চীনের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে যেসব খবর চাউর হচ্ছে তা অনেকটা নব্বই দশকে জাপানের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ১৯৯১-৯২ সালে জাপানের আবাসন খাত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। এ সংকট কি ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠল? তিন দশক আগে জাপান যে খাদে পড়েছিল চীনও কি সেই মূল্যসংকোচন ও শ্লথগতির খাদে পড়ল?
আগস্টে অনুচ্ছেদ ১৫-এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে দেউলিয়া সুরক্ষার আবেদন করেছে চীনা আবাসন জায়ান্ট এভারগ্র্যান্ড। এর আগে ২০২১ সালে ঋণখেলাপি হয়েছে কোম্পানিটি। উল্লেখ্য, অনুচ্ছেদ ১৫-এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অন্য কোনো দেশে দেউলিয়াত্ব সুরক্ষায় হস্তক্ষেপ করতে পারেন মার্কিন আদালত। এভারগ্র্যান্ডের ইস্যু শেষ হতে না হতেই অফশোর বন্ড হিসেবে ২ কোটি ২৫ লাখ ডলার পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে কান্ট্রি গার্ডেন নামে অন্য এক প্রপার্টি ডেভেলপার। এছাড়া ১১টি অনশোর বন্ডের ট্রেডিং বন্ধ করেছে। এতে কোম্পানিটির দেউলিয়াত্বের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এগুলো আসলে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরে চীনের জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রধান ইঞ্জিন হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পড়তি মূল্যে ধুঁকছে আবাসন খাত। অবিক্রীত বাড়ি ও অফিস ভবনের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। প্রতিদিনই মনে হচ্ছে, বিপর্যয়ের মুখে আরেক ধাপ এগোচ্ছে খাতটি।
আবাসন খাতে বিপর্যয়ের বড় ধাক্কাটা লাগবে দেশটির প্রবৃদ্ধিতে। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি থেকে আশির দশক পর্যন্ত জাপানের বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি হার ছিল ৪-৫ শতাংশ। কিন্তু আবাসন খাতে বিপর্যয়ের জেরে তা শূন্য থেকে-২ শতাংশে নেমে আসে। এখন পর্যন্ত পুরনো প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে পারেনি জাপানের অর্থনীতি।
এরই মধ্যে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে শ্লথগতি শুরু হয়েছে। মাথাপিছু আয় বাড়লে দ্রুত সম্প্রসারমাণ উদীয়মান অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে শ্লথগতি স্বাভাবিক হলেও চীনেরটা যে হারে হচ্ছে তা শঙ্কার। ২০২২ সালে শ্লথগতির মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর ২০২৩ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে চীনের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হার নেমে এসেছে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশে। যেখানে প্রথম প্রান্তিকে এশিয়ার শীর্ষ অর্থনীতির জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ২ শতাংশ।
চলতি বছরে ৫ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভবপর হলেও চীনের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আশাব্যঞ্জক নয়। জুলাইয়ে দেশটির ভোক্তা মূল্য সূচক (সিপিআই) দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশে। এতে সম্ভাব্য মূল্যসংকোচনের ভয় জাগিয়ে দিয়েছে নীতিনির্ধারকদের মনে।
চীনের অর্থনীতির এ বেহাল দশার পেছনে আংশিকভাবে দেরিতে শূন্য কভিড পলিসি থেকে বেরিয়ে আসার দায় রয়েছে। বিনিয়োগ হ্রাস আসলে প্রধান ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া চীনের মূলধন বাজার থেকে বিনিয়োগ গুটিয়ে নিচ্ছেন বৈদেশিক পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরা এবং প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগও (এফডিআই) নিম্নমুখী।
চীনের নানামুখী সংকটে পড়ার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও রাজনৈতিক বিরোধের আংশিক ভূমিকা রয়েছে। এছাড়া চীনের গুপ্তচরবিরোধী আইনেরও প্রভাব রয়েছে। নতুন এ আইনের কারণে বিদেশী ব্যবসায়ীরা বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে স্বাভাবিক ও বৈধ কাজের জন্যও বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন। এ আইনের আওতায় গত মার্চে আটক হন ওষুধ বিক্রেতা কোম্পানি অ্যাস্টেলাসের এক কর্মী। এখনো মুক্তি পাননি জাপানি ওই কর্মী। বিদেশী কোম্পানিগুলো চীনে কর্মী নিয়োগে হিমশিম খাচ্ছে। কর্মীদের বড় একটা অংশ চীনে কাজের ব্যাপারে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছেন।
চীনের বাজার নিয়ে হতাশার আরেকটা জায়গা হলো তথ্যে ফাঁকফোকর ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য। সম্প্রতি এক ঘোষণায় চীন জানায়, তারা চীনা যুবকদের বেকারত্বের উপাত্ত প্রকাশ করবে না। চীনের যুবক-যুবতীরা যে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সরকারের এ উপাত্ত প্রকাশে অনীহায় তা স্পষ্ট। সরকারি উপাত্তে আরো দেখা গেছে, গত বছর প্রথমবারের মতো জনসংখ্যা কমল চীনের। ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের মানে দাঁড়াচ্ছে চীনের অর্থনীতি সার্বিকভাবেই খারাপ সময় পার করছে।
জনসংখ্যা হ্রাস চীনের আরেকটি উদ্বেগ হিসেবে হাজির হয়েছে। জাপানের উদাহরণ থেকে স্পষ্ট, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর আকার হ্রাস সামাজিক ও আর্থিক চাপের সৃষ্টি করে। শ্রমনির্ভর শিল্পে কর্মিস্বল্পতার পাশাপাশি পেনশন ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। এছাড়া চিকিৎসা ও দীর্ঘমেয়াদি সেবা-শুশ্রূষা ব্যয়ও বাড়ে। কয়েক দশক ধরে কঠোর জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনুসরণের কারণে জনমিতিক রূপান্তরে জাপানের চেয়েও দ্রুত বিপাকে পড়তে পারে চীন। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করলেও তা বিশাল জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়।
অর্থনৈতিক সংকট কোন দিকে যাচ্ছে তা দুটো ফ্যাক্টরের ওপর নির্ভর করছে। প্রথমত, আবাসন খাতে বড় অংকের বিনিয়োগ করে তথাকথিত লোকাল গভার্নমেন্ট ফাইন্যান্সিং ভেহিকলস (এলজিএফভি)। সরকারের আয়-ব্যয়ের খাতায় বড় আকারের প্রভাব রাখে এই এলজিএফভি। গত বছর শেষে এলজিএফভি খাতে ঋণের পরিমাণ ছিল ৫৭ ট্রিলিয়ন ইউয়ান বা ৭ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির মোট জাতীয় উৎপাদনের (জিডিপি) ৪২ শতাংশ।
ওই আয় থেকে এলজিএফভি ঋণ পরিশোধ করা সম্ভবপর হতে পারে। এটা হয়তো ব্যালান্সশিটের স্বচ্ছতা বাড়াতে পারে, তবে এটা কিন্তু এক ঋণের বোঝা থেকে অন্য বোঝা কাঁধে নেয়া।
দ্বিতীয় অন্য ফ্যাক্টরটি হচ্ছে, চীনের চারটি বৃহৎ ব্যাংকই রাষ্ট্র মালিকানাধীন। এতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইচ্ছা করলেই সংকটে থাকা ব্যাংককে প্রয়োজনীয় মূলধন সরবরাহ করতে পারে। কিন্তু বারবার এ ধরনের মূলধন সরবরাহ করা আর্থিক খাতের দুর্দশারই ইঙ্গিতবাহী।
উল্লেখ্য, চীনের নন-পারফর্মিং লোন বা কুঋণের মাত্র ২০ শতাংশ ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি মোকাবেলার ব্যর্থতা থেকে সৃষ্ট। সিংহভাগ ঋণ সরকারি কিংবা বিপদে থাকা রাষ্ট্র মালিকানাধীন উদ্যোগগুলোকে (এসওই) সহায়তার জন্য দেয়া ঋণ। তাই যেকোনো বেইলআউট প্রক্রিয়া শুরু মানে সরকারের দেয়া ঋণেরই দায়িত্ব নেয়া।
আবাসন খাতে যদি বিপর্যয় দেখা দেয় তাহলে চীন সরকার ও ব্যাংকগুলোকে তিন দশক আগে করা জাপানের ভুলের পুনরাবৃত্তি এড়াতে হবে।
ভালো পদক্ষেপ হিসেবে শুরুতে কুঋণ বা মন্দ ঋণের বিস্তারিত ও সময়োচিত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে। নতুন ঋণ প্রদানে অহেতুক তাড়াহুড়া কিংবা নিয়মিত ঋণখেলাপি হচ্ছে এমন গ্রহীতাকে ঋণ দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। তবে যেসব খাতে জরুরি মূলধন সরবরাহ জরুরি সেখানে যথাশিগগির ঋণ সরবরাহ করতে হবে।
একইভাবে সরকারের উচিত রাষ্ট্রমালিকানাধীন উদ্যোগ (এসওই) ও আবাসন কোম্পানিগুলোকে নিয়মিত বিরতিতে ঋণ সরবরাহ বন্ধ করা। একই সঙ্গে ব্যাংক ও এলজিএফভিগুলো যাতে ঋণ পুনর্গঠন এগিয়ে নিয়ে যায় তা নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয় সরকার যাতে রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে নিজস্ব ঋণ পরিশোধে ওই রাজস্ব ব্যবহার করতে পারবে।
অর্থনীতিতে একের পর এক সংকট যেভাবে হাজির হচ্ছে চীন যদি তা মোকাবেলায় ব্যর্থ হয় তাহলে জাপানের মতো মূল্যসংকোচন ও মন্দা অনিবার্য হিসেবে দেখা দেবে। এমনটা হলে পুরো বিশ্বকেই তার ধকল পোহাতে হবে।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
তাকাতোশি ইতো: জাপানের সাবেক উপ-অর্থমন্ত্রী
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের অধ্যাপক
ভাষান্তর: সাবিদিন ইব্রাহিম










