দেশের ব্যাংক খাতে তারল্য সংকটের তীব্রতা বেড়ে চলেছে। এতে ব্যাংক খাতে এক ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে অভিযুক্ত হচ্ছে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষও আস্থার সংকটে ভুগছে। সম্প্রতি ব্যাংকগুলোর সব মাধ্যমে লেনদেন কমে গেছে বলে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠের মতো ব্যাংকে তারল্য সংকটের বড় একটি কারণ এবার উঠে এসেছে।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, সরকারের কাছে অর্থপ্রাপ্তির তালিকায় দেশের সব ক’টি ব্যাংকেরই নাম রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের বিপরীতে সরকারের কাছে প্রাপ্য প্রণোদনার অর্থ প্রায় ছয় মাসের বকেয়া পড়েছে। ব্যাংকগুলোর সার আমদানির ভর্তুকিও বকেয়া পড়েছে প্রায় দুই বছরের। এছাড়া সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ ও পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের ভর্তুকিও যথাসময়ে পরিশোধ করা হচ্ছে না। দেশের বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে সরকারের কেনা প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ বিলও বকেয়া পড়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) বকেয়া এ বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করলে সে অর্থ ব্যাংকগুলোয় জমা পড়ত। এ অর্থ থেকে ব্যাংকের ঋণের কিস্তি সমন্বয় করা সম্ভব হতো।
এভাবে প্রণোদনা বা ভর্তুকির টাকা ব্যাংকগুলোয় সময়মতো না দেয়া হলে যে সংকটের সৃষ্টি হতে পারে এটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপলব্ধি করা উচিত। অর্থনৈতিক সংকটের সময় ব্যাংকগুলো এমনিতেই নানা চাপ মোকাবেলা করছে। দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে সুখবর নেই। খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। ব্যাংকগুলোয় নগদ প্রবাহ (ক্যাশ ফ্লো) কমে যাচ্ছে। মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে সংকোচ বোধ করছে। মূল্যস্ফীতির ফলে খরচ সংকুলান না করতে পেরে অনেক মানুষ এফডিআর ভেঙে ফেলছে। সর্বোপরি আমাদের দেশে এখনো উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর মতো ব্যাংকভিত্তিক লেনদেন সম্প্রসারিত হয়নি। অনেকেই এখনো ব্যাংকে টাকা না রেখে ঘরে বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে টাকা রাখেন। এদিকে আনুষ্ঠানিক খাতে রেমিট্যান্স আসা কমে গেছে। সব মিলিয়ে ব্যাংকগুলোয় যে সংকট শুরু হয়েছে, এ রকম পরিস্থিতিতে সরকারের যথোপযুক্ত ভূমিকা কাম্য। কারণ ব্যাংক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব অর্থনীতিতে পড়ে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারের বকেয়া বিদ্যুৎ বিল, বিভিন্ন ধরনের ভর্তুকি ও প্রণোদনার অর্থের পরিমাণ অন্তত ৫০ হাজার কোটি টাকা। সরকার এ অর্থ পরিশোধ করলে সেটি দেশের ব্যাংক খাতে তারল্য হিসেবে যুক্ত হতো। এতে বিরাজমান তারল্য সংকট অনেকাংশেই কেটে যেত। বস্তুত সরকারের কাছ থেকে বকেয়া অর্থ না পাওয়ায় দেশের ব্যাংক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে প্রথমবারের মতো দেশে রেমিট্যান্সের বিপরীতে ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা বা নগদ সহায়তা প্রদানের ঘোষণা দেয়া হয়। ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি এ প্রণোদনার হার বাড়িয়ে আড়াই শতাংশে উন্নীত করা হয়। প্রথমদিকে রেমিট্যান্সের প্রণোদনার অর্থ অগ্রিম পরিশোধ করা হতো। কিন্তু চলতি বছরের শুরু থেকে অন্যান্য প্রণোদনা ও ভর্তুকির মতো রেমিট্যান্সের প্রণোদনাও বকেয়া পড়তে শুরু করেছে।
বর্তমানে রেমিট্যান্স ছাড়াও সব ধরনের পণ্য রফতানির বিপরীতে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন হারে প্রণোদনা বা নগদ সহায়তা দেয়া হচ্ছে। এছাড়া সার আমদানির এলসির বিপরীতে সরকারের পক্ষ থেকে ৭০ শতাংশ অর্থ ব্যাংকগুলোকে ভর্তুকি হিসেবে পরিশোধ করা হয়। কভিড-১৯ সৃষ্ট দুর্যোগের সময় সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা প্যাকেজ ও পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ঘোষণা করা হয়। প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট হারে সুদ ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। সরকারের এসব সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু দেশের অন্তত এক ডজন ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের দাবি, সরকার ঘোষিত প্রণোদনা ও ভর্তুকির অর্থ অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বকেয়া ভর্তুকির মেয়াদ দুই বছরে গিয়ে ঠেকেছে। এ অবস্থায় ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনাও চাপের মুখে পড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি কমানোর লক্ষ্য বাস্তবায়নে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রণোদনা ও ভর্তুকির অর্থছাড় কমিয়ে দেয়া হতে পারে। প্রসঙ্গত, লক্ষ্য অনুয়ায়ী রাজস্ব আদায় না হওয়ায় সরকারের অর্থ সংকট বাড়ছে। ব্যয় সংকোচনের মাধ্যমে সরকার এ সংকট উত্তরণের চেষ্টা করছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর পর্যন্ত অর্থবছরের প্রথম চার মাসে রাজস্ব আহরণে ঘাটতির পরিমাণ ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি দাঁড়িয়েছে। ঘাটতি সংস্থানে সরকার দেশী-বিদেশী উৎস থেকে উচ্চ সুদেও ঋণ নিচ্ছে। এরই মধ্যে ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার ১১ শতাংশে উঠে গেছে।
সব মিলিয়ে সরকার চতুর্মুখী সংকটের মধ্যে রয়েছে। এক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থাপনা জরুরি হয়ে পড়েছে। দেশের অর্থনৈতিক খাতে বিশৃঙ্খলা মোটেও কাম্য নয়। এতে অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। যেহেতু ব্যাংকের ওপর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেকাংশেই জড়িত, সে হিসেবে ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে যেসব প্রণোদনা ও ভর্তুকির অর্থ বকেয়া রয়েছে, সেগুলোও সময়মতো পরিশোধ করা প্রয়োজন। ব্যয় সংকোচন নীতির কারণে এক্ষেত্রে সরকার সময় নিতে পারে। কিন্তু এ অর্থ ব্যাংকগুলোকে পরিশোধ করা দরকার। এতে ব্যাংকগুলো উপকৃত হবে। তারল্য সংকটও কমে আসবে। আমরা প্রত্যাশা করব, দেশের ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট দূর করতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। এক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ভূমিকা কাম্য।










