ঢাকার জলাবদ্ধতা এক ধরনের স্বাভাবিক ঘটনা হয়েই দাঁড়িয়েছে বলা যায়। টানা কয়েক ঘণ্টা ভারি বৃষ্টি হলেই এ শহরের সড়ক ও বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে যায়। গত শুক্রবারের কথা, ঢাকায় সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৬ ঘণ্টায় ১৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়ক পানিতে ডুবেছে। এ অবস্থা যে অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফল তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। 

অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ঢাকায় অবকাঠামোর সংখ্যাও বেড়েছে অপরিকল্পিতভাবে। বিপরীতে কমেছে সবুজ পরিসর ও জলাধার। উন্নয়ন ও সৌন্দর্য বর্ধনের নামে ঢাকার খোলা জায়গা ও জলাধার দখল করে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে কংক্রিটের বিল্ডিং। জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাপে পিষ্ট এ নগরী এখন দখল-দূষণে পরিপূর্ণ। নদী থেকে খাল, পুকুর থেকে মাঠ যেমন সময়ের পরিক্রমায় হারিয়েছে এ শহর, তেমনি মানুষের বসবাসের স্থানও আয়তনে ছোট হয়ে এসেছে। একদিকে বসতি আলো-বাতাসহীন হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে কিছুক্ষণ টানা বৃষ্টিতে বসতঘরেই আটকে যাচ্ছে মানুষ। কারণ বাইরে হাঁটুসমান, কখনোবা কোমরসমান পানি। 

যদিও জলাবদ্ধতার জন্য ঢাকার ২ উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ প্রায় দায়ী করে থাকে নগরবাসীকে। তাদের ভাষ্যে, জনগণের অবিবেচিতভাবে ফেলা বর্জ্যে ড্রেনেজ সিস্টেম বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয়। কিন্তু এটি কি সংগত কোনো কারণ? জনগণের অসচেতনতা অব্যশই একটি কারণ জলাবদ্ধতা তৈরির, তবে নগরবাসীকে দায়ী করা সিটি করপোরেশনকে মানায় না। 

২০২১ সালে ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনের মূল দায়িত্ব ওয়াসার কাছ থেকে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে হস্তান্তর করা হয়। তারা এ জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিল। এরই মধ্যে প্রায় ৭৩০ কোটি টাকা ব্যয়ও করা হয়েছে। বলা বাহুল্য, কোটি কোটি টাকা জলেই গেছে। একদিকে জল জমে যায়, অন্যদিকে সেই জল সহজেও নামেও না। জল নিষ্কাশনে প্রায় ১২-১৫ ঘণ্টা পার হয়ে যায়। ভোগান্তিতে দিনাতিপাত করতে হয় নগরবাসীকে।

কেবল ড্রেনেজ ব্যবস্থা তৈরি করলেই পানি নিষ্কাশন করা যায় না। এজন্য প্রয়োজন হয় খাল বা নদী-নালার, যেখানে ড্রেনের পানি গিয়ে পড়বে। একসময় এ শহর ছিল খাল ও নদীবেষ্টিত। এর ভেতরে ছিল আরো অনেক জলাধার ও নিম্নাঞ্চল। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণের কবলে পড়ে খালগুলোর অধিকাংশেরই অস্তিত্ব এখন বিলীন। বছরের পর বছর ধরে খালের জায়গা দখল করে বাড়ি, মার্কেট, রাস্তাসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করায় খালগুলো অস্তিত্ব হারিয়েছে। আর যে কয়টির অস্তিত্ব বিদ্যমান সেগুলো অবৈধ দখলের কারণে পরিণত হয়েছে সরু নালায়। কিছু জলাধার ও পুকুর আবার সরকার ভরাট করে কাজে লাগিয়েছে। আর সমতলে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন। বৃষ্টির পানি ও ময়লা পানি নিষ্কাশনের জন্য যে ড্রেনেজ লাইনগুলো রয়েছে সেগুলোর মাধ্যমে নিষ্কাশন হয়ে শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত খালগুলোয় গিয়ে পড়ার কথা। কিন্তু খালগুলো না থাকায় পানি নামার সুযোগ না পেয়ে সড়কে প্রবাহিত হয়। আবার বিদ্যমান ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংস্কারও তেমন একটা নেই বললেই চলে। নিয়মমাফিক ড্রেনে জমা বর্জ্য অপসারণ না করার ফলে এগুলোর মাধ্যমে পানি বের হতে পারে না। 

এদিকে নগরবাসীর ফেলা ময়লা, আবর্জনা, পলিথিন, রাস্তার ওপর নির্মাণসামগ্রী রাখা ইত্যাদি কারণে নগরের ড্রেন ও খালগুলো আবর্জনার স্তূপে পরিণত হয়েছে। বৃষ্টির পানি ড্রেনের ওপরের ছিদ্রযুক্ত ঢাকনার মাধ্যমে সড়কের নিচে পানি নিষ্কাশনের ড্রেনে যায়। বিভিন্ন সড়ক ও ফুটপাত সংস্কারকাজের সময় বহু ঢাকনার মুখ বন্ধ করে ফেলে। সেই সঙ্গে পলিথিন, চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিকের বোতলসহ নানা বর্জ্য এবং বালি জমেও পানি নিষ্কাশন ঢাকনার মুখ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সড়কের নিচে থাকা ড্রেনে বৃষ্টির পানি যেতে পারে না। যেখানে একটি নগরের মোট আয়তনের ১২ শতাংশ জলাধার থাকা প্রয়োজন, ঢাকায় সেখানে জলাধার ২ শতাংশের কম। ফলে বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে বেরিয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। এ বাস্তবতায় ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক সচল করা ছাড়া ঢাকাকে স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতার হাত থেকে বাঁচানোর কোনো বিকল্প পথ নেই।

দুই সিটি করপোরেশন মুখে হরহামেশা জলাবদ্ধতা নিরসনে নানা প্রকল্পের কথা বলে। বাস্তবে সেসব কাজের চিত্রায়ন নেই। বর্ষার মৌসুমে স্বাভাবিক বৃষ্টির পরিমাণই বেশি থাকে। এ সময় যেন জলাবদ্ধতা তৈরি না হয় সেজন্য ড্রেনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করাসহ সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। টেকসই সমাধান করতে চাইলে খালগুলোকে দখলমুক্ত ও ড্রেজিং করতে হবে। ঢাকা এরই মধ্যে অপরিকল্পিত নগরে পরিণত হয়েছে। চাইলেও এটাকে খুব বেশি পরিকল্পিত করার সুযোগ নেই। কিন্তু অবশিষ্ট যে জলাধার রয়েছে সেগুলো সংরক্ষণ করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে নতুন জলাধার নির্মাণে গুরুত্ব দিতে হবে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যেখান থেকে পরবর্তী সময়ে পানি খাল কিংবা নদীতে নিষ্কাশন করা হবে। এজন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও সংশ্লিষ্ট আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোর সজাগ হওয়াও জরুরি। 

মধ্য ঢাকার একটি বড় অঞ্চলের বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে হাতিরঝিল প্রকল্প একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এটি সাফল্যের সঙ্গে পানি নিষ্কাশনে ভূমিকা রাখছে এবং দৃষ্টিনন্দন হওয়ায় ভালো পর্যটন স্থান হিসেবেও ব্যবহার হচ্ছে। এই হাতিরঝিলও একসময় দখলদারত্বে ছিল। নানা বাধা অতিক্রম করেই এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। ঢাকার জলাবদ্ধতা দূর করতে এমন প্রকল্প আরো বাস্তবায়ন করা হোক। নয়তো ঢাকা অপরিকল্পিত নগরায়ণের উদাহরণ হিসেবেই রয়ে যাবে।