বাংলাদেশের অর্থনীতির অনেকটা মেরুদণ্ডের মতো ভূমিকা তৈরি পোশাক খাতের। আর তৈরি পোশাক খাতের প্রাণভোমরা তার শ্রমিকরা। কিন্তু গত কয়েক দশকে তৈরি পোশাক আমাদের অর্থনীতির ভিত গড়ে দিলেও তার কারিগরদের আহামরি কোনো পরিবর্তন আসেনি। তারা যে মজুরি পান তা দিয়ে নিজেদের জীবনযাপন ব্যয় মিটিয়ে পরিবারের দেখাশোনা কঠিন। এর মধ্যে দেড় বছর ধরে মূল্যস্ফীতি বেলাগাম। নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তেরও এখন বেহাল দশা। এমন পরিস্থিতিতে তৈরি পোশাক খাতে যে ন্যূনতম মজুরি দেয়া হচ্ছে তাতে অধিকাংশ কর্মীর জীবন কঠিনতর হয়ে পড়েছে। অনেকেই শহর ছেড়ে গ্রামে পাড়ি দিচ্ছেন।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, শীর্ষস্থানীয় রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম মজুরি পান বাংলাদেশের শ্রমিকরা। আর সবচেয়ে বেশি মজুরি চীনে। দেশটিতে একজন শ্রমিকের ন্যূনতম বেতন ৩০৩ ডলার ৫৯ সেন্ট। ইন্দোনেশিয়ায় ন্যূনতম মজুরি ২৪২ ডলার ৯৪ সেন্ট। কম্বোডিয়ায় এর পরিমাণ ২০০ ডলার। আর প্রতিবেশী ভারতে এ খাতে একজন শ্রমিকের সর্বনিম্ন বেতন ১৭১ ডলার ১৮ সেন্ট। বাংলাদেশে একজন শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ৭২ ডলার ৪২ সেন্ট। রাজধানীতে গতকাল সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক সংলাপে উঠে এসেছে এমন তথ্য।
‘গার্মেন্টস খাতে ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ: পর্যবেক্ষণ ও প্রস্তাবনা’ শীর্ষক এ সংলাপের আয়োজন করে সিপিডি ও বেসরকারি সংস্থা ক্রিশ্চিয়ান এইড। সংলাপে পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১৭ হাজার ৫৬৮ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে সিপিডি। মূল্যস্ফীতি ও শ্রমিকের আর্থিক নিরাপত্তা বিবেচনায় এ প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি। সিপিডি বলছে, ৭৬টি কারখানার ২২৮ জন শ্রমিকের ওপর গবেষণা করে মজুরি বাড়ানোর এ প্রস্তাব দিয়েছে তারা। ক্রেতারা যদি প্রতি পিস পণ্য মাত্র ৭ সেন্ট (প্রায় ৮ টাকা) বেশিতে নেয় তাহলে এ মজুরি দিতে কোনো চাপ তৈরি হবে না। আগামী নভেম্বরে পোশাক শ্রমিকদের নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণার কথা রয়েছে। তবে ঘোষণার পর সেটি কার্যকর হচ্ছে কিনা সেটি অন্তত তিন মাস পর্যবেক্ষণের তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি। কেননা ২০১৮ সালে ঘোষিত মজুরি কাঠামো এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। উল্লেখ্য, বর্তমানে ৮ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি পান তৈরি পোশাক শ্রমিকরা। এটি ২৪ হাজার টাকা করার দাবি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আন্দোলন করে যাচ্ছে শ্রমিক সংগঠনগুলো।
উল্লেখ্য, তৈরি পোশাক খাতের বেশির ভাগ শ্রমিকই নারী। তাদের হাতে অর্থ সমাগম হলে তারা পরিবারের পেছনে ব্যয় করেন, সন্তানের শিক্ষা-দীক্ষায় ব্যয় করেন। কোনো নারী স্বাবলম্বী হলে পুরো পরিবারেই তার প্রভাব পড়ে। নব্বই দশকের পর থেকেই তৈরি পোশাকের ওপর ভর করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে শুরু করেন নারীরা। এখন দেশের শিল্প, কৃষি ও সেবাসহ সব খাতের কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তবে এক দশক ধরে নারীদের জন্য সংকুচিত হচ্ছে শহরের কর্মসংস্থান, যার প্রভাবে শহরকেন্দ্রিক কর্মে নারীর অংশগ্রহণ কমেছে। বিপরীতে এ সময়ে গ্রামে বেড়েছে তাদের কর্মসংস্থান। এছাড়া অনেকে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন অভিবাসী হিসেবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপে নারীর শহরকেন্দ্রিক কর্মসংস্থান হ্রাস ও গ্রামাঞ্চলে বৃদ্ধি পাওয়ার পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শহরে শিল্পায়নের প্রসার, কর্মক্ষেত্রের পরিসর বৃদ্ধি এবং নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও জীবনযাত্রার ধারাবাহিক ব্যয় বৃদ্ধি, কভিডের প্রভাব ও মূল্যস্ফীতির কারণে নারীরা শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ৭ কোটি ৩৪ লাখ শ্রমশক্তি রয়েছেন। এর মধ্যে ৪ কোটি ৭৪ লাখ পুরুষ ও ২ কোটি ৫৯ লাখ নারী। ২০১৩ সালে গ্রামীণ এলাকায় নারী শ্রমশক্তি ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ, যা ২০২২ সালে ২ কোটি ৯ লাখে দাঁড়ায়। সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র দেখা যায় শহর এলাকায়। ২০১৩ সালে ৪৫ লাখ নারী শ্রমশক্তি শহর এলাকায় কাজ করলেও ২০২২ সালে তা ৪০ লাখে দাঁড়ায়। শতাংশের হিসাবে এক দশকে গ্রামে ১৭ দশমিক ১৯ শতাংশ নারী শ্রমশক্তি বেড়েছে। অন্যদিকে শহরে এক দশকে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ শ্রমশক্তি কমেছে। গার্মেন্টস ও উৎপাদন শিল্পে নারীর অংশগ্রহণ কমায় শহর এলাকায় নারী শ্রমশক্তি কমে যাওয়ার পেছনে বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, শহরে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে, সে অনুযায়ী বেতন বাড়েনি, যে কারণে তরুণীরা এখানে আর আগ্রহ পাচ্ছেন না। এছাড়া কভিডের পর দেশের অর্থনীতি সেভাবে ঘুরে দাঁড়ায়নি। অন্যদিকে বছর দেড়েক ধরে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী।
মনে রাখতে হবে, অধিক জনসংখ্যা, সস্তা শ্রম ও রফতানিমুখী ব্যবসার প্রতি রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য—এ তিনে মিলে তৈরি পোশাকের বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ। তৈরি পোশাক রফতানিতে আমরা বিশ্বে দ্বিতীয়। বিশ্ববাজারের ৬ শতাংশের মতো তৈরি পোশাকের জোগান দিয়ে থাকে বাংলাদেশ। এর বিনিময়ে আসে বাংলাদেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ বৈদেশিক আয়। দেশের জিডিপিতে খাতটির অবদান প্রায় ১২ শতাংশ। এ খাতে বিভিন্ন পর্যায়ে ৪০ লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ করছেন। প্রতিটি পরিবারে যদি পাঁচজন করে সদস্য থাকে, তাহলে শুধু গার্মেন্ট কারখানাগুলোর ওপর দেশের প্রায় ১০ শতাংশ মানুষের অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা রয়েছে। এছাড়া ব্যাকওয়ার্ড ও ফরোয়ার্ড লিংকেজগুলোয় জড়িত প্রতিষ্ঠানেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ কাজ করে। সুতরাং একক খাত হিসেবে এটা শুধু কিছু মানুষের ব্যবসা নয়, শুধু টাকার অংকে এটি বড় খাত নয়, অংশগ্রহণকারী মানুষের সংখ্যায়ও এটি বড় খাত।
শ্রমিকদের আয় শুধু তিনি যেখানে থাকেন সেখানেই নয় গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ব্যয় হয়। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি গতিশীল রাখার ক্ষেত্রে এ নিম্ন আয়ের মানুষগুলোর অবদান অনেক। হিসাব করলে দেখা যাবে, নিম্নবিত্তরাই তাদের আয়ের একটা বড় অংশ গ্রামে পাঠান। মধ্যবিত্তরা বা উচ্চবিত্তরা তাদের আয়ের শতাংশের হিসাবে খুব কম অংশই গ্রামে পাঠিয়ে থাকেন।
তৈরি পোশাক খাতে কর্মরত আছেন ৪০ লাখেরও বেশি কর্মী। তাদের ভালো থাকার ওপর নির্ভর করে আমাদের রফতানিমুখী প্রধান খাতটি। বর্তমানে যে বেতন কাঠামো তাতে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন। শ্রমিকরা যদি অস্বস্তিতে থাকেন তাহলে স্বস্তিতে থাকবে কি স্বর্ণ ডিম্ব দেয়া খাতটি? স্থিতিশীল তৈরি পোশাক খাত এবং স্থিতিশীল শ্রমবাজার তৈরিতে এ খাতের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি সময়ের দাবি।










