈষম্য একটি অধিকার। এটি একটি বিশেষ পদক্ষেপ যা অধিকতর সমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেয়া হয় ওইসব জনগোষ্ঠীর জন্য, যারা দীর্ঘ বৈষম্য ভোগ করেছে, যেন এখন তারা সমাজের অন্যদের মতো সব ক্ষেত্রে সমান প্রবেশাধিকার পায় (মানবাধিকার কমিশন, অস্ট্রেলিয়া)। এটি শুধু নারী নয়, বরং যেকোনো পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীর জন্য প্রযোজ্য, যেমন সংখ্যালঘু, আদিবাসী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, বৃদ্ধ, শিশু ইত্যাদি। মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রে (১৯৪৮) এ নীতির কথা বলা আছে এবং প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ১৯৬১ সালে প্রথম এ শব্দটি ব্যবহার করেন। এটির উৎপত্তি এ বিবেচনা থেকে যে শত শত বছরের কাঠামোগত বৈষম্য ও ঐতিহাসিক নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের এখন কেবল সমানাধিকার দিয়ে রক্ষা করা যাবে না। যারা দুর্বল, তাদের সমান পুষ্টি দিলে তারা স্বাস্থ্যবান হবে বটে, কিন্তু যখন তারা স্বাস্থ্যবান হচ্ছে, তখন আগে থেকে স্বাস্থ্যবান যারা তারা আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে। ফলে বিদ্যমান যে ফাঁক, যে শক্তির পার্থক্য, তা থেকেই যাচ্ছে। কাজেই আমাদের ইতিবাচক বৈষম্য জানতে ও বুঝতে হবে।
অর্পিতা শামস মিজান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও ‘আইনের ক্যানভাসে জীবন সমাজ ও সংস্কৃতি’ বইয়ের লেখক










