সামাজিক নিরাপত্তা হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থা, যা বিভিন্ন কর্মসূচি এবং আইনগত উদ্যোগের মাধ্যমে সমাজের মানুষের মধ্যে পরস্পর সহাবস্থান এবং সম্পৃক্তির একটি সুষম পরিবেশ তৈরি করে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক ও সামাজিক-অর্থনৈতিক দুর্যোগের ফলে মানুষের মধ্যে সংঘটিত অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থা মোকাবেলা, বিভিন্ন আইনি সহায়তা এবং অসুস্থতা, বয়স্ক, শারীরিক অসুবিধা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, শিল্পদুর্ঘটনা ইত্যাদির ক্ষেত্রেও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনীয় সহায়তা করা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে যাদের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা পাওয়ার কথা তাদের অনেকেই সেটা পাচ্ছেন না। আবার যাদের উপকারভোগী হওয়ার কথা নয় তাদের অনেকেই সরকারের দেয়া বিভিন্ন ভাতা পাচ্ছেন। এ কারণে শুধু বিধবা ও বয়স্ক ভাতা খাতে বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে বলে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক সমীক্ষার প্রাথমিক ফলাফলে এ তথ্য উঠে এসেছে। সিপিডির হিসাব অনুযায়ী, এ অপচয় বন্ধ করা গেলে প্রকৃত বিধবা ও বয়স্ক আরো ২৫ লাখ মানুষকে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা দেয়া সম্ভব হবে। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি ও বরাদ্দ বেড়েছে, এটি আশার কথা। বলা হয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কারণে দেশে দারিদ্র্য কমছে। কিন্তু দরিদ্র নয় এমন লোক যদি ভাতা পায় তাহলে টেকসইভাবে দারিদ্র্য কমানোর কাজ কঠিন হয়ে পড়বে। অযোগ্যরা সামাজিক কর্মসূচির সুবিধা পেলে সেটা দারিদ্র্য হ্রাসে কমই প্রভাব ফেলতে পারবে। এক্ষেত্রে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। 

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির প্রধান সমস্যা হলো, এটি যাদের জন্য করা তারা পান না। আবার বিতরণ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি ও অপচয় হয়। বয়স্ক ও বিধবা ভাতার কার্ডের নানা অসংগতির কথাও জানা গেছে। বয়স্ক ভাতার কার্ড পেতে গড়ে ২ হাজার ৬৫৩ টাকা ঘুস দিতে হচ্ছে উপকারভোগীদের। ঘুসের বিনিময়ে কার্ড দেয়ার অভিযোগ অতীতে গণমাধ্যমেও প্রকাশ হয়েছে। বছর কয়েক আগে জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলের (এনএসএসএস) মধ্যবর্তী উন্নয়ন পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির তালিকাভুক্ত ভাতাভোগীদের ৪৬ শতাংশ ভাতা পাওয়ার যোগ্য নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, সেই প্রতিবেদনের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হলে এখনো অযোগ্যরা সরকারি ভাতা পান কী করে সেটা বোধগম্য নয়। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে উপকারভোগীদের তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়াটিই স্বচ্ছ নয়। এসব কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি আছে। তালিকাভুক্তির জন্য যেসব শর্ত দেয়া হয় তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এসব কারণে অনিয়ম-দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো উপকারভোগী নির্বাচন। উপকারভোগী নির্বাচনের দায়িত্বে থাকেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা। তারা ভোট, ভোটারের চিন্তা, আত্মীয়তার সম্পর্ক ইত্যাদি মাথায় রেখে তালিকা তৈরি করেন। এতে অনেক ক্ষেত্রে উপযুক্ত ব্যক্তিরা তালিকাভুক্তি থেকে বাদ পড়েন, যার ফলে তারা কর্মসূচির সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। সরকারি সমীক্ষার বরাত দিয়ে বেশকিছু দিন আগে একটি দৈনিকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সুবিধাভোগী নির্বাচনে অনিয়মের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, বয়স্ক ভাতার শর্ত পূরণ করে না এমন ভাতাভোগীর সংখ্যা ৫৯ শতাংশ; বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলা ভাতার ভূমিহীন শর্ত পূরণ করে না এমন ভাতাভোগীর সংখ্যা ২৩ শতাংশ; গরিব না হয়েও ত্রাণ পায় এমন সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৫৬ শতাংশ; ভিজিডির ক্ষেত্রে ভূমিহীন বা সামান্য জমির অধিকারী হওয়ার শর্ত পূরণ করে না এমন উপকারভোগীর সংখ্যা ৪৭ শতাংশ। দুর্নীতির কারণে সামাজিক সুরক্ষামূলক কর্মকাণ্ডে বরাদ্দকৃত অর্থের অপচয় হয়। ভিজিডি, ভিজিএফ, টিআর ইত্যাদি কর্মসূচিতে দুর্নীতির খবর প্রায়ই সংবাদপত্রে প্রকাশ হয়। এসব দুর্নীতি অব্যাহত থাকার কারণে সুবিধাভোগীরা তাদের জন্য নির্ধারিত অর্থের পুরোটা পান না। এতে জীবনধারণের ন্যূনতম উপকরণাদি সংগ্রহ করতে না পেরে উপকারভোগীরা অনেক সময় খাদ্যনিরাপত্তার হুমকির সম্মুখীন হন, যা দারিদ্র্য হার হ্রাসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম উন্নয়নের জন্য একটি প্রকল্প নিয়েছে সরকার। পুরো বিষয়টিকে সরকার একটি ডিজিটাল ফর্মে নিয়ে আসতে চাইছে। আর তা হলো এমআইএস। এমআইএস করলে কিছুটা ভালো হবে। তবে এটিও মনে রাখতে হবে যে এমআইএস কিন্তু সব সমস্যা সমাধান করে দেবে না। তার জন্য আমাদের সুনির্দিষ্ট কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এখন সরকার বিবিএসের মাধ্যমে জাতীয় খানা তথ্যভিত্তি (ন্যাশনাল হাউজহোল্ড ডাটাবেজ) তৈরি করছে। এটি শেষ করতে আরো সময় লাগবে বলেই মনে হচ্ছে। ইউরোপে হওয়া একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দেশে প্রশাসনিক ব্যয় পর্যাপ্ত সেখানে সামাজিক সুরক্ষার প্রভাব অনেক বেশি প্রশাসনিক ব্যয় অপর্যাপ্ত থাকা দেশগুলোর তুলনায়। তারা সামাজিক সুরক্ষার প্রশাসনিক ব্যয়ে গড়ে ১ শতাংশ মতো খরচ করে। কিন্তু কিছু দেশ আছে যারা ১ শতাংশের বেশি করে। যেমন ডেনমার্ক, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস। তাদের সামাজিক নিরাপত্তার প্রভাব অনেক বেশি। রোমানিয়া, স্লোভাকিয়া; যারা শূন্য দশমিক ২-৩ শতাংশ খরচ করছে প্রশাসনিক ব্যয়ে। সংস্কার যখন করব তখন এসব বিষয় আমাদের আনতে হবে। বাংলাদেশে এখন সামাজিক নিরাপত্তা খাতের অর্থ অপচয় হচ্ছে। এটি বন্ধ করতে হলে সুবিধাভোগী নির্বাচনে স্বচ্ছ হতে হবে। 

দেশে করোনা মহামারীর সময়ে দারিদ্র্য হার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে। এ কর্মসূচির সুফল পেতে এবং দারিদ্র্য হার হ্রাসে এর অবদান বৃদ্ধিতে যা দরকার তা হলো কর্মসূচিতে এমনভাবে ভাতাভোগীর সংখ্যা ও অর্থ বরাদ্দ নির্ধারণ করা, যাতে একসময় ভাতাভোগীদের শ্রেণীগত অবস্থার পরিবর্তন ঘটে এবং গরিবদের কাতার থেকে তাদের উত্তরণ ঘটে। দারিদ্র্য হ্রাসে এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। উপকারভোগী বাছাইয়ে দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতি বন্ধ করা, যাতে প্রকৃত গরিব/অতিগরিব ব্যক্তিরাই এ কর্মসূচিতে সুবিধাভোগী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। পাশাপাশি একাধিক মন্ত্রণালয়ের অধীনে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন হওয়ায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করতে হবে। 

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সরকার শহর ও গ্রামের দরিদ্র ও অতিদরিদ্র মানুষের স্বাভাবিক জীবনধারা সমুন্নত রাখার চেষ্টা করে। উদ্দেশ্যটি যে মহৎ, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নাম ভাঙিয়ে তাদের জন্য বরাদ্দ করা টাকায় অন্যদের ভাগ বসানোর বিষয়টি মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। প্রান্তিক মানুষের জন্য সরকার যেসব কর্মসূচি নেয়, তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হতে হবে। সব ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। জনপ্রতিনিধি ও দলীয় লোকজনের পরিবর্তে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দিয়ে ভাতাভোগীর তালিকা করা হলে অনিয়ম-দুর্নীতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব হতে পারে। বিষয়টি ভেবে দেখা যেতে পারে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল ২৫ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচ থেকে ওপরে তুলে আনা। যাদের কারণে কর্মসূচি সফল হচ্ছে না, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। প্রতি বছর সুবিধাভোগীদের তালিকা হালনাগাদ করা জরুরি। সচ্ছল ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে দুস্থদেরই তালিকাভুক্ত করতে হবে। যারা সরকারের এ মহৎ উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে—সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।