ড. কে এম আজম চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান এবং ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ওশান গভর্ন্যান্সের পরিচালক। এর আগে তিনি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর লে. কমান্ডার হিসেবে কর্মজীবন অতিবাহিত করে অবসরে গেছেন। দেশের সমুদ্রসীমা জয়, সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, এক্ষেত্রে বাপেক্সকে কাজে লাগানো, তেল-গ্যাস উত্তোলনে বিদেশী কোম্পানির প্রয়োজনীয়তা এবং সমুদ্র নিয়ে গবেষণা প্রসঙ্গে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তৌফিকুল ইসলাম

সমুদ্রসীমা জয়ের পর বাংলাদেশে সমুদ্র নিয়ে অনেক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, এটা সে সময়ও বলা হয়েছিল, এখনো বলা হচ্ছে। এ সম্ভাবনাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

সমুদ্র জয়ের ইতিহাস মূলত শুরু হয় ১৯৭৪-এর ‘টেরিটোরিয়াল ওয়াটারস অ্যান্ড মেরিটাইম জোন’ অ্যাক্টের মাধ্যমে যেটা বঙ্গবন্ধু তখন করে গিয়েছিলেন। সেটি তার দূরদর্শিতা ছিল। জাতিসংঘ সমুদ্র আইন কনভেনশন আনক্লজ পাস হয় ১৯৮২ সালে। তার আগেই যে অ্যাক্টটা হয়েছে, সেটার সূত্র ধরে আমরা এগোচ্ছিলাম। আমাদের পার্শ্ববর্তী দুটো দেশ মিয়ানমার একপাশে, ভারত একপাশে। এ দুটো দেশের সঙ্গেই আমাদের সীমানা নির্ধারণের বিষয়টি আসে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিভিন্ন কারণে এটি হতে বিলম্ব হয়। অনেক দীর্ঘ পরিক্রমার পর প্রথমে ২০১২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে এরপর ভারতের সঙ্গে ২০১৪ সালে সীমানা নির্দিষ্ট হয়। সমুদ্র থেকে যদি চিন্তা করি তাহলে ‘ভি’ শেপ, এটা ধীরে ধীরে উপকূলের দিকে সংযুক্ত হচ্ছে। এই যে এরিয়া, এটাকে বলা হয় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার। বলা যায়, আমাদের ভূমির সমপরিমাণ এরিয়ার সার্বভৌম অধিকার আমরা পেয়েছি। সমুদ্রসীমা জয়ের পরই মূলত বাংলাদেশে সমুদ্র নিয়ে গবেষণা, পড়াশোনা শুরু হয়। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১২ সালে সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন থেকেই আমরা মাস্টার্স শুরু করি এবং দ্রুত অনার্স শুরু হয়। বর্তমানে অনার্স, মাস্টার্স দুটো শ্রেণীতেই শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করছে। এ প্রক্রিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভূমিকা রাখছে। বর্তমান সরকার মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিট চালু করেছে। এ প্রক্রিয়ায় যারা সমুদ্রবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করেন, তারা এ অংশটা এগিয়ে নিতে চান। সরকারও এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে চায়। 

এটি অত্যন্ত খুশির বিষয় যে ২০২১ থেকে ২০৩০ সালকে ইউএন ডিকেড অব ওশান সায়েন্স ঘোষণা করা হয়েছে। তার মানে এ যুগটাই চলছে সমুদ্রবিজ্ঞানের। এর অর্থ দাঁড়ায়, সমুদ্রের গুরুত্ব শুধু আমরা বলছি না, জাতিসংঘ থেকে বলছে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকেও বলা হচ্ছে। অবশ্যই এটি সম্ভাবনার জায়গা, এই যে বলা হয় ব্লু ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতি সেটার সুযোগ অবশ্যই এখানে আছে। বেশকিছু দেশ যারা সমুদ্র অর্থনীতিকে কাজে লাগাচ্ছে এবং সেটাকে কাজে লাগিয়ে জিডিপিতে ভালো অবদান রাখছে। সে ধরনের অনেক দেশ আছে। উদাহরণ হিসেবে জাপান, চীন, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ ছাড়াও ইউরোপের নরওয়ের কথা বলা যায়। তারা সমুদ্রকে কাজে লাগাতে সক্ষম হচ্ছে। 

এরপর জ্বালানির বিষয়টি আসে, যেটার সংকটে আমরা এখনো আছি। জ্বালানিকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অনবায়নযোগ্য জ্বালানি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি বলতে যা বোঝায়, যে জ্বালানি শেষ হবে না। মানে সেটা নবায়ন হতে থাকবে। উদাহরণ হিসেবে সূর্যের কথা আসে, যতদিন পৃথিবী আছে সূর্য তাপ দিয়ে যাবে এবং সেখান থেকে সৌরশক্তি তৈরি করা যাবে। এছাড়া বায়ু ও সমুদ্রের ঢেউ থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করা যাবে। সমুদ্র যতদিন থাকবে, ততদিন সমুদ্র থেকে তরঙ্গ আসবে। আরো নতুন একটি ধারণা যেটি পৃথিবীতে খুব আলোচনা হচ্ছে, বাংলাদেশে এখনো সেটি খুব বেশি আলোচনায় আসেনি। আমরা একটা টিম চেষ্টা করছি, সমুদ্রের পানিতে যে কেমিক্যাল রয়েছে, লবণসহ বিভিন্ন রকমের সলিড আছে। এটার ধরন থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করার সুযোগ আছে। কিছু কিছু দেশ স্বল্প পরিমাণে এটি করছে। আমরা এ ধরনের একটি প্রক্রিয়ায় চেষ্টা করছি। রিমোট এরিয়া অর্থাৎ উপকূলীয় জনগণের জন্য এটি একটি সম্ভাবনা। সেখানে এ প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো যাবে। এই যে নবায়নযোগ্য শক্তিগুলো, পৃথিবীতে এখন যে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কথা হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনকে যদি মোকাবেলা করতে হয় তাহলে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে যেতেই হবে। ইউরোপের অনেক দেশ নবায়নযোগ্য শক্তির ওপর নির্ভর করছে। তারা সেটি চর্চাও করে। অন্যান্য দেশও এটি করছে, তারা নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে এগোচ্ছে। নবায়নযোগ্য শক্তি বড় একটি সুযোগ। যেটিতে আমাদের যেতে হবে, যদিও আমরা বায়ু নিয়ে চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমাদের এখানে যেহেতু জায়গাটা এমন যে বছরে দুয়েকবার বড় ঘূর্ণিঝড় হয়। তখন উইন্ড টারবাইনে অনেক দামি জিনিস দিলাম, কিন্তু সেটা পড়ে গেল। আবার সেটি টেকসইভাবে দেয়ার উপায় আছে। আরেকটা জিনিস হচ্ছে উইন্ডটা সারা বছর থাকে না। সেটা আসলে কতটুকু সম্ভব, তা নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। তবে যদি তিন মাত্রায় চিন্তা করা যায়, সোলার থাকবে, উইন্ড থাকবে, ওয়েভ থাকবে। যে সিজনে যেটা থাকবে, সেটা দিয়ে টারবাইন ঘুরবে এবং বিদ্যুৎ তৈরি হবে। এটি একটি বড় স্কোপ, যা এখনো বাংলাদেশে করা হয়নি। যেটা দ্রুত করা উচিত। আর অনবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে তেল, গ্যাস, কয়লা এসব জিনিস বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাপেক্স, পেট্রোবাংলার সক্ষমতা ভূমিতে খুব ভালো, তারা ভূমিতে অনেক আবিষ্কার করছে এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো বেশি শক্তিশালী করা উচিত। আমাদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে হলে অবশ্যই দেশের প্রতিষ্ঠানকে যদি শক্তিশালী না করি, সব সময় যদি বিদেশী প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হই তাহলে আমরা সব সময় নির্ভরশীলই থেকে যাব। এজন্য দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আরো শক্তিশালী করতে হবে। অনেক বছর হয়ে গেছে, সমুদ্রে গিয়ে সেখান থেকে আবিষ্কার করার ক্ষমতা আমরা এখনো বৃদ্ধি করতে পারিনি। এ বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করব দেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা যেন বাড়ানো হয়। বাংলাদেশের মাটি অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি যে সম্ভাবনা রয়েছে সেটি হলো গ্যাসের। কারণ তেল হওয়ার জন্য মাটির একটা বয়স লাগে। আমাদের মাটির সিস্টেম অনুযায়ী গ্যাসের সম্ভাবনাটা সবচেয়ে বেশি, তেলেরও সম্ভাবনা রয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত কিন্তু উৎস পেয়েছে, মিয়ানমারও কিছু উত্তোলন করছে। যেহেতু তারা উত্তোলন করছে, এক্ষেত্রে আমি মনে করি আমাদেরও সে স্কোপ আছে। সরকার এবং বেশকিছু বিদেশী প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ দেয়া হয়েছে, যেমন ২৬টি ব্লক আছে। গভীর সমুদ্রে ব্লক আছে, এর মধ্যে ১১টি শ্যালো সমুদ্র ব্লক আছে। এ ব্লকগুলোয় এখন পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের বিদেশী প্রতিষ্ঠান এসেছে। তারা বিড করে নিয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল তারা বিভিন্ন কারণে ওখান থেকে কোনো ফল আনতে পারেনি এবং নিজেরাই চলে গেছে। এটা বিভিন্ন সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে তারা নিজেদের মতো মনে করে। আমি মনে করি এটাতে জোর দেয়া উচিত। এবং গভীর সমুদ্রবন্দরে এক্সপ্লোরেশনটা অবশ্যই করা উচিত। যাতে আমাদের যে চাহিদা সেখানে যদি কিছুটা হলেও ব্লক করতে পারি। যেমন কুতুবদিয়ায় সাঙ্গু গ্যাসফিল্ড যেটা সেটাতে আমরা করেছি, কিন্তু সেখানে ফুরিয়ে গেছে। বেশি বছর আমরা তা অব্যাহত রাখতে পারিনি। সে ধরনের আরেকটা সোর্স যদি আমরা করতে পারি, বেশকিছু বছর আমাদের এখানে যে চাহিদা সেটা পূরণ করতে পারতাম। সুতরাং আমি মনে করি যে আমাদের নিজের দেশেই সিসমিক ক্যাপাসিটি আছে এ ধরনের একটা জাহাজ থাকা উচিত। দেশী ও বিদেশী কোম্পানির সহায়তা নিয়ে গভীর সমুদ্রে যাওয়া উচিত। অনেক বছর চলে গেছে, আর কোনো সময় নেই।

বাপেক্সের কথা বললেন, সক্ষমতার প্রশ্নে বাপেক্সের পাশাপাশি বিদেশী কোম্পানির অংশগ্রহণে অনেকে আপত্তি জানায়। সেক্ষেত্রে আপনার মন্তব্য কী?

অবশ্যই দেশী প্রতিষ্ঠানকে সক্ষম করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই, কারণ বিদেশী কোম্পানিকে যদি আনা হয়, তাহলে তাদের সঙ্গে যে শেয়ারের চুক্তিটা হয়, সেখানে দেখা যায় যে প্রফিটটা তাদের অনেক বেশি দিতে হয়। সুতরাং এ প্রফিটটাকে যদি আমার নিজের দেশের জন্য রাখতে চাই, যদি নিজের প্রতিষ্ঠান হয় তাহলে ১০০তে ১০০ দেশেই ব্যবহার করতে পারছি। বিদেশী কোম্পানি দিয়ে আনলে আমার অনেক প্রফিট বিদেশীদের দিয়ে দিতে হতো। সুতরাং, এটাই হলো বাধার কারণ। যেহেতু আমাদের সক্ষমতা গভীর সমুদ্রে সেভাবে হয়নি। সেক্ষেত্রে অবশ্যই একটা কো-অপারেশনে যেতে হবে। পাশাপাশি অবশ্যই বাপেক্সকে এখানে রাখতে হবে। কারণ যদি তাদের ইনভলভ না করি, তাহলে তারা শিখতে পারবে না। পরবর্তী ধাপে দেখা যাবে যে বিদেশীদের ওপরই নির্ভরশীল হচ্ছি। আমি মনে করি, সক্ষমতার কারণেই বিদেশীদের এখানে রাখতে হবে, কিছু করার নেই। কিন্তু চুক্তিটা যদি সেভাবে সুন্দরমতো করা যায় এবং দেশী প্রতিষ্ঠানকে সেখানে যৌথভাবে রেখে তাদেরও ট্রেইনআপে সেভাবে রাখতে পারি, সেটাই দেশের জন্য মঙ্গল হবে। 

বিদেশী কোম্পানিকে কাজ দেয়ার ক্ষেত্রে নিরাপত্তার প্রশ্নটি কি থেকে যায়?  

হ্যাঁ, অবশ্যই নিরাপত্তার প্রশ্ন তো আছেই। প্রতিটি দেশের জন্যই সিসমিক সার্ভে খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেকগুলো ব্লক আছে, সে হিসেবে নিরাপত্তার বিষয় তো থাকবেই। যেমন বাংলাদেশ নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড রয়েছে, সমুদ্রে আমাদের সাবমেরিন রয়েছে। সেগুলোর অপারেশন খুব গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং, সমুদ্রের তথ্য যদি নিজেদের হাতে থাকে এটা দেশের জন্য ভালো। সেখানে তো বিদেশী কোম্পানির উপস্থিতিতে ঝুঁকি থাকবেই। কিন্তু আমরা রিসোর্সের যে সংকটে পড়ছি, সেটাও তো আমাদের বাধা। আমাদের সেক্ষেত্রে এখন আর বসে থাকারও সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে অবশ্যই নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বসে এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক যারা আছেন বা দেখেন, সে প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বলে কোন ব্লকটায় বিড দেয়া উচিত, সেভাবে বিবেচনা করে আমাদের এক্সপ্লোরে যেতে হবে। এছাড়া আর কোনো পথ নেই, বিদেশীদের সহায়তা নেয়া ছাড়া এখন আর কোনো উপায় নেই। অন্যথায়, আমাদের বিদ্যুতের যে সংকট সেভাবে মোকাবেলা করতে পারব না। কয়লাভিত্তিক যে বিদ্যুৎ কেন্দ্র হচ্ছে, যদিও বলা হচ্ছে একটা মাত্রা পর্যন্ত পরিবেশবান্ধব করে করা হচ্ছে। নিশ্চয়ই সে ফিজিবিলিটি আছে, তার পরও বিষয়টি বিশ্বে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে, এক্ষেত্রে এগুলো থেকে একসময় বেরিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে নিজেদের জিনিসগুলো আমাদের এক্সপ্লোর করা উচিত। কয়লা কেনা নিয়ে অনেক সংকট হচ্ছে, যেহেতু নিজেদের কয়লা আমরা নিতে পারছি না, অন্যদের থেকে নিচ্ছি, সেটারও মূল্য বেড়ে গেছে। সে কারণে পুরো জিনিসটা একটা ঝুঁকির মুখে রয়েছে। জ্বালানি একটি দেশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ, এক্ষেত্রে নিজেদের কোম্পানিগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে। বিনিয়োগ করতে হবে, তাদের প্রশিক্ষিত করতে হবে, পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যেতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কোনো বাধা নেই। বিশ্বের যে বার্তা, জলবায়ুবান্ধব সবকিছু করতে হবে। সেক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে আমাদের নজর দিতে হবে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের গবেষণা নিয়ে বলুন...

এখানে অনার্স চতুর্থ বর্ষ ও মাস্টার্সের শিক্ষার্থীদের থিসিস করানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে ফান্ড দেয়া হয় তাতে ছোটখাটো কিছু প্রকল্প নেয়ার সুযোগ থাকে। আমরা এসব প্রকল্পের মাধ্যমে সাগরের ডায়নামিকস দেখি, মৌলিক যে বিজ্ঞানগুলো, কীভাবে সাগর জলবায়ুকে পরিবর্তন করছে সে গবেষণা আমরা করি। সে ধরনের প্রকাশনা আমাদের আছে। সাগরের দূষণ নিয়ে আমরা গবেষণা করি। মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ কীভাবে হচ্ছে, সম্প্রতি আমাদের একটি গবেষণায় উঠে এসেছে সুন্দরবনের সে অঞ্চলগুলোয় যেখানে ইন্ডাস্ট্রি কিছুটা কম সেখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি মাছের অন্ত্রের মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি আছে। তার মানে সামুদ্রিক মাছ স্বাস্থ্যের জন্য ভালো সেটি বলা হচ্ছে, কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি সেখানেও অনেক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। সুন্দরবনের যে জায়গায় ইন্ডাস্ট্রি কম, সে জায়গায়ই এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে, আর যেখানে ইন্ডাস্ট্রি বেশি সেখানে কী হচ্ছে! তার মানে দূষণ একটি বড় ফ্যাক্টর, সেটি নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, আরো গবেষণা হওয়া উচিত। মেরিন স্পেশাল প্ল্যানিং নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, সমুদ্রে ব্লু ইকোনমির আরো যে খাত আছে, কোথায় কোন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা উচিত সেগুলো নিয়ে আমরা গবেষণা করছি। সে গবেষণাগুলো ধীরে ধীরে প্রকাশ হবে। এছাড়া সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনা নিয়ে তো প্রচুর পড়াশোনা হচ্ছে। মৌলিক বিজ্ঞানের আলোকে বিভিন্ন জায়গায় বেজলাইন স্টাডি করা হচ্ছে। কারণ বেজলাইন স্টাডি ছাড়া অ্যাপ্লিকেশনগুলো করা যায় না। তারপর সি-উইডের কিছু কাজ আমাদের শিক্ষার্থীরা প্রসপেক্ট নিয়ে করছে, কোথায় কী, কেমন প্রসপেক্ট সেটা নিয়ে কী কী পণ্য আমরা নিতে পারি সে ধরনের স্টাডিও হচ্ছে। রিমোট সেন্সিং নিয়ে স্টাডি হচ্ছে, মানে স্যাটেলাইট ব্যবহার করে কীভাবে রিমোটলি স্টাডি করা যায়। এক্ষেত্রে আমি বলব বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট টু আসছে। অনেক দেশেরই এমন নিজস্ব স্যাটেলাইট আছে, যেটা বাংলাদেশেও থাকা উচিত। সে ধরনের কিছু সেন্সর যদি দেয়া যায়, তাহলে স্থানীয় পর্যায়ের স্টাডিগুলো যেমন ফিশিং জোন চিহ্নিত করা। সেটা করার জন্য যে হাই রেজলিউশন ইমেজ দরকার সেটা আমরা গ্লোবাল যে স্যাটেলাইট সেখান থেকে আমরা নিচ্ছি। কিন্তু এটা থেকে যদি স্থানীয় কিছু সেন্সর দেয়া যায়, তাহলে সে স্টাডিগুলো করতে সুবিধা হয়। আমরা ওশান হেলথ, ব্লু ইকোনমি, ক্লাইমেট নিয়ে স্টাডি করছি। বাংলাদেশে ওশান মডেলিং ফিল্ড আছে, যেটা ফিজিক্যাল ওশানোগ্রাফি, সেটাতে আমরা ভালো ফোকাস করছি। সমুদ্র অধ্যয়নের জন্য কিছু ভালো মডেল ব্যবহারের চেষ্টা করছি। যেটা দিয়ে সমুদ্রভিত্তিক স্টেটগুলোর ভবিষ্যৎ বলা যাবে। উদাহরণ হিসেবে আমরা যেমন বলতে পারি সাইক্লোন সাতদিন পর কোথায় যাবে? পাঁচদিন পর কোথায় যাবে। এই যে ভবিষ্যৎ বলা, সাগর লাগোয়া স্টেটগুলোর ভবিষ্যতে কী হতে যাচ্ছে? কোন ফেনোমেনা কোথায় ঘটতে যাচ্ছে। সেটা আসলে জানা দরকার এবং বড় বড় সমুদ্রভিত্তিক উন্নত দেশ ভারত, চীন, ফ্রান্স, ইউরোপের দেশগুলোয় ও যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের ফোরকাস্টিং সিস্টেম চালু করেছে। তারা ওশান মডেলিং প্রতিষ্ঠিত করেছে। আমরাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে এ ধরনের পরিকল্পনার মধ্যে রেখেছি ‘ওশান ফোরকাস্টিং’ করা যায় কিনা। এটা সম্ভব, ইনশাআল্লাহ। সে গবেষণা এগিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমিত সামর্থ্যের ক্ষেত্রে যদি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষণার কথা বলা হয়, তাহলে সরকারের কী ভূমিকা থাকতে পারে?

এটির বিষয়ে আমি বলব আমরা যখন বিদেশে গিয়েছি। সেখানে যেটা দেখেছি কোনো রাষ্ট্র প্রধানত যখন ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যায়, তখন যেটা হয় কোস্টাল এলাকায় এবং সমুদ্রভিত্তিক যে কর্মকাণ্ড সেগুলোয় দেখা যায় উন্নয়নমূলক কাজ করার সময় সেম ফিল্ডের লোকজনকে কনসালট্যান্ট হিসেবে রাখে। এটা যদি যথাযথভাবে করা হয়, তাহলে দেখা যাবে যে ফিজিবিলিটি স্টাডি করতে হয়। তখন সে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে গবেষণাও হয়ে যায়। সে অনুযায়ী যদি সম্ভাব্যতা যাচাই করা যায়, তাহলে দেখা যাচ্ছে সমুদ্রের সব উন্নতির কাজগুলো ভূমিতে হয়, সেজন্য ভূমির গবেষণা হচ্ছে। সমুদ্রের সে রকম উন্নয়নের প্রকল্প নেই, এজন্য সেখানে অত বেশি হচ্ছে না। সেগুলোয় একটা ফান্ডে কাজ হচ্ছে, সে উন্নয়নমূলক কাজের সঙ্গেই গবেষণার যে ফান্ড থাকে, সেখান থেকে গবেষণার সুযোগ থাকে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমি মনে করি, সমুদ্রবিজ্ঞানের যারা গবেষক, তাদের যদি এসব ফিল্ডে রাখা যায়, তাহলে সেখানে গবেষণার সুযোগ হবে। এক্ষেত্রে আলাদা ফান্ড দরকার হচ্ছে না। সে প্রজেক্টগুলোর কাজ করার আগে সেগুলোর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রেই গবেষণা চলে আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ে বা ইউজিসিতে যে ফান্ডগুলো থাকে, তাতে সমুদ্রে গিয়ে গবেষণা করার ক্ষেত্রে যাওয়া-আসাতেই শেষ হয়ে যায়। একটা যন্ত্র কিনতে গেলেও দেখা যায় ভালো যন্ত্রের দাম কমপক্ষে ৫০ লাখ, ১ কোটি টাকা। এ জিনিসগুলো তো ২, ৩ বা ৫ লাখ টাকার গবেষণা ফান্ড দিয়ে সম্ভব না। এজন্য সমুদ্র গবেষণার জন্য সরকারের বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কমপক্ষে ৫, ১০ বা ২০ বছরের জন্য কিছু বিশেষ ফান্ড দেয়া উচিত। এক্ষেত্রে ২, ৩ লাখ টাকার যে ফান্ড দেয়া হয়, তাতে সমুদ্র গবেষণা খুব কঠিন হয়ে যায়। তাই সরকারের যদি বিশেষ অপশন থাকে, সেখান থেকে যদি যন্ত্র কেনার জন্য বিশেষভাবে এ রকম কিছু বরাদ্দ থাকে, সে যন্ত্র ব্যবহারের জন্য যদি গবেষণা প্রকল্প দেয়া যায়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত মানের গবেষণা সম্ভব। যেমন বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড, তারা কিছু ফান্ড দেয়, সেখানেও আমরা চেষ্টা করছি এবং চেষ্টা করব। তারা ভালো ফান্ড দেয়, সেটি একটি স্কোপ হতে পারে। তবে সমুদ্রের জন্য আলাদা কিছু ফান্ড থাকা উচিত। যেটা দিয়ে প্রকৃতপক্ষে সমুদ্রে গিয়ে গবেষণাটা করা যাবে। এবং আমরা সুবিধাগুলো বের করে নিয়ে আসতে পারব ও চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে পারব।