বিশ্বজুড়ে জাতীয় সংসদগুলোয় নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে। বিশ্বের জাতীয় সংসদগুলোর সংগঠন ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) হিসাবে বর্তমানে বিশ্বে প্রতি চারজন সংসদ সদস্যের একজন নারী। আজ থেকে ৩০ বছর আগে ১৯৯৫ সালে সংখ্যাটি ছিল ১০ জনে একজন। আইপিইউর "উইমেন ইন পার্লামেন্ট: ১৯৯৫-২০২৫ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুসারে, ১৯৯৫ সালে বিশ্বের কোনো দেশের সংসদেই জেন্ডার প্যারিটি বা নারী-পুরুষ সমতা ছিল না। তবে ২০২৫ সালে এসে দেখা যাচ্ছে ছয়টি দেশের নিম্ন বা একক কক্ষের পার্লামেন্টে নারী-পুরুষের হার সমান বা পুরুষের চেয়ে নারীর হার বেশি। দেশগুলো হলো রুয়ান্ডা (৬৩.৮%), কিউবা (৫৫.৭%), নিকারাগুয়া (৫৫%), মেক্সিকো (৫০.২%), অ্যান্ডোরা (৫০%) ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (৫০%)। নিম্ন বা একক কক্ষের পার্লামেন্টে ৩০ শতাংশের বেশি নারী সদস্য আছেন এ রকম দেশের সংখ্যা বর্তমানে ৭১। ১৯৯৫ সালে এ রকম দেশ ছিল মাত্র পাঁচটি।

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে নারী সংসদ সদস্যের হার বৈশ্বিক গড়ের কাছাকাছি হলেও এ নারীদের বেশির ভাগই সরাসরি নির্বাচিত নন। বাংলাদেশের সংসদে নারীর জন্য ৫০টি আসন সংরক্ষিত থাকে। রাজনৈতিক দলগুলোর সংসদে প্রাপ্ত আসনের ভিত্তিতে নারী আসনগুলো বণ্টন করা হয়। ফলে রাজনৈতিক নেতাদের স্ত্রী, কন্যা বা আশীর্বাদপুষ্টরা এগুলোয় মনোনীত হন। অনেক ক্ষেত্রে মনোনয়ন পেতে মোটা অংকের অর্থের লেনদেন ঘটে। ফলে এর মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদে নারীদের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয় না।

বাংলাদেশের নারী অধিকারকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরেই সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু এতদিন দেশে নিয়মিত সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা না থাকায় সংরক্ষিত আসনে নারীদের সরাসরি নির্বাচনের দাবি গৌণ হয়ে গিয়েছিল। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে নারীদের সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের প্রসঙ্গটি বেশ জোরালোভাবে সামনে এসেছে। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনও নারীদের জন্য ১০০ সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের সুপারিশ করেছে।

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন মনে করে, বিদ্যমান পদ্ধতিতে নারীরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত না হওয়ায় এবং তাদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট আসন না থাকায় সংশ্লিষ্ট সাধারণ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সঙ্গে তাদের দ্বৈত প্রতিনিধিত্ব সৃষ্টি হয়। ফলে সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যরা সাধারণ আসন থেকে নির্বাচিত সদস্য কর্তৃক দায়িত্ব পালনে অসহযোগিতা ও বাধার সম্মুখীন হন। এতে নারীর ক্ষমতায়ন যেমন হয় না, তেমনি জনগণের প্রতি তাদের কোনো দায়বদ্ধতাও তৈরি হয় না। আনুকূল্যের ভিত্তিতে মনোনীত হওয়ায় দল ও দলীয় প্রধানের প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্যই প্রতিষ্ঠিত হয়। অথচ যেকোনো বিবেচনাতেই দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারীর রাজনীতিতে, নীতিনির্ধারণে ও আইন প্রণয়নে সরাসরি অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল এ রকম একটি উদ্দেশ্য থেকেই। ধারণা করা হয়েছিল অসম সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণের পথ সুগম হবে। ফলে ধীরে ধীরে সংরক্ষিত আসনের বাইরে সাধারণ আসনগুলোতেও নারীদের অংশগ্রহণ বাড়বে এবং একসময় আর সংরক্ষিত আসনের প্রয়োজন হবে না।

কিন্তু বাস্তবে সংরক্ষিত আসনে নারীদের সরাসরি নির্বাচন না হওয়ার কারণে এগুলো নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে কোনো কাজে লাগেনি। দেশের বিগত ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে, সরাসরি সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের অংশগ্রহণ ৫ শতাংশের বেশি হয়নি (২০২৪) এবং নারী প্রার্থীদের নির্বাচিত হওয়ার হার ছিল সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ (২০১৮)। তাও সেটা ছিল জালিয়াতির নির্বাচন। (সূত্র: নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন প্রতিবেদন, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫)

এ কারণেই নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন ও সংবিধান সংস্কার কমিশন—উভয় কমিশনের পক্ষ থেকেই সংসদে ১০০ সংরক্ষিত আসনে নারীর সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। এ সুপারিশ অনুসারে সংরক্ষিত নারী আসন ৫০ থেকে ১০০-তে উন্নীত করে সংসদের মোট আসন সংখ্যা ৪০০ করা হবে এবং সেখান থেকে ১০০ আসন লটারি বা অন্য কোনো পদ্ধতিতে চিহ্নিত করে নারীদের জন্য সংরক্ষণ করা হবে। এ আসনগুলোয় কেবল নারীরাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। অন্য ৩০০ আসনে নারী-পুরুষ উভয়েরই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ থাকবে। দ্বিতীয়বার, অর্থাৎ পরবর্তী নির্বাচনে অন্য ১০০টি আসনে শুধু নারীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এভাবে চারটি মেয়াদে প্রতিটি আসন থেকে একজন নারী যোগ্যতার ভিত্তিতে অন্য নারীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হয়ে আসার সুযোগ পাবেন।

কমিশন মনে করে, এভাবে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে বিদ্যমান সংরক্ষিত ব্যবস্থার অনেক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। কারণ:

প্রথমত, সংরক্ষিত আসন থেকে নির্বাচিত নারীদের নিজস্ব নির্বাচনী এলাকা থাকবে এবং এসব নির্বাচনী এলাকায় দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তারা পরবর্তী সময়ে পুরুষদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হওয়ার সক্ষমতা অর্জন করবেন।

দ্বিতীয়ত, এ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যপদ আর ‘ফায়দা’ হিসেবে ব্যবহৃত হবে না। নারীদের নিজস্ব যোগ্যতা ও দক্ষতাই হবে নির্বাচিত হওয়ার মূল মাপকাঠি।

তৃতীয়ত, ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব সংসদ সদস্য একই দায়দায়িত্ব, ক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন। ফলে নারী সদস্যরা আর আলংকারিক হিসেবে গণ্য হবেন না এবং তাদের হীনম্মন্যতায় ভুগতে হবে না।

চতুর্থত, ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে সংরক্ষিত আসনের নারীরা ভোটারদের কাছে দায়বদ্ধ হবেন; শুধু দল বা দলের প্রধানের কাছে নয়।

পঞ্চমত, চারটি নির্বাচনী চক্রে বা চার টার্মে প্রত্যেক আসন থেকে অন্তত একবার একজন নারী সরাসরি যোগ্যতার ভিত্তিতে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। এতে সারা দেশ থেকে একঝাঁক নারী নেতৃত্ব সৃষ্টি হওয়ার দ্বার উন্মোচন হবে।

কমিশন তার সুপারিশের পক্ষে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছে। ভারতের পঞ্চায়েত বা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এ ধরনের ঘূর্ণায়মান পদ্ধতি বহুদিন থেকেই চালু আছে। এ পদ্ধতির কারণে ভারতের পঞ্চায়েতে নারী প্রতিনিধির সংখ্যা বেড়েছে। যেমন ভারতীয় পঞ্চায়েতের তিন স্তরে—গ্রাম, পঞ্চায়েত সমিতি এবং জেলায় মোট নারী সদস্যের সংখ্যা ২০০২ সালে প্রায় ৫ লাখ ৮৬ হাজার থেকে ২০০৮ সালে প্রায় ১০ লাখ ৪০ হাজারে এসে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েতে নারী প্রতিনিধির সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৩ হাজার ৩০০ থেকে ২১ হাজার ৩৫১। ভারতীয় পঞ্চায়েতি রাজ মন্ত্রণালয় কর্তৃক ২০ হাজার জনের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, এ সংরক্ষণ পদ্ধতি অনেক নারীকে (৪৩%) প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অংশগ্রহণে উদ্দীপ্ত করেছে। বেশির ভাগ নারী প্রতিনিধির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, আগে তাদের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা অত্যন্ত সীমিত ছিল এবং প্রথম নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মধ্য দিয়েই তাদের সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশের সূচনা ঘটে।

এ কারণেই নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন শুধু জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১০০ সংরক্ষিত আসনের ক্ষেত্রেই নয়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ৩৩ শতাংশ সংরক্ষিত আসনে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে নারীদের সরাসরি নির্বাচনের সুপারিশ করেছে। এছাড়া জনমত জরিপ থেকেও নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের পক্ষে মতামত পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্তৃক ৪৬ হাজারের অধিক ব্যক্তির মধ্যে পরিচালিত এক জরিপ থেকে দেখা গেছে, জরিপে অংশগ্রহণকারী ৭৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ মানুষ নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকার সংরক্ষিত আসনে নারীদের সরাসরি নির্বাচনের পক্ষে মতামত দিয়েছে। (সূত্র: নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন প্রতিবেদন, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫)

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জেন্ডার বৈষম্যের অবসান ঘটাতে এবং রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনতে সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের এ সুপারিশ বাস্তবায়ন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য রাজনৈতিক দলের সমর্থন ও নাগরিক অধিকার কর্মীদের সক্রিয় ভূমিকা থাকা দরকার।

কল্লোল মোস্তফা: লেখক, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক