জীববৈচিত্র্যের অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো বন্যপ্রাণী। বাংলাদেশে যত প্রজাতির বন্যপ্রাণীর বাস, তত প্রজাতি বিশ্বের অন্য কোনো দেশে নেই বললে কথাটি অতিরঞ্জিত হবে বলে মনে হয় না। এর কারণ ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য। সবুজে ঘেরা, ছায়া সুনিবিড় পরিবেশে বন্যপ্রাণী বিচরণ করে এ দেশে। তবে বর্তমানে আশঙ্কাজনকভাবে তাদের সংখ্যা ক্রমেই কমছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বন উজাড়সহ মানুষের নানা অবিবেচিত কর্মকাণ্ডে সৃষ্টি হয়েছে বন্যপ্রাণীর বাসস্থান ও খাদ্য সংকট। ফলে দিন দিন বন্যপ্রাণীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) ২০০০ সালের এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে বিলুপ্ত বন্যপ্রাণীর প্রজাতির সংখ্যা ছিল ১৩। পরবর্তী সময়ে ২০১৫ সালে তাদের গবেষণায় দেখা যায়, দেশে বর্তমানে বিলুপ্ত প্রাণীর প্রজাতির সংখ্যা ৩১। এছাড়া আইইউসিএনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশের ৩৯০টি বন্যপ্রাণী কোনো না কোনোভাবে বিপদাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। এ প্রজাতিগুলোকে আইইউসিএন লাল তালিকাভুক্ত করেছে। 

দেশের বন অধিদপ্তর বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কাজ করে থাকে। ১৯৭৩ সালের বন্যপ্রাণী আইন সংশোধন করে ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন-২০১২’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ আইনের আওতায় বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটও গঠন করা হয়। যেভাবে বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হচ্ছে, এতে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে বন অধিদপ্তরের গৃহীত প্রকল্পগুলো ও আইনের প্রয়োগ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। যেকোনো কাজে সফলতা অর্জনের ক্ষেত্রে জনসম্পৃক্ততা খুব গুরুত্বপূর্ণ। জনগণ যদি সহযোগী না হয় তাহলে কেবল আইন প্রণয়ন করে কিংবা প্রয়োগ করে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ করা যাবে না। এক্ষেত্রে বন অধিদপ্তর ও মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিষয়ে।

২০২০ সালে বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘পৃথিবীর অস্তিত্বের জন্য প্রাণিকুল বাঁচাই’। এ প্রতিপাদ্য জানান দেয় বন্যপ্রাণীর প্রয়োজনীয়তা। বন্যপ্রাণী ছাড়া বাস্তুতন্ত্র হুমকির সম্মুখীন হবে। বনভূমি টিকিয়ে রাখা মুশকিল হয়ে পড়বে। অথচ বন ও বন্যপ্রাণী উভয়ই দেশের অর্থনীতির জন্য প্রযোজনীয় সম্পদ। বন ও বন্যপ্রাণী একে অন্যের পরিপূরক। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ করতে হলে প্রথমে বনভূমি সংরক্ষণে মনোযোগী হতে হবে এবং কীভাবে নতুন বনায়ন সম্ভব তা নিয়ে পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশে ২০১৪ সালে বনভূমির পরিমাণ ছিল ১২ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ দশমিক ১ শতাংশে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় বিশ্বের সব দেশকে বনভূমির পরিমাণ ৩০ শতাংশ করার লক্ষ্য বেঁধে দেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে সরকার ২০৩০ সাল নাগাদ দেশে বনভূমির পরিমাণ ১৬ শতাংশ করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সুতরাং পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হলে আশা করা যায় বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল বাড়বে। তবে এখানেও মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। ব্যক্তিগত উদ্যোগের মাধ্যমেও বনায়ন তৈরি করে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল বাড়ানো সম্ভব। বিভিন্ন দেশে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে উঠছে বনভূমি। দেশে এ ধরনের চর্চাকে উৎসাহ দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তবে কেবল বনায়ন করলেই হবে না, বন পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নয়তো তা বন্যপ্রাণীর বাস উপযোগী হবে না। 

বনায়ন এবং এর পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ করতেও মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ মানুষের অসচেতন কর্মকাণ্ডের ফলে যেসব বনভূমি আছে, সেগুলো আজ প্রায় ধ্বংসের মুখে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় সুন্দরবনের কথা। সুন্দরবন অঞ্চলের নদী দখলদারত্ব ও ভরাটের ফলে সুন্দরবন বর্তমানে হুমকির সম্মুখীন। অতিরিক্ত বনজ সম্পদ আহরণ এর পেছনে দায়ী। বন ক্ষতিগ্রস্ত হলে স্বাভাবিকভাবেই বন্যপ্রাণীর জীবন সংকটে পড়ে। একদিকে আবাসন সংকট বাড়ে, অন্যদিকে দেখা দেয় খাদ্য সংকট। প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা না থাকলে লোকালয়ের মানুষ বনে ঢুকে প্রাণী শিকার করে, এমনকি পাচার করে থাকে। আবার অনেক সময় বন্যপ্রাণী লোকালয়ে প্রবেশ করলে মানুষ হতাহত হয় কিংবা মানুষকে বাঁচাতে প্রাণ হারাতে হয় ওই প্রাণীকে। এ দুটির কোনোটিই আসলে কাম্য নয়।

বন্যপ্রাণী নিধনের ক্ষেত্রে আইনের কঠোরতা আরোপ করে তা বাস্তবায়ন করা জরুরি। বন্যপ্রাণী বিলুপ্তির ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে গণসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সাধারণ মানুষ সচেতন হলে বন্যপ্রাণী রক্ষা করার কাজটি সহজ হতে পারে। তাই মানুষের সচেতনতা বাড়াতে হবে। সম্প্রতি দেশে বন অধিদপ্তরের উদ্যোগে ‘স্মার্ট তারুণ্য বাঁচাবে অরণ্য’ স্লোগানে প্রথমবারের মতো ওয়াইল্ডলাইফ অলিম্পিয়াড আয়োজন করা হয়েছে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে এ কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বাড়াতে সহায়ক হবে বলে আশা করা যায়। সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি অসাধু বন্যপ্রাণী ব্যবসায়ীদের ঠেকাতে হবে। বন্যপ্রাণীর পাচার রোধে বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটকে সক্রিয় হতে হবে। 

বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট কেবল বন্যপ্রাণীর পাচার রোধে কাজ করে, এমন নয়। এই ইউনিটের কাজের পরিসর সুবিস্তৃত। এটি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন প্রয়োগে কাজ করে। এছাড়া সারা দেশে হটস্পট চিহ্নিত করে নিয়মিত টহল, বন্যপ্রাণীর বাণিজ্য রোধে হাটবাজার ও পাখিসমৃদ্ধ হাওর এলাকায় নিয়মিত টহল দেয়। পাশাপাশি বন্যপ্রাণী থেকে নমুনা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, পাচারের সময় আটক বন্যপ্রাণীর দেহাবশেষ থেকে প্রজাতি শনাক্তকরণও করে থাকে। অপরাধের মূল তথ্য উদঘাটন ও অপরাধীকে শনাক্তকরণের কাজও করে থাকে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে এই ইউনিট বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই ইউনিট যেন ঠিকভাবে কাজ করতে পারে সেজন্য পর্যাপ্ত লোকবল ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জামের সরবরাহ সর্বদা নিশ্চিত করতে হবে।

বন্যপ্রাণী বাঁচাতে হলে তাদের আবাসন সংকট দূর করতে হবে এবং খাদ্যের জোগান বাড়াতে হবে। এটি কেবল সরকারি উদ্যোগে সম্ভবপর হবে না। এক্ষেত্রে বন অধিদপ্তর ও জনগণের সহযোগী হয়ে কাজ করা জরুরি। উভয়ে তৎপর হলে বিলুপ্তির পথে থাকা বন্যপ্রাণীদের রক্ষা করা যাবে বলে আশা করা যায়।