রেল খাতের উন্নয়নে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে দেশেই রেল কোচ তৈরি হলে তা অনন্য সংযোজন হিসেবে গণ্য হতো। কিন্তু ঋণ চুক্তির আট বছর অতিক্রম হলেও এ-সংক্রান্ত প্রকল্প এখনো আলোর মুখ দেখেনি। উপরন্তু প্রকল্পের ঋণ পরিশোধের সময়ও কমে আসছে। ফলে আমদানির চেয়ে সাশ্রয়ী মূল্যে দেশেই কোচ তৈরির সম্ভাবনাময় এ উদ্যোগ ভেস্তে যেতে বসেছে।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, রেল খাতে ২০১১ সালে আলাদা মন্ত্রণালয় গঠনের পর থেকে বরাদ্দ বাড়তে শুরু করেছে। চলতি অর্থবছর রেলে বরাদ্দের পরিমাণ ১৪ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা। পাঁচ বছর ধরে প্রায় একই হারে বরাদ্দ পেয়ে আসছে খাতটি। এসব টাকায় কেনা হয়েছে নতুন ইঞ্জিন-কোচ। বসানো হয়েছে নতুন লাইন। সম্প্রসারিত এসব রেললাইনে নতুন কোচ চালুকরণে আমদানির চেয়ে দেশেই সাশ্রয়ী মূল্যে কোচ তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয় ২০১৫ সালে। কিন্তু সম্ভাবনাময় এ উদ্যোগ এখন পর্যন্ত সমীক্ষার মধ্যেই আটকে আছে। এক্ষেত্রে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকেই দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ায় প্রকল্পের ঋণ পরিশোধের সময়ও কমে এসেছে, ফলে এটি নিয়ে শঙ্কায় পড়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)।

আমাদের দেশে সরকারি প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রতা মোটেও নতুন কিছু নয়। আমরা অতীতেও বিভিন্ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে এমনটি দেখেছি। বস্তুত এটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালনে উদাসীনতার পরিচায়ক। এতে একদিকে যেমন সময় ক্ষেপণ হয়, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ঘটে। যা মোটেও কাম্য নয়। বিশেষ করে রেল খাতে দুর্নীতির অভিযোগ এর আগেও তোলা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, দেশে তৈরির বদলে কোচ আমদানি করলে সরকারি কর্মকর্তারা বিদেশ ভ্রমণে যেতে পারেন। এজন্য আমলারা প্রতিষ্ঠান গড়ার চেয়ে ক্রয় কার্যক্রম বেশি পছন্দ করেন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এক্ষেত্রে দেশে কোচ তৈরি হলে সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়া যেত। এছাড়া আমদানির চেয়ে ৫০-৬০ শতাংশ কম মূল্যেও কোচ কেনার সুযোগ থাকে। বস্তুত কোচের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর থাকলে রেল লোকসানের বৃত্ত থেকে বের হতে পারবে না, এমনটিই মত বিশেষজ্ঞদের। এমনকি কোচ তৈরি কোনো উচ্চ প্রযুক্তির কাজও নয়। দেশে উৎপাদন করা হলে কোচ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। আবার কোচ আমদানির ক্ষেত্রে ভোগান্তিও রয়েছে। দেখা যায় যে কোচ আমদানি করলে চাহিদামতো বৈশিষ্ট্যের মিল থাকে না। পাশাপাশি সময়মতো কোচ না আসায় যাত্রীদের ভোগান্তি হয়, কোচ কবে পাওয়া যাবে সেটি নিয়েও অনিশ্চয়তা থাকে।

২০১৫ সালে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিতীয় লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) ঋণের আওতায় সৈয়দপুরে প্রথমবারের মতো রেল কোচ তৈরির প্রকল্প তালিকাভুক্ত করা হয়। ২ বিলিয়ন ডলারের এ ঋণ চুক্তির আট বছর পরও প্রকল্পটি শুরু করা হয়নি। এমনকি প্রকল্পটির সমীক্ষাও শুরু হয়নি। এজন্য বাংলাদেশ রেলওয়ের দীর্ঘসূত্রতাকে দায়ী মনে করছে পরিকল্পনা কমিশন। অন্যদিকে বর্তমানে প্রকল্পটির ব্যয় দ্বিগুণ ধরা হয়েছে। প্রকল্পটি নিয়ে চলতি জানুয়ারিতে একটি সিদ্ধান্তে আসা হবে বলে জানানো হয়। পরিকল্পনা কমিশনের সূত্র অনুযায়ী, প্রকল্পে বিলম্বের পেছনে রেল কর্মকর্তাদের আগ্রহের ঘাটতির বিষয়টি লক্ষ করা গেছে। কেননা অন্য প্রকল্পের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে পরিকল্পনা কমিশনে যোগাযোগ করা হলেও এ প্রকল্পে তেমনটি হয়নি। এদিকে তিনটি প্রকল্পের মাধ্যমে ৪ হাজার ৪৩০ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫৭০টি কোচ সংগ্রহের কাজ করছে রেলওয়ে। আরো ৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০০টি কোচ সংস্কার করা হচ্ছে। কিন্তু দেশেই কোচ তৈরির সক্ষমতা তৈরি হলে অর্ধেক ব্যয়ে কোচ নির্মাণ করা সম্ভব হতো।

রেল খাতে টেকসই উন্নয়ন করতে হলে রেল কোচ আমদানি কমিয়ে আনাই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হবে। এজন্য দেশে দক্ষ লোকবল ও ব্যবস্থাপনাগত আমূল পরিবর্তন জরুরি। যেকোনো প্রকল্পে ব্যক্তিগত লাভের চেয়ে রেলওয়ের স্বার্থকে বড় করে দেখতে হবে। সৈয়দপুরে কোচ তৈরি হলে বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ মিলবে না। মূলত দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধের প্রকাশ ঘটাতে পারলেই এক্ষেত্রে দেশে কোচ তৈরির সিদ্ধান্ত আলোর মুখ দেখবে। নাহলে এ প্রকল্পের ক্ষেত্রেও অব্যবস্থাপনার দিকটি ফুটে উঠবে। 

প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‌সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হলে মূল প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। আমরা তাদের কথায় আশ্বস্ত হতে চাই। তবে এর আগে প্রকল্পটি দীর্ঘ সময়েও না হওয়ার কারণ রেল মন্ত্রণালয় কিংবা পরিকল্পনা কমিশনের ওপর বর্তালে তাতে শুধু কাদা ছোড়াছুড়িই হবে, প্রকল্প আর বাস্তবায়ন হবে না। প্রকল্পটি যেহেতু বাংলাদেশ রেলওয়ের, এজন্য তাদের অবশ্যই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সেই সঙ্গে প্রকল্প যেন সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হতে পারে, সেজন্য পরিকল্পনা কমিশনের উপযুক্ত তদারকিও কাম্য। দেশে তৈরি কোচের মাধ্যমে রেল যোগাযোগে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হোক, আমরা সে প্রত্যাশাই করছি।