আমাদের জীবনযাত্রায় পরিবহনের ভূমিকা অপরিসীম। মানবসভ্যতার বিবর্তনে পরিবহন ব্যবস্থা নানা বাঁক বদল করেছে। গরুর গাড়ি থেকে শুরু করে হালের মোটরবাইক, সবই সময়োপযোগী বিবর্তনের প্রক্রিয়া। এরই সঙ্গে গুরুত্ব পেয়েছে পরিবহনের রসদ, প্রশ্ন উঠেছে জীবাশ্ম জ্বালানি ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার নিয়ে। পরিবেশের জন্য কোনটি কম ক্ষতিকর তা নিয়ে হয়েছে গবেষণা। উদ্ভাবনের তাগিদ ও দ্রুত যাতায়াত নিশ্চিতে পরিবহনে যোগ হয়েছে বিদ্যুৎ। উন্নত দেশগুলো এরই মধ্যে বিদ্যুচ্চালিত যানবাহন ব্যবহার শুরু করে দিয়েছে। বিশ্বায়নের যুগ ও সময়ের চাহিদায় আমাদেরও তাই পিছিয়ে পড়ার সুযোগ নেই। যে কারণে শিগগিরই বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির (ইভি) যুগে প্রবেশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, যানবাহনে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। এর বদলে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বিদ্যুচ্চালিত যানবাহনে। দেশের সড়ক পরিবহন খাতে ব্যবহৃত মোটরযানের অন্তত ৩০ শতাংশ ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুচ্চালিত হিসেবে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে ‘ইলেকট্রিক মোটরযান রেজিস্ট্রেশন ও চলাচল নীতিমালা-২০২৩’।
বর্তমানে সারা দেশে নিবন্ধিত মোটরযান আছে প্রায় ৫৭ লাখ। এসব যানবাহন চালানোর জন্য ব্যবহার হয় তেল ও গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি। আর জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার পরিবেশকে বিপর্যয়ের মুখে ফেলছে। এর ফলে সৃষ্ট গ্রিনহাউজের প্রভাবে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়, প্রকৃতির বিরূপ আচরণে এ দেশের ছয় ঋতুর বৈচিত্র্য হারিয়ে যেতে বসেছে। তাই জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির ব্যবহারের প্রতি বিশ্বব্যাপী যে জোর দেয়া হচ্ছে, বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। এরই মধ্যে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) দেশে বিদ্যুচ্চালিত মোটরযানের নিবন্ধন দেয়া শুরু করেছে। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট করপোরেশনের (বিআরটিসি) মাধ্যমে ইলেকট্রিক বাস প্রবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ভারত থেকে ১০০টি বিদ্যুচ্চালিত বাস আমদানি করা হবে। শুরুতে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে এসব বাস চালানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুচ্চালিত মোটরযান চার্জিং স্টেশন স্থাপনের প্রয়োজনও রয়েছে। এজন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিদ্যুৎ বিভাগ, শিল্প মন্ত্রণালয়সহ সরকারের একাধিক সংস্থাকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। দেশে একাধিক কোম্পানি বিদ্যুচ্চালিত মোটরযান উৎপাদনে কারখানা স্থাপন করেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে রাজস্ব বোর্ডের পক্ষ থেকে স্থানীয় উৎপাদনকারী ও আমদানিকারকদের বিশেষ প্রণোদনা দেয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
মূলত বিশ্বে যখন বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির প্রচলন শুরু হয়ে গেছে, তখন আর বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। বিশ্ববাজারে জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত গাড়ির স্থান ক্রমেই দখল করে নিচ্ছে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি। প্রতিষ্ঠিত গাড়ি কোম্পানিগুলো বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি নির্মাণের পেছনে প্রচুর টাকা বিনিয়োগ করছে। ২০২১ সালে নরওয়েতে বিক্রি হওয়া নতুন গাড়ির দুই-তৃতীয়াংশই ছিল বিদ্যুচ্চালিত। পেট্রল ও ডিজেলের মতো জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত গাড়ি বিক্রি বন্ধ করার ক্ষেত্রে প্রথম হওয়ার লক্ষ্য নরডিক দেশটির। ৫৪ লাখ জনসংখ্যার নরওয়েতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বিদ্যুচ্চালিত যানবাহন রয়েছে।
নরওয়ে জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত গাড়ির ওপর আরোপিত কর থেকে বিদ্যুচ্চালিত গাড়িতে ভর্তুকি দিচ্ছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে শূন্য কার্বন নিঃসরণকারী গাড়ি ব্যবহারে দেশটি নাগরিকদের উৎসাহিত করছে। পাশাপাশি ২০২৫ সালে পেট্রল ও ডিজেলচালিত নতুন গাড়ির বিক্রি বন্ধ করার লক্ষ্য নরওয়ের। এ সময় পর্যন্ত বিদ্যুচ্চালিত গাড়িতে ভর্তুকি দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে দেশটি। সৌদি আরব বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির বাজারে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। গত বছর দেশটিতে ‘সিয়ার’ নামে সৌদি ব্র্যান্ড উন্মোচন করা হয়েছে। সৌদি আরবের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোয় এসব গাড়ি বিক্রি করা হবে। কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ কমানোর উদ্যোগেও এ বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি উৎপাদনের উদ্যোগ বড় ভূমিকা রাখবে।
বস্তুত বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির জগতে দ্রুততর পরিবর্তন আসার সময় হয়েছে। কার্বন নির্গমন হ্রাসের চেষ্টায় বিভিন্ন দেশ পেট্রল ও ডিজেলচালিত গাড়ির ব্যবহার বন্ধ করার উদ্যোগ নিচ্ছে। ফলে বিশ্বজুড়েই বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি বিক্রি বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি বিক্রি নীরবে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ১ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবারের কাছে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি রয়েছে। এদিকে প্রথমবারের মতো সৌরবিদ্যুচ্চালিত গাড়ি বাজারে আনতে যাচ্ছে ভারত। ভারতে তীব্র বায়ুদূষণের মধ্যে পরিবেশবান্ধব এ গাড়ি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তীব্র বায়ুদূষণ কমাতে দেশটির সরকার যখন একের পর এক পদক্ষেপ নিচ্ছে, ঠিক তখনই পরিবহন জগতের এমন আবিষ্কার কিছুটা হলেও স্বস্তির আশ্বাস দিচ্ছে। এরই মধ্যে ভারত সরকার স্থানীয়ভাবে বৈদ্যুতিক যান এবং যন্ত্রাংশ তৈরির জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কোটি ডলারের প্রণোদনা দিচ্ছে। ব্রিটেনে শুরুতে অধিকাংশ ভোক্তা ঐতিহ্যগত গাড়ি থেকে ইভি ব্যবহারে বিভিন্ন সমস্যার কথা বলেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি ব্যবহারে আগ্রহী বেশির ভাগ ব্রিটিশ ভোক্তা। সম্প্রতি ব্রিটেনে নতুন ভোক্তাদের নিয়ে পরিচালিত একটি জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। শুরুতে তারা ইভির চার্জিং ব্যবস্থা, রেঞ্জ, ব্যাটারির ধারণক্ষমতাসহ অন্যান্য বিষয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু এখন মনোভাব পরিবর্তন করে তারা ইভি ব্যবহারে আগ্রহী।
এভাবে বিশ্বব্যাপী বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি ব্যবহারের জোয়ার তৈরি হয়ে গেছে, সে ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশও ইভি যুগে প্রবেশ করবে—এটিই পরিবেশবাদীদের চাওয়া। কারণ কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে বাংলাদেশকেও ভূমিকা রাখতে হবে। এছাড়া বিদ্যুৎ খরচের যে বিষয়টি নিয়ে আশঙ্কা থাকে, সেক্ষেত্রে দেশে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকায় দুশ্চিন্তার কিছু নেই। এছাড়া চার্জিং ব্যবস্থা সহজলভ্য করা হবে—এ প্রতিশ্রুতিতে আমরা আশ্বস্ত হতে চাই। সব মিলিয়ে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি ব্যবহারে দেশের নাগরিকরা অভ্যস্ত হবে—এ দৃশ্যই সবাই প্রত্যাশা করছে। কিন্তু আমাদের দেশে কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে তা সময়মতো বাস্তবায়ন না করার যে প্রবণতা রয়েছে, সেটি যেন বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির ক্ষেত্রে না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। পরিশেষে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির যাত্রা হোক এবং ২০৩০ সালকে যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে তার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন হোক, সেটিই আমাদের কাম্য।










