ট্রাফিক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সিগন্যাল বাতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যে কারণে বিপুল অর্থ ব্যয়ে রাজধানী ঢাকায় সিগন্যাল বাতি স্থাপন করা হয়। কিন্তু যথাযথ তদারকি ও ব্যবস্থাপনার অভাবে এসব বাতি কার্যত গৌণ হয়ে পড়েছে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোয় সিগন্যাল বাতির উপযুক্ত ব্যবহার হলেও আমাদের দেশে এর প্রয়োগ সম্ভব হয়নি। আবার রাজধানীর গুলশান-২ নম্বর ইন্টারসেকশন ছাড়া আর কোথাও এসব সিগন্যাল ব্যবস্থা কার্যকর নেই। এমনকি সেখানে স্থাপিত সিগন্যাল ব্যবস্থাটি সচল থাকলেও হাতের ইশারায়ই যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা যায় দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্যকে।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, ২০০৪ সালের পর রাজধানীর সড়কগুলোয় ব্যাপক হারে ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা স্থাপন শুরু হয়। পরবর্তী দুই দশকে সরকার সিগন্যাল বাতি, ট্রাফিক কাউন্টডাউন টাইমার, অটো বা স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা, ইন্টেলিজেন্ট ট্রাফিক সিস্টেম বা আইটিএসের মতো প্রযুক্তি স্থাপনে প্রায় ২০০ কোটি টাকা খরচ করে। তবে যানজট কমাতে ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থাপনায় প্রচুর অর্থ খরচ হলেও রাজধানীবাসী কোনো সুফল পায়নি। ঢাকার প্রতিটি ইন্টারসেকশনে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে ‘হাতের ইশারা’ পদ্ধতিই ব্যবহার করতে হচ্ছে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভাব্যতা যাচাই না করে পুরোপুরি অবৈজ্ঞানিকভাবে ঢাকায় সিগন্যাল বাতিগুলো স্থাপন করা হয়েছে। এজন্য যে পূর্বশর্তগুলো পালন জরুরি ছিল, তা বিবেচনা না করায় সিগন্যাল বাতিগুলো প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে।
অথচ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, জাপানের মতো উন্নত দেশগুলোয় ট্রাফিক ব্যবস্থা সিগন্যাল বাতিনির্ভর। ট্রাফিক আইন মেনে চলায় সেখানে সড়কে দুর্ঘটনাও কম ঘটে। পথচারীরা নির্ভয়ে জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করে রাস্তা পার হয়। পথচারীদের রাস্তা পার হওয়ার সংকেত সিগন্যাল বাতিতে ফুটে ওঠে, যা দেখে সড়কে চলাচলরত যানবাহনগুলো সতর্ক হয়। এমনকি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রকৌশলীরা কালার ব্লাইন্ড বা বর্ণান্ধদের জন্য আলাদা সিগন্যাল বাতি উদ্ভাবন করেছেন। প্রতিবেশী দেশ ভারতও সিগন্যাল বাতির কার্যকর ব্যবহার করছে।
কিন্তু আমাদের দেশে সিগন্যাল বাতির প্রচলন কাঙ্ক্ষিত ফল এনে দিতে পারেনি। যে কারণে ২০০৪-১২ সালে ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপন হয় ৫৯টি ইন্টারসেকশনে সিগন্যাল ব্যবস্থা। একই সময়ে প্রায় ১৬ কোটি টাকা খরচ করে ঢাকার ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেকশনে বসানো হয় কাউন্টডাউন টাইমার, যার একটিও বর্তমানে কার্যকর নেই। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালে ইন্টেলিজেন্ট ট্রাফিক ব্যবস্থা (আইটিএস) নামে একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। প্রায় ৫২ কোটি টাকা ব্যয়ের এ ব্যবস্থা এখন কোনো কাজে লাগছে না।
এদিকে ঢাকার সিগন্যাল ব্যবস্থা আধুনিকায়নে অপচয়ের সর্বশেষ উদাহরণ নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ প্রকল্প। ২০১৯ সালে শেষ হওয়া এ কাজের মাধ্যমে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত হয় স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং সেটি সচল রাখতে বসানো হয় সোলার প্যানেল। পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে স্থাপিত এ স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা কোনো কাজেই আসেনি। এ খাতে ব্যয় হওয়া অর্থ পুরোটাই অপচয় হয়েছে।
দুই সিটি করপোরেশন মিলিয়ে রাজধানীতে ১০০ পয়েন্টে সিগন্যাল বাতি রয়েছে। স্থাপনের পর থেকে বাতিগুলোর জন্য মোটা অংকের টাকা খরচ করছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। এত অর্থ খরচ করেও কোনো উপকার মিলছে না। বরং ট্রাফিক পুলিশকে হাত দিয়েই যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে।
এভাবে ব্যয়বহুল প্রকল্প গ্রহণের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই না করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ অবিবেচনাপ্রসূত কাজ হয়েছে। ফলে একদিকে যেমন রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে, তেমনি কোনো ফলও পাওয়া যায়নি। অথচ সিগন্যাল বাতিগুলো ব্যবহার করে আমাদের দেশেও উন্নত ট্রাফিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেত। এজন্য বিদ্যমান সিগন্যাল বাতিগুলো কাজে লাগানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে সিগন্যাল বাতি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে সিটি করপোরেশন ও পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। সেই সঙ্গে চালকদেরও যথার্থ প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে। সিগন্যাল বাতির সেন্সর যেন কাজ করে সেজন্য যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক পরিবহনের ক্ষেত্রে আলাদা লেনও প্রস্তুত করা আবশ্যক। এর পাশাপাশি অবকাঠামোগত দিক খেয়াল করে সিগন্যাল বাতির সক্ষমতার দিকটিও দেখতে হবে। বস্তুত সিগন্যাল বাতি যেহেতু বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে, এজন্য সড়কে ট্রাফিক ব্যবস্থা আধুনিকায়নে এর বিকল্প নেই। এটি ট্রাফিক পুলিশের কাজ আরো সহজ করবে। নাগরিকরা যদি সচেতনতা প্রদর্শন করে, তাহলে সুষ্ঠু ট্রাফিক ব্যবস্থায় সিগন্যাল বাতি কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। আমরা রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় নয়, সুষম ব্যবহার দেখতে চাই। এজন্য সম্ভাব্যতা যাচাই করে, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার আলোকে ট্রাফিক ব্যবস্থায় সিগন্যাল বাতিগুলোর ব্যবহার হোক, এটিই আমাদের কাম্য।










