পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোয় আপনি যদি কারো সঙ্গে তর্কে জড়াতে চান, তাহলে এটা জিজ্ঞাসা করলেই চলবে, কোন দেশ সেরা জোলোফ বানায়। জোলোফ হলো পশ্চিম আফ্রিকার একটি চালের খাবার। চাল, টমেটো, পেঁয়াজ, মসলা, শাকসবজি ও মাংস দিয়ে একটি পাত্রে তৈরি করা হয়, যদিও এর উপাদান এবং প্রস্তুতির পদ্ধতি বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবর্তিত হয়। পশ্চিম আফ্রিকাজুড়ে জনপ্রিয় এ খাবারের উদ্ভাবক হিসেবে সেনেগালিজদের পক্ষে জোরালো যুক্তি থাকলেও নাইজেরীয়, ঘানাবাসী ও অন্য দেশগুলোর দাবি, তাদের জোলোফ সবচেয়ে সুস্বাদু। এক ব্যাপারে অবশ্য কোনো বিসংবাদ নেই; জোলোফ তৈরির প্রধান উপকরণ চাল পশ্চিম আফ্রিকার কৃষকরা উৎপাদন করেন না। মূলত ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম থেকে আসে এর চালান। 

তিন হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে আফ্রিকায় ধান চাষ হচ্ছে। বর্তমানে অঞ্চলটির ৪০ দেশে সাড়ে তিন কোটিরও বেশি কৃষক এ ফসল উৎপাদনে জড়িত। ভুট্টার পর ধান হচ্ছে আফ্রিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্য। তার ওপর আফ্রিকার মোট চালের ৪০ শতাংশেরও বেশি আসে এশিয়ার ধান উৎপাদক দেশগুলো থেকে। বলা যায়, অঞ্চল হিসেবে এশিয়ার সবচেয়ে বড় ধান রফতানি বাজার আফ্রিকা। সেনেগালের নদী উপত্যকা ধানের জন্য বিশ্বের প্রাচীনতম একটি উৎস হওয়া সত্ত্বেও দেশটির নগর কেন্দ্রগুলোয় ভারতীয় চাল আমদানি ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছেন দেশটির কৃষকরা।

এ পরিস্থিতি সৃষ্টি আফ্রিকার খাদ্যে স্বনির্ভরতা হ্রাসের উপসর্গ। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ ও সম্প্রসারমাণ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কারণে খাদ্য চাহিদা বেড়েছে। ছোটখাটো কৃষক ও কৃষিকাজ অঞ্চলটির মোট কর্মসংস্থানের অর্ধেকেরও বেশি প্রতিনিধিত্ব করলেও স্থানীয় বাজারে ধীরে ধীরে অপাঙ্‌ক্তেয় হয়ে পড়েছেন আফ্রিকার কৃষকরা। ১৯৯৩-৯৫ সালে আফ্রিকার খাদ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ৭৯০ কোটি ডলার। ২০১৮-২০ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৩৬০ কোটি ডলার। 

পৃথিবীর আর কোনো অঞ্চল এমন তীব্র খাদ্য নিরাপত্তা সংকটে নেই। প্রতি পাঁচজন আফ্রিকানের একজন খাবারের অভাবে আছে। ক্ষুধায় আক্রান্ত ২৬ কোটি মানুষের বেশির ভাগই গ্রামাঞ্চলে বসবাস করে। ২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘ যে ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গড়ার লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছিল তা ২০১৪-তে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। গত বছর রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের পর সরবরাহ চেইন সংকটের কারণে তা আরো জটিল পরিস্থিতির সামনে পড়েছে। খাদ্য আমদানি ব্যয় বাড়ার কারণে অঞ্চলটিতে মূল্যস্ফীতির লাগামহীন ঘোড়া ছুটছে। উল্লেখ্য, অঞ্চলটির মোট ভোগ ব্যয়ের ৪০ শতাংশই খাদ্য। মূল্যস্ফীতির কড়াল ঘাতে লাখ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যসীমায় ঠেলে দিয়েছে।

কভিড-১৯ মহামারী আফ্রিকাকে বুঝিয়ে দিয়েছে ভ্যাকসিনে বৃহত্তর স্বনির্ভরতা কতটা জরুরি। তেমনি খাদ্য আমদানিতে নির্ভরতা যে ঝুঁকিপূর্ণ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ তা স্পষ্ট করে দিয়েছে। এ নাজুক পরিস্থিতিতে পড়ার প্রধান কারণ হলো ব্যর্থ উন্নয়ন মডেল। কয়েক প্রজন্ম ধরে রাজনৈতিক নেতারা খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা নিয়ে কেবল কথার তুবড়ি ফুটিয়েছেন। তথাকথিত ‘‌সাশ্রয়ী আমদানির’ নাম করে বিদেশী খাদ্যপণ্যের জন্য দেশের সীমান্ত একেবারে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। শিল্পায়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ বিবেচনা করে তাতে আবার বড় আকারের ভর্তুকিও দিয়েছেন। ছোট ছোট কৃষকদের নিয়মতান্ত্রিক অবহেলার দুষ্টচক্রের কারণে শহুরে-গ্রামীণ বিভাজন তৈরি হয়েছে। এতে আরো দারিদ্র্যে পড়েছেন কৃষকরা। বিপরীতে শহুরেদের নির্ভর করে ফেলা হয়েছে অস্থিতিশীল বিশ্ববাজারের ওপর। 

সবার জন্য স্বাস্থ্যকর, সহজলভ্য খাবার তুলে দিতে স্বনির্ভর খাদ্য ব্যবস্থা তৈরিতে কেবল কৃষিতে রূপান্তর জরুরি। বর্তমানে অঞ্চলটিতে যে হারে খাদ্যশস্যের ফলন হচ্ছে তা ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে কিংবা গ্রামীণ জনপদের জীবিকা নির্বাহে যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশে প্রতি হেক্টর কৃষিজমিতে পাঁচ টন ধান উৎপাদন হয়, যা নাইজেরিয়ার ফলনের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। একইভাবে পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধান খাদ্যশস্য ভুট্টার উৎপাদন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গড় উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক। স্পষ্টত, গত ২০ বছরে আফ্রিকা ও এশিয়ার খাদ্যশস্য উৎপাদনের ফারাক বেড়েছে। 

জলবায়ু পরিবর্তন এ সংকট আরো বাড়িয়ে তুলেছে। আমরা এখন দীর্ঘমেয়াদি ও তীব্র খরার মুখোমুখি হচ্ছি। বৃষ্টি, বন্যার কোনো পূর্বাভাস দেয়া যাচ্ছে না। কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট কীটপতঙ্গ মোকাবেলায়ও সাফল্য দেখাতে পারছি না। ২০১৯ সালে মরু পঙ্গপালের হামলায় পূর্ব আফ্রিকার শস্যের ফলন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বৃষ্টিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থা আফ্রিকার ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জের প্রতিবেদনে বলা হয়, এতে ভুট্টা, জোয়ার (সোরগাম) ও বাজরা (মিলেট) উৎপাদন ১০-৩০ শতাংশ কমেছে। জলবায়ু হুমকি মোকাবেলা ও উৎপাদন ফারাক কমিয়ে আনতে আফ্রিকার যেসব নীতি ও প্রযুক্তির সহায়তা নেয়া উচিত তা অজানা নয়। বিশ্বের বৃহত্তম কৃষি গবেষণা সংস্থা সিজিআইএআর এরই মধ্যে আফ্রিকার জন্য উচ্চফলনশীল, জলবায়ু সহনশীল ও কীট প্রতিরোধী বীজ তৈরিতে সক্ষম হয়েছে। ২০ লাখেরও বেশি ছোট কৃষক এরই মধ্যে খরারোধী ভুট্টা চাষ করছেন। এতে তাদের ফলন ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। 

দি আফ্রিকান রাইস সেন্টার ৮০টির মতো নতুন জাতের ধান উদ্ভাবন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে দ্রুত ফলনশীল ধান যাতে রয়েছে উচ্চহারের প্রোটিন। স্বাভাবিক ধান ফলনের মৌসুমের আগে যে খাদ্যাভাবের সৃষ্টি হয় তা মোকাবেলায় সফল হতে পারে এ জাতের ধান। এর ফলন হার প্রায় এশিয়ার সমান। দেখা গেছে, কৃষকরা, যার বড় অংশ নারী, এ জাতের ধান চাষ করে আয় দ্বিগুণ বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন। সেনেগালে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ধান আমদানীকৃত ধানের সঙ্গে টেক্কা দিচ্ছে। এতে নতুন ভ্যালু চেইন ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হচ্ছে। জোলোফ তৈরিতে আমদানীকৃত ধান ও চালের নির্ভরতা কমছে সেনেগালি নাগরিকদের।

কিন্তু নতুন বীজ প্রযুক্তি তখনই সফলতার মুখ দেখবে যখন তা একটি সমন্বিত উদ্যোগের অংশ হবে। কৃষকদের চাই সহজলভ্য মূলধন, সার, সেচ ও জ্বালানির মতো বিভিন্ন উৎপাদনমুখী অবকাঠামো। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আফ্রিকার কৃষকরা বিশেষ করে নারীরা এসব সেবাপ্রাপ্তিতে অনেক পিছিয়ে আছেন। ২০০৩ সালে নেয়া আফ্রিকান ইউনিয়নের কমপ্রিহেনসিভ আফ্রিকা এগ্রিকালচার ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম একটি কর্মপরিকল্পনা হাজির করলেও তা কার্যকরের রেকর্ড হতাশাজনক।

খাদ্যে স্বনির্ভরতা ও সামাজিক সুরক্ষার মধ্যকার ফারাক কমানোর মাধ্যমেই সবার জন্য ইতিবাচক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। স্কুল মিলস কোয়ালিশন বলছে, স্কুলপড়ুয়া আফ্রিকার লাখো শিশু ক্ষুধার জন্য শিক্ষা নিতে পারছে না। স্থানীয় উৎপাদকদের কাছ থেকে সংগৃহীত খাদ্য যেমন অপুষ্টি দূর করবে, তেমনি শিখনের হার বাড়াবে এবং কৃষকদের জন্য তা স্থিতিশীল বাজার সৃষ্টি করবে। এছাড়া এ খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ আকৃষ্ট করবে, যা কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বাড়াবে। ২০৩০ সালের মধ্যে স্কুলে সবার জন্য আহার নিশ্চিতের অঙ্গীকার করে কেনিয়ার সরকার এক্ষেত্রে একটি বেঞ্চমার্ক স্থাপন করেছে। 

চলতি বছরের শুরুতে সেনেগালের ডাকারে এক খাদ্য সম্মেলনে আফ্রিকান নেতারা অঙ্গীকার করেন, খাদ্য সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারে তারা আরো স্বনির্ভর, দৃঢ় ও সমতাপূর্ণ খাদ্য ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করবেন। আফ্রিকার কৃষকরা অবশ্য এ ধরনের প্রতিশ্রুতি আগেও নিয়মিত শুনেছেন। এখন আমরা আশা করতে পারি, এবারকার অঙ্গীকার বাস্তব রূপ পাবে। 

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]


কেভিন ওয়াটকিনস: সেভ দ্য চিলড্রেন ইউকের সাবেক সিইও। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের ফিরোজ লালজি ইনস্টিটিউট ফর আফ্রিকার ভিজিটিং প্রফেসর

ভাষান্তর: সাবিদিন ইব্রাহিম