বিদ্যুৎ ক্রয়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দেয়া হচ্ছে—এ অভিযোগ বেশ পুরনো। এমনকি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব দেয়ার প্রসঙ্গে সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। চক্রাকারে অভিযোগ সেই এক বিন্দুতে নিবদ্ধ, গোষ্ঠীতন্ত্রের স্বার্থ দেখতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় করা হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছেন। 

বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, টাকার অবমূল্যায়ন, ডলার সংকট ও জ্বালানির প্রাপ্যতা সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে হিমশিম খেতে হয়েছে সরকারকে। এমন পরিস্থিতিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুতে সরকারের আগ্রহ বাড়ছে। এর ধারাবাহিকতায় গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। গত বুধবারও অনুমোদন পেয়েছে নতুন তিনটি সৌরভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এসব কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনতে ইউনিটপ্রতি খরচ পড়বে ১০ টাকার বেশি। যদিও প্রতিবেশী দেশ ভারতে সৌরবিদ্যুতে ইউনিটপ্রতি ব্যয় এর প্রায় অর্ধেক। জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে এগুলো থেকে বিদ্যুৎ কেনার ব্যয় প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। সৌরবিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণে জীবাশ্ম জ্বালানির মডেলটিকে অনুসরণ করা হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন উত্থাপন করছেন। 

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্যানুসারে, ২০২১-২২ অর্থবছরে সৌরশক্তিভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনায় কিলোওয়াটপ্রতি ১০ টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে সৌরবিদ্যুতের প্রতি কিলোওয়াট উৎপাদনের গড় খরচ ছিল ১৩ থেকে ১৭ টাকার মধ্যে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা ১৩ টাকায় নেমে এসেছে। দেশে বৃহৎ কয়েকটি সৌরবিদ্যুতের প্রকল্প গ্রিডে যুক্ত হওয়ায় উৎপাদন খরচ কমে আসছে। আগামী বছর এ খরচ ইউনিটপ্রতি ৯-১০ টাকায় নেমে আসবে।

অথচ গত এক দশকে প্রতিবেশী দেশ ভারতে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা হয়েছে। ২০১০ সালে ভারতে প্রতি কিলোওয়াট সৌরবিদ্যুতের গড় মূল্য ছিল দশমিক ১৭ সেন্ট। সেখানে ২০২০ সালে কিলোওয়াটপ্রতি নেমে এসেছে দশমিক শূন্য ৩১৫ সেন্টে। ২০২০ সালে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানি সাতলুজ জাল বিদ্যুৎ নিগাম লিমিটেড (এসজেভিএন) ১০০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করে। ৪৫০ কোটি রুপি ব্যয়ে নির্মিত ওই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ হয় প্রতি কিলোওয়াট ২ রুপি ৮০ পয়সা। সর্বশেষ চলতি বছরের জুলাইয়ে ২ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে ভারত সরকার। দরপত্রের ভিত্তিতে করা প্রতি কিলোওয়াট সৌরবিদ্যুতের দাম নির্ধারিত হয় দশমিক শূন্য ৩২ সেন্ট। আন্তঃব্যাংক লেনদেনে বুধবার ডলারের সর্বোচ্চ বিনিময় হার ১১০ টাকা ৫০ পয়সা ধরে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের দাম পড়ে ৩ টাকা ৫৩ পয়সা। দরপত্রে বিজয়ীরা ভারতের যেকোনো জায়গায় এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে পারবে। ইন্ডিয়ান এনার্জি এক্সচেঞ্জের (আইইএক্স) তথ্য অনুযায়ী, বুধবার গ্রিন ডে-অ্যাহেড মার্কেটে প্রতি কিলোওয়াট সৌরবিদ্যুতের ভারিত গড় মূল্য ছিল ৫ দশমিক ৫৯ রুপি। অন্যদিকে গ্রিন টার্ম-অ্যাহেড মার্কেটে প্রতি কিলোওয়াট সৌরবিদ্যুতের ভারিত গড় মূল্য ছিল ৫ দশমিক ৪৪ রুপি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে। ফলে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কম পড়ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে বিশেষ আইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে। যেখানে বিশেষ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিয়ে একটি নির্ধারিত ট্যারিফের অনুমোদন দেয়া হচ্ছে।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের ভাষ্যমতে, বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের ট্যারিফ অনেক বেশি। এর কারণ হচ্ছে দেশে প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে না। ফলে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিয়ে বিদ্যুতের ট্যারিফ ঠিক করা হচ্ছে। এছাড়া বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে চুক্তি স্বাক্ষরের পর দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজনীয়তার ফলে এক ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ঝুঁকি অনুভব করে। এ ঝুঁকিও উচ্চ ট্যারিফের কারণ। অন্যদিকে সৌরবিদ্যুতের বেশির ভাগ যন্ত্রাংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় ট্যারিফের ওপর প্রভাব পড়ে। খরচ কমাতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে অনুমোদনগত জটিলতাও কমিয়ে আনা প্রয়োজন। এজন্য জমি অধিগ্রহণ ও প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বিষয়টি অগ্রাধিকার দিতে হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের সোলার প্রকল্পের বেশির ভাগই নদীর চর ও দুর্গম এলাকায়। গ্রিড লাইনের সঙ্গে এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র যুক্ত করতে গিয়ে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশ ভারত সঞ্চালন লাইনের সঙ্গে নৈকট্য ও বিদ্যুতের উৎপাদন-সরবরাহ ব্যবস্থার কার্যকারিতা বিবেচনায় সোলার প্রকল্প স্থাপনের অনুমোদন দিচ্ছে। এছাড়া সোলার প্যানেল নির্মাণে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের বড় অংশ ভারত নিজেই উৎপাদন করছে। সিলিকনসহ প্যানেলের যন্ত্রাংশ উৎপাদনে সেখানে সরকারি প্রণোদনাও দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশে এ ধরনের সুযোগ এখনো অবারিত নয়। আবার বাংলাদেশের বাজারে এখনো সৌর প্যানেলের যন্ত্রাংশ উৎপাদন করে মুনাফা করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। পাশাপাশি জমি ও সূর্যের তাপের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। আমাদের দেশে জমির স্বল্পতা ও মূল্য অনেক বেশি। এছাড়া প্রতিবেশী দেশের তুলনায় সূর্যের তাপও কম পাওয়া যায়। ইফিশিয়েন্সি বেশি না হলে তখন খরচ বেড়ে যায়। এজন্য খরচ কমিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার। সব মিলিয়ে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার প্রদানের এ সময়ে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।