সাধারণত সড়ক, মহাসড়ক ও সেতুর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য টোল আদায় করা হয়ে থাকে। উন্নত দেশসহ প্রতিবেশী ভারতও মহাসড়ক বা এক্সপ্রেসওয়েতে টোল আদায় করে থাকে। তবে তারা প্রতিরোধমূলক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার দিকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। রাস্তা মেরামতের ক্ষেত্রে আমরা উন্নত দেশগুলোকে অনুসরণ করতে পারি। টোল হার নির্ধারণে গুরুত্ব দেয়া হোক সাধারণ জনগণকে। কারণ তাদেরই অতিরিক্ত টোলের ভার বহন করতে হয়। তাই টোল হার সহনীয় পর্যায়ে রাখাই উত্তম। 

২০১৪ সালের টোল নীতিমালা সংশোধন করে নতুন‌ টোল নীতিমালা ২০২৩ (সংশোধিত)’-এর খসড়া প্রস্তুত করেছে সরকার। সেই খসড়ায় টোলহার নির্ধারণ পদ্ধতিতে আনা হয়েছে বড় ধরনের পরিবর্তন। আগের নীতিমালায় ‘‌ভিত্তি টোল’ পরিবর্তন ছাড়া টোল হার বৃদ্ধি করার সুযোগ ছিল না। কিন্তু নতুন নীতিমালায় টোলহার নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংযুক্ত করা হয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতের ভোক্তা মূল্য সূচককে। এর ফলে ‘‌ভিত্তি টোলে’ কোনো পরিবর্তন ছাড়াই প্রতি বছর বাড়বে টোল হার। 

বণিক বার্তায় প্রকাশ, নতুন এ টোল নীতিমালা কেবল সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতাধীন মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে ও সেতুর জন্য প্রযোজ্য। পদ্মা সেতু, বঙ্গবন্ধু সেতু, মুক্তারপুর সেতু, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল ও ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এ নীতিমালার আওতায় পড়বে না। এসব অবকাঠামোর টোল হার নির্ধারণ ও পরিবর্তন হয় সরকারের সেতু বিভাগের মাধ্যমে। এছাড়া খসড়া টোল নীতিমালায় জাতীয়, জেলা ও আঞ্চলিক মহাসড়কের সংজ্ঞায়ও কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন করে টোল সড়ক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে সীমান্ত মহাসড়ককে।

বিদ্যমান নীতিমালায় গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের ভিত্তি টোল নির্ধারণ করা রয়েছে কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা। একইভাবে কিলোমিটারপ্রতি জাতীয় মহাসড়কে ১ টাকা ৫০ পয়সা, আঞ্চলিক মহাসড়কে ১ টাকা, জেলা মহাসড়কে ৫০ পয়সা ভিত্তি টোল নির্ধারণ করা আছে। নীতিমালার খসড়া সংশোধনীতে এর সঙ্গে নতুন করে সংযোজন করা হয়েছে সীমান্ত সড়ক, যার ভিত্তি টোল নির্ধারণ করা হয়েছে কিলোমিটারপ্রতি ১ টাকা। এর বাইরে এক্সপ্রেসওয়েকে রাখা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক শ্রেণীতে। 

পরিবর্তিত নতুন নীতিমালার টোল হার সমন্বয়ের সূত্র প্রয়োগ করে দেখা গেছে, এটি কার্যকর হলে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতের সর্বশেষ প্রকাশিত ভোক্তা মূল্য সূচকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এক্সপ্রেসওয়ে বা গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কের ভিত্তি টোল হবে প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৪৩ পয়সা। একইভাবে কিলোমিটারপ্রতি জাতীয় মহাসড়কে ১ টাকা ৮২ পয়সা, আঞ্চলিক ও সীমান্ত মহাসড়কে ১ টাকা ২২ পয়সা ও জেলা মহাসড়কের ভিত্তি টোল হবে ৬১ পয়সা।

প্রতি বছর স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোল বাড়লে জনদুর্ভোগ বাড়বে। বাড়তি টোলের ভার বইতে হবে সাধারণ মানুষকে। কারণ গাড়ির যন্ত্রপাতি, জ্বালানির দাম ও টোলের হার বাড়লে তা ভাড়ার সঙ্গে সমন্বয় করতে চাইবেন পরিবহন মালিকরা। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও গাড়ি ভাড়া বাড়বে। টোল বাড়ার নীতিমালা কার্যকর হওয়ার পর পরিবহন মালিকরা প্রতি বছরই ভাড়া বাড়ানোর নতুন ইস্যু তৈরি করবেন। প্রতি বছরই তারা ভাড়া বাড়াবেন। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে এমনিতেই পরিবহন পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। 

টোল বৃদ্ধির ফলে নিয়মিত যাতায়াত ব্যয় যেমন বৃদ্ধি পাবে, সেই সঙ্গে বাড়বে ভোগ্যপণ্যের মূল্য। কেননা পণ্যবাহী যানবাহনকে পরিশোধ করতে হবে চড়া মূল্য। এর প্রভাব পড়বে ব্যয় বৃদ্ধিজনিত মূল্যস্ফীতিতে। ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি দ্বিগুণ হবে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

টোল বাড়ানোর ফলে সাধারণ মানুষের ওপর যেন নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে সেটা নিয়ে ভাবা উচিত নীতিনির্ধারকদের। টোল আদায়কে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজরা সংগঠিত হয়ে থাকে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়াতে হবে। টোলের অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত জরুরি। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে টোলকে সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে। ক্ষেত্র বিবেচনায় টোলের হার নির্ধারণও জরুরি। প্রয়োজনীয় পণ্যবাহী পরিবহন ও বিলাসপণ্য পরিবহনের ওপর টোলকে একই বিবেচনায় রাখা যাবে না। 

দেশের সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা হচ্ছে একটি দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মেরুদণ্ড। দেশের পরিবহন ব্যবস্থা গতিশীল হলে আর্থিক প্রবৃদ্ধির হার বাড়বে। বর্তমানে অর্থনীতির চালিকাশক্তি এ সড়কগুলো থেকে আদায়কৃত টোল রাজস্ব আয়ের অন্যতম একটি উৎস। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টোল থেকে যেমন প্রত্যক্ষ আয় হচ্ছে, তেমনি টোলমুক্ত সড়কপথ থেকে পরোক্ষ আয়েরও সুযোগ রয়েছে। প্রাপ্ত প্রত্যক্ষ আয়ের চেয়ে পরোক্ষ আয়ের পরিমাণ ও উপকারিতা বেশি। তাই পরোক্ষ আয়ের দিকেও গুরুত্ব দেয়া উচিত। অবাধ যাতায়াতে অর্থনৈতিক কর্মতৎপরতা, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ বাড়বে। দূরদর্শিতাসম্পন্ন রাষ্ট্রগুলো কৌশলগত দিক বিবেচনায় নিয়ে বড় বড় সড়ক, মহাসড়ক, সেতু বানিয়ে সেগুলোয় অবাধে চলাচল করতে দেয়, কোনো টোল আরোপ করে না। সুতরাং টোল আদায়ের চ্যালেঞ্জ এবং অর্থনৈতিক উন্নতির পথে প্রত্যক্ষ অর্জন ও পরোক্ষ অর্জনের অবদানের বিষয়টি নিয়ে বিশ্লেষণ জরুরি।

এছাড়া টোল আদায়ে যানবাহনকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। তাই এ কার্যক্রমকে আরো আধুনিকায়ন ও উন্নত করতে হবে।