সড়ক দুর্ঘটনায় নিয়মিত প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে, অথচ এ নিয়ে যেন কারো কোনো বিকার নেই। প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো জায়গায় একাধিক সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নিচ্ছে প্রাণ কিংবা জীবনের তরে পঙ্গু করে দিচ্ছে কাউকে কাউকে। দুর্ঘটনায় হতাহতদের পরিবারকে বয়ে বেড়াতে হয় জীবনভর বোঝা। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি দেশের জিডিপিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) বরাতে বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত জুলাইয়ে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে আহত হয়েছে আরো ৯৩৪ জন। জুলাইয়ে সারা দেশে সব মিলিয়ে ৫৬৬টি সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। দুর্ঘটনায় পতিত মোটরযানের মধ্যে ২০টি প্রাইভেট কার, ১৫৩টি বাস ও মিনিবাস, ৪৫টি পিকআপ, ৫৩টি অটোরিকশা, ১৪৩টি ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান, ১৮৯টি মোটরসাইকেল, ৪১টি ব্যাটারিচালিত রিকশা, ২৪টি ইজিবাইক, ১১টি ট্রাক্টর, পাঁচটি অ্যাম্বুলেন্স, ১৬টি ভ্যান, ২৬টি মাইক্রোবাস ও ১৭টি অন্যান্য যানবাহন রয়েছে। সব মিলিয়ে দুর্ঘটনায় পতিত মোটরযানের সংখ্যা ৮৩৫।
বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে মোট ১২৬টি দুর্ঘটনায় ১১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে আরো ২০৩ জন। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বিভাগে ৯২টি দুর্ঘটনায় ৮২, রাজশাহী বিভাগে ১১১টি দুর্ঘটনায় ১০৪, খুলনা বিভাগে ৬৬টি দুর্ঘটনায় ৬১, বরিশাল বিভাগে ২২টি দুর্ঘটনায় ৩৬, সিলেট বিভাগে ৩০টি দুর্ঘটনায় ২৬, রংপুর বিভাগে ৮০টি দুর্ঘটনায় ৭৩ ও ময়মনসিংহ বিভাগে ৩৯টি দুর্ঘটনায় ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) বলছে, সড়কপথে সংঘটিত বড় দুর্ঘটনার কারণ অতিরিক্ত গতি, ওভারলোড ও বিপজ্জনক ওভারটেক। এছাড়া সড়কে যান নামানোর পূর্বে গাড়ির যন্ত্রাংশগুলো ও ব্রেক চেকিং না করায় এ বছর কিছু দুর্ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে।
গবেষণা বলছে, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, সড়ক ও সেতুর নাজুক অবস্থাও সড়ক দুর্ঘটনার জন্য বহুলাংশে দায়ী। গণপরিবহনে বাড়তি যাত্রী সামাল দিতে গতিসীমার বাইরে দ্রুত গাড়ি চালিয়ে বেশি ট্রিপ দেয়ার অশুভ প্রতিযোগিতা আর বাড়তি মুনাফার লোভে পরিবহন সংস্থাগুলো চালকদের অনেক বেশি সময় কাজ করতে বাধ্য করে। ফলে চালকের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ পড়ে, তাকে বেসামাল হয়ে গাড়ি চালাতে হয়; যা প্রকারান্তরে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। লক্কড়-ঝক্কড়, অচল যানবাহনে রঙ লাগিয়ে যেনতেন মেরামত করে রাস্তায় চলাচল করে বিভিন্ন উৎসব-পার্বণের সময়। পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী বহন, অদক্ষ চালক ও হেলপার দিয়ে যানবাহন চালানো, বিরামহীন যানবাহন চালানো, মহাসড়কে অটোরিকশা, নসিমন-করিমন ও মোটরসাইকেলের অবাধ চলাচল এবং ব্যস্ত সড়কে ওভারটেকিং, ওভারলোডিং তদারক না করা সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়। ত্রুটিপূর্ণ মহাসড়কের কারণেও দুর্ঘটনা ঘটছে।
বিশ্বের প্রথম সারির উন্নত পরিবহন ব্যবস্থার কথা বলতে গেলে সিঙ্গাপুরের নামটি সামনে চলে আসে। সিঙ্গাপুরে পরিবহন ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে ল্যান্ড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি গঠন হয় ১৯৯৫ সালে। এক দশকের ব্যবধানে সংস্থাটি দেশটির পরিবহন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনে। গ্রাহক সন্তুষ্টির দিক থেকে সিঙ্গাপুরের পরিবহন ব্যবস্থা বিশ্বে প্রথম সারিতে। এশিয়ার মধ্যে চীন, জাপান, দুবাই, ইউরোপের সুইডেন, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি প্রভৃতি দেশের পরিবহন ব্যবস্থা বিশ্বে আদর্শ। প্রতিটি দেশই নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। দেশগুলোয় সংশ্লিষ্ট আইনটি অত্যন্ত শক্তিশালী। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, আইন বাস্তবায়নে তাদের প্রশাসন খুবই কঠোর, কোনো ছাড় দেয়া হয় না।
উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি নির্দেশকও বটে। বাংলাদেশ দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে, আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর দৃষ্টিতে সম্ভাবনাময় অর্থনীতির দেশ। সরকারের লক্ষ্য ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হওয়ার। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে শামিল হতে চাওয়া বাংলাদেশের পরিবহন ব্যবস্থা এখনো বিশৃঙ্খলই রয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনের যথাযথ প্রয়োগ জরুরি। সাজা ও জরিমানার পরিমাণ যা-ই নির্ধারণ হোক না কেন, তা বাধাহীনভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ বাস্তবায়ন না হলে আইনে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান থেকে কোনো লাভ হবে না। পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা এলে এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা গেলে দুর্ঘটনার পরিমাণ এমনিতেই কমে আসবে, যেমন কমে এসেছে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায়।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ৯০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী যানবাহনের অতিরিক্ত গতি ও চালকের বেপরোয়া মনোভাব। মহাসড়কে অপরিকল্পিত স্পিডব্রেকার বা গতিরোধকগুলোও দুর্ঘটনার জন্য অনেকাংশে দায়ী। এছাড়া ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, সড়কের পাশে হাটবাজার বসা, চালকদের পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব ইত্যাদি কারণেও দুর্ঘটনা ঘটছে। মহাসড়কে যান চলাচলের সর্বোচ্চ গতি বেঁধে দিয়ে এবং গতি পরিমাপক যন্ত্র ব্যবহার করে চালকদের ওই নির্দিষ্ট গতি মেনে চলতে বাধ্য করা হলে দুর্ঘটনা অনেক কমে আসবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আইনের প্রয়োগ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ চালক এবং সড়কে চলাচল উপযোগী ভালো মানের যানবাহন অবশ্যই প্রয়োজন। তবে একই সঙ্গে জনগণকেও হতে হবে সচেতন।
সড়কে দুর্ঘটনা বাংলাদেশে নিত্যদিনের চিত্র। সড়কে বছরে এত প্রাণ যায় যে যুদ্ধরত অনেক দেশেও এতজনের প্রাণহানি হয় না। বিভিন্ন খাতে আমরা অভূতপূর্ব উন্নয়ন করতে পারলেও স্বাধীনতার পর থেকেই অব্যবস্থাপনা ও সড়কে মৃত্যু যেন আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থার নিত্যসঙ্গী। গত কয়েক বছরে সড়কে প্রাণহানির পরিমাণ আরো বেড়েছে। প্রধান উপার্জনকারীর বিদায়ে অনেক পরিবারকে পথে নামতে হচ্ছে। সড়কে নিয়মতান্ত্রিক বিশৃঙ্খলার ক্ল্যাসিক উদাহরণ এ সড়ক দুর্ঘটনা। চালকের পরিপূর্ণ প্রশিক্ষণ ছিল কিনা, তার লাইসেন্স ছিল কিনা তা দেখা দরকার। সুপারভাইজারের সঙ্গে কথা বলে বলে গাড়ি চালানো, যাত্রীদের সঙ্গে বচসায় জড়ানো, অন্য বাসকে টেক্কা দিতে মহাসড়কে রেস লাগানো—এ যেন বাসযাত্রার নিত্যচিত্র। বাস চালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে সঠিক লোক বাছাইয়ের যথাযথ প্রক্রিয়া আছে কিনা কিংবা থাকলে তা মান্য করা হয় কিনা তা স্পষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্ঘটনা একেবারে বন্ধ করতে না পারলেও সড়কে অহেতুক মৃত্যু অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। কিন্তু সেদিকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সুনজর আছে বলে মনে হয় না। তা না হলে প্রতি বছর সড়কে মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলত না।
সড়ক দুর্ঘটনায় আর্থসামাজিক ক্ষতির হিসাব তৈরি করেছে বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট (এআরআই)। সেখানে দেখা গেছে, ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিন বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। আর রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় মানবসম্পদের যে ক্ষতি হয়েছে, তার আর্থিক মূল্য ১৮ হাজার কোটি টাকার বেশি।
বাংলাদেশ এরই মধ্যে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তীর্ণ হয়েছে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থার দিকে নজর দিলে মনে হয় এখনো সেই আদিম অবস্থায় রয়ে গেছে। নির্ধারিত সময়ে উন্নত দেশের মতো গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা কষ্টসাধ্য বলেই মনে হয়। বলা হয়, কোনো দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য উন্নত পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা অপরিহার্য। আর্থসামাজিক অগ্রগতির পূর্বশর্ত উন্নত পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। অর্থাৎ অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং উন্নত পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা—এ দুই বিষয় অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এছাড়া উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা সভ্যতার পরিচয় বহন করে। সুতরাং উন্নত দেশের উপযোগী পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে পরিকল্পনা ও কাজ এখনই শুরু করতে হবে।










