দেশে গ্যাস সংকট ক্রমেই বাড়ছে। ফুরিয়ে আসছে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ। বিপরীতে কাঙ্ক্ষিত চাপে গ্যাসের সরবরাহ অক্ষুণ্ণ রাখার পরিকল্পনায় ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি ও চাহিদামতো এলএনজি আমদানির প্রতি মনোযোগী হওয়ার কথা বলছে পেট্রোবাংলা। সংকট সমাধানে ৪৬টি কূপ খননের কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, উৎপাদন ও সরবরাহের দিক থেকে দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাস ক্ষেত্র বিবিয়ানা। মার্কিন কোম্পানি শেভরন পরিচালিত গ্যাস ক্ষেত্রটি থেকে জাতীয় গ্রিডে মোট সরবরাহকৃত গ্যাসের ৪০ শতাংশের বেশি আসে। বিবিয়ানায় উত্তোলনযোগ্য মজুদের প্রায় ৯৮ শতাংশ এরই মধ্যে উত্তোলন করে ফেলা হয়েছে। এখান থেকে উত্তোলনকৃত গ্যাসের চাপও এখন কমে আসছে। বিষয়টি নিয়ে বিতরণ কোম্পানি জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেমস লিমিটেডকে (জেজিটিডিসিএল) এরই মধ্যে চিঠি দিয়েছে পেট্রোবাংলা। চিঠিতে বিবিয়ানা থেকে গ্যাসের সরবরাহ ও চাপ কমে এলেও যেন গ্রাহক ও সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে কাঙ্ক্ষিত চাপে গ্যাস সরবরাহ করা যায়, সে বিষয়ে জেজিটিডিসিএলকে প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। পেট্রোবাংলার অপারেশন্স বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশে শেভরন পরিচালিত বিবিয়ানা গ্যাস ক্ষেত্রের উৎপাদন ও প্রেশার ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। ভবিষ্যতে বিবিয়ানা গ্যাস ক্ষেত্রের ওপর নির্ভরশীল গ্রাহক ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে কাঙ্ক্ষিত চাপে গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অস্থিতিশীল পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটবে। এ অবস্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোয় কাঙ্ক্ষিত চাপে গ্যাস সরবরাহে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ আবশ্যক হয়ে পড়েছে। চিঠিতে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোয় গ্যাস সরবরাহের জন্য জেজিটিডিসিএলকে প্রয়োজনীয় কারিগরি পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়।

দেশের জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ডের উৎপাদন ও চাপ কমে যাওয়ার বিষয়টি জ্বালানি খাতে সংকটময় ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে বলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন। এক্ষেত্রে বিবিয়ানার সরবরাহ সক্ষমতা কমে গেলে তা পূরণ করার মতো বিকল্প ব্যবস্থা এখন জ্বালানি বিভাগের হাতে নেই বলে তারা মত দিচ্ছেন।

গ্যাস ফিল্ডগুলোর মধ্যে শেভরন বিবিয়ানা, মৌলভীবাজার ও জালালাবাদ পরিচালনা করছে। তিনটি গ্যাস ফিল্ডের আওতায় উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ ছিল ৭ হাজার ৬১২ বিসিএফ। এর মধ্যে চলতি বছরে জুলাই পর্যন্ত ৭ হাজার ৫৮০ বিসিএফ উত্তোলন করা হয়েছে। এ তিন গ্যাস ক্ষেত্রে উত্তোলনযোগ্য মজুদ রয়েছে আর মাত্র ২০৩ বিসিএফ। 

এভাবে গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে এলেও এ নিয়ে পূর্ব পরিকল্পনার ঘাটতির কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। পেট্রোবাংলার সূত্রমতে, গ্যাসের মজুদ বৃদ্ধির জন্য শেভরন নতুন বিবিয়ানা-২৭ নামে একটি কূপ খনন করছে। কূপ খননের মাধ্যমে গ্যাসের মজুদ বৃদ্ধি পেলে তা দিয়ে বড়জোর আরো এক-দুই বছরের জোগান পাওয়া যেতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। এদিকে গ্যাসের মজুদ ও সরবরাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে পেট্রোবাংলা ৪৬টি কূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৫ সাল নাগাদ এসব কূপ খনন করে সংস্থাটি জাতীয় গ্রিডে ৬০ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস যুক্ত করতে চায়।

এখন বিশেষজ্ঞ মত অনুযায়ী প্রশ্ন হলো, এ রকম গ্যাস সংকটের কারণ কী? এর উত্তর খুঁজলে দেখা যায়, অতীতে বছরের পর বছর গ্যাসের মজুদ কমে যাওয়ার বিপরীতে হ্রাস পাওয়া গ্যাস পূরণের জন্য যথেষ্ট অনুসন্ধান চালানো হয়নি। বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের কেবল পূর্বাংশে এলাকাবিশেষে জোরালো অনুসন্ধান দেখা গেলেও দেশের দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর অংশে গ্যাসের অনুসন্ধান সামান্য ছিল। এমনকি পূর্বাংশের পার্বত্য চট্টগ্রামও জোরালো অনুসন্ধানের আওতায় আসেনি। এছাড়া দেশের সম্ভাবনাময় সমুদ্রপৃষ্ঠও গ্যাস অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়নি অথচ প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার ও ভারত সমুদ্রসীমায় তাদের অংশে জোরালো অনুসন্ধান চালিয়ে যথেষ্ট সফলতা অর্জন করেছে। প্রকৃতপক্ষে গ্যাস সম্পদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে কম অনুসন্ধান চালানো দেশগুলোর একটি। তাই আশা করা যায়, যথেষ্ট অনুসন্ধানের মাধ্যমে ভূগর্ভে লুক্কায়িত গ্যাস উত্তোলন করলে দেশে গ্যাস সংকট থাকবে না।

এ অবস্থায় নতুন কূপ খননসহ গ্যাস অনুসন্ধানের যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, তার যথাযথ বাস্তবায়ন কাম্য। এক্ষেত্রে সবাই একমত যে আমদানিনির্ভর উচ্চমূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে সমস্যার সমাধান হবে না। এজন্য স্থানীয় অনুসন্ধানে জোর দেয়ার বিকল্প নেই। আমরা প্রত্যাশা করব ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে পেট্রোবাংলা যথোপযুক্ত ভূমিকায় উপনীত হতে সক্ষম হবে।