বায়ুদূষণের ফলে ঢাকা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। এ দূষণের মাত্রা ক্রমেই বাড়ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণে কাটা হচ্ছে একের পর এক গাছ। শহরে কমছে সবুজ, কিন্তু বাড়ছে না পাল্লা দিয়ে বৃক্ষরোপণ। যানবাহন ও কল-কারখানার ধোঁয়ায় মানুষ বুকভরে নিশ্বাস নিতে পারে না যান্ত্রিক এ শহরে। ধূলিবালির কবলে পড়ে সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ রকম অস্বস্তিকর পরিবেশে এক টুকরো স্বস্তির পরশ বুলিয়ে দিতে পারত বটবৃক্ষ। ছায়াঘেরা পরিবেশে ক্লান্ত পথিকের মন যেমন জুড়াত, তেমনি শহরজুড়ে বাড়ত অক্সিজেনের প্রবাহ। কিন্তু অন্যান্য গাছের মতো বটবৃক্ষও নিধন হচ্ছে। এমনকি ঢাকায় বটগাছের পরিসংখ্যানও কারো কাছে নেই।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, ঢাকা পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর একটি, যার বড় সমস্যা বায়ুদূষণ। বর্ষা ছাড়া বছরের প্রায় দিনই ঢাকার অবস্থান দূষিত শহরের শীর্ষে থাকে। এর মধ্যেই শ্বাস-প্রশ্বাস টেনে জীবন কাটাচ্ছে মেগাসিটির মানুষ। তবে এ বায়ু পরিশোধনের সহজ সমাধান হতে পারে মহীরুহ বট। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বড় ও ঘন পাতার সাহায্যে বটগাছ বাতাসে ভেসে বেড়ানো ভারী ধাতু সহজেই ধরে রাখতে পারে। দূষণ পরিশোধনেও বেশ পটু। যদিও বেড়ে ওঠা অপরিকল্পিত নগরী ঢাকার বুক থেকে এখন বাংলার এ আদিবৃক্ষটি হারাতে বসেছে।
বটগাছ অনেকখানি জায়গাজুড়ে জমির সমান্তরালে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে। খুব অল্প বয়স থেকেই বটগাছের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা থেকে ঝুরি নামতে শুরু করে। মাটির সমান্তরালে বাড়তে থাকা ডালপালার ঝুরিগুলো একসময় মাটিতে গেঁথে গিয়ে নিজেরাই একেকটা কাণ্ডে পরিণত হয়। এভাবেই বটগাছ ধীরে ধীরে চারপাশে বাড়তে থাকে এবং একসময় মহীরুহে পরিণত হয়। উপযুক্ত পরিবেশে একটি বটগাছ পাঁচশ-ছয়শ বছর বেঁচে থাকতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক ঢাকার ক্রমবর্ধমান বায়ুদূষণে উদ্ভিদের টিকে থাকার ওপর একটি গবেষণা করেন। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা গেছে, ঢাকার দূষণের ধরনের আলোকে আম ও বট সবচেয়ে বেশি দূষণ সহনীয় বৃক্ষ। এছাড়া দূষিত পরিবেশে সহনশীলতার ক্ষেত্রে শহুরে বন উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত উদ্ভিদ বটগাছ। এ গাছ বেশ কয়েকটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বায়ু পরিশোধন করতে পারে। বটগাছ বৃহদাকৃতির হওয়ায় এ গাছের পাতা অনেক বেশি ধূলিকণা শোষণ করে এবং পত্ররন্ধ্র ব্যবহার করে গ্যাসীয় দূষণ শোষণ করে নেয়। সর্বোপরি ঘন ও বড় পাতার কারণে বটবৃক্ষ বেশি দূষণ সহনীয়।
বায়ুদূষণ শোষণের ক্ষেত্রে অন্য গাছগুলো থেকে বট বেশি কার্যকর বলে গবেষণায় প্রমাণ হয়েছে। তবে বায়ুদূষণে বটবৃক্ষ কার্যকর ভূমিকা রাখলেও প্রয়োজনের তুলনায় মেগাসিটি ঢাকায় তা খুবই অপ্রতুল। গাছটির কোনো পরিসংখ্যান না থাকার অভিযোগও রয়েছে। বন অধিদপ্তর, ন্যাশনাল হারবেরিয়াম, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও পরিবেশ অধিদপ্তরও বটগাছের সংখ্যার বিষয়ে অবগত নয়। এ নিয়ে কোনো কাজ হয়েছে কিনা সে বিষয়েও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানেন না। এভাবেই অবহেলার শিকার হচ্ছে দূষিত বায়ু পরিশোধনে কার্যকর বটবৃক্ষ। বেসরকারি সংস্থাগুলোও ঢাকায় বটগাছের সঠিক পরিসংখ্যান জানে না। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের একজন অধ্যাপক ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ৭৩টির মতো বটগাছ পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। এ বটগাছ ঢাকায় প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। এছাড়া বিভিন্ন পার্ক ও নদীর ধারেও এখন সেভাবে বটবৃক্ষ চোখে পড়ে না। এ গাছ বায়ুদূষণ প্রতিরোধের পাশাপাশি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষজ্ঞরা বায়ুদূষণে ঢাকার শীর্ষ অবস্থান বদলাতে পরিকল্পিত বটগাছ রোপণে গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এটি নগরীর বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে।
বটের ফল ছোট ও গোলাকার, পাকলে লাল হয়। এ ফল কাক, শালিক ও বাদুড়ের প্রিয় খাদ্য। পাখি ফল খেয়ে বীজ ছড়িয়ে দেয়। পাখিবাহিত এ বীজ দালানের কার্নিশ, পুরনো দালানের ফাটল ও অন্য কোনো গাছের কোটরে সহজেই অঙ্কুরিত হয়। এ গাছ শকুন ও এ-জাতীয় পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল। বটের আঠা থেকে রাবার তৈরি হয় এবং ছালের আঁশ দড়ি ও অন্যান্য কাজে ব্যবহার্য। এর পাতা কুষ্ঠরোগে উপকারী। এছাড়া বটগাছ যে কেবল বায়ুদূষণ প্রতিরোধ করে তা-ই নয়, এটা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বটগাছ থাকলে নানা ধরনের পাখি ও প্রাণী আসে, বাসা বাঁধে। তবে গাছের দূষণ প্রতিরোধের বিষয়টি এলাকাভেদে ভিন্ন হতে পারে বলে পরিবেশবিদদের ধারণা। এক্ষেত্রে দেখা যেতে পারে ঢাকায় বটগাছ বেশি দূষণ সহনীয়, কিন্তু রাজশাহীতে ভিন্ন ফল পাওয়া গেছে।
এ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা আরো বিস্তারিত গবেষণা হওয়ার প্রতি জোর দিচ্ছেন। তবে যেহেতু ঢাকায় উপকারিতা পাওয়ার প্রমাণ মিলেছে, সে হিসেবে এখন ঢাকায় বটগাছ রক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য ঢাকায় পর্যাপ্ত বটগাছ রোপণের বিষয়ে নগর কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সবার মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে নগর কর্তৃপক্ষ বটগাছ রোপণের বিষয়ে যে ভূমিকার কথা জানিয়েছে, তাতে আমরা আশাবাদী হতে চাই। এজন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের অংশগ্রহণমূলক ভূমিকাও জরুরি। সবার সম্মিলিত প্রয়াসে ঢাকা শহরের বটগাছগুলো রক্ষা পাবে, এটিই আমাদের প্রত্যাশা।










