রাজধানী ঢাকার কৃষিজমি হ্রাস পাচ্ছে। ডেভেলপারদের মালিকানায় চলে যাচ্ছে আবাদি জমি। অপরিকল্পিত নগরায়ণে ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশের। একদিকে পানির উৎস জলাশয় দখল হচ্ছে, অন্যদিকে টেকসই ড্রেনেজ ব্যবস্থাও গড়ে উঠছে না। এভাবেই অপরিকল্পিত নগরী হিসেবে গড়ে উঠছে ঢাকা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বেন) আয়োজিত ‘স্থায়িত্বশীল নগরায়ণ: সমস্যা ও সমাধান’ শীর্ষক সম্মেলনে এসব কথা বলা হয়। অনুষ্ঠানে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. রেহমান সোবহান প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন। বস্তুত পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পরিকল্পিত নগরায়ণকে গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য কৃষিজমি ও জলাশয় রক্ষার বিকল্প নেই। পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টিও অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ মানুষের জীবনধারণে এখন পর্যন্ত খাদ্যের বিকল্প তৈরি হয়নি। তাহলে কোন বিবেচনায় খাদ্য উৎপাদনের জমি বিনাশ করা হচ্ছে, সেটি ভাবা প্রয়োজন। কারণ শুধু বসতি গড়ে তুললে অন্যদিকে যে কৃষিজমি হ্রাস পাচ্ছে, তা চিন্তায় রেখে আগামীর পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। এভাবে অপরিকল্পিতভাবে কৃষিজমি দখল করলে একসময় তা খাদ্যনিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু পার হয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশের কৃষিজমির ওপর অনেক আবাসন কোম্পানি প্লট বিক্রি করছে। একসময়ের ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকা কেরানীগঞ্জ এখন ঢাকা শহরের কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। একইভাবে সাভার পর্যন্ত দুই পাশের সব জমিতেই আবাসিক এলাকা হয়ে যাচ্ছে। এভাবে ঢাকা মেট্রোপলিটন একদিকে পদ্মা, অন্যদিকে যমুনা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। ব্যবসায়ীদের এ তৎপরতায় নগরায়ণ পদ্মা ও যমুনা নদীর পাড়ঘেঁষে যশোর-খুলনা পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ নগরে বসবাস করছে এবং তাদের প্রায় ৩২ শতাংশই ঢাকার বাসিন্দা। ঢাকাকেন্দ্রিক জনস্রোত বৃদ্ধি পাওয়ায় অপরিকল্পিত নগরায়ণ গড়ে উঠছে। অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ সামলাতে না পেরে ঢাকা বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বর্ধিত জনসংখ্যার ভার বহনে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন করাও সম্ভব হচ্ছে না। ঢাকার দেখাদেখি এখন দেশের অন্যান্য শহরেও অপরিকল্পিত নগরায়ণ গড়ে উঠছে। আবার নগরায়ণের অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে সড়কপথের উন্নতি হচ্ছে না। অপ্রতুল সড়ক ব্যবস্থার কারণে পরিবহন খাত বিপর্যস্ত হয়েছে। রাজধানীর আয়তনের ২৫ শতাংশে সড়ক থাকার কথা থাকলেও রয়েছে কেবল ৮ শতাংশ। এর মধ্যে ৫২ শতাংশ মোটরযান চলাচলের অনুপযোগী। যে কারণে যানজট বাড়ছে। এদিকে অপরিকল্পিত বেচাকেনায় জমির দাম কার্যত স্বর্ণের দামে গিয়ে ঠেকেছে। প্রভাবশালী রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের স্বর্ণের খনির মতো আমাদের দেশে জমি ডাকাতি হয় এমনটি রূপকার্থে বলা যায়। ১৯৯১ সালের পর রাজধানী ও পার্শ্ববর্তী এলাকার জমি ব্যবহার নিয়ে একটি পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। ওই পরিকল্পনায় জমি ব্যবহারের নির্দেশনা, কৃষিজমির অবস্থান, নগরায়ণের জন্য জমি অধিগ্রহণ পরিকল্পনায় এসব চিহ্নিত করা হয়। আদর্শগতভাবে এটি এখনো বাস্তবায়নের দাবি রাখে। কারণ সেটি কোনো এজেন্ডা ছিল না, বরং গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিকল্পনা দলিল ছিল বলে নগর পরিকল্পনাবিদরা দাবি করেন। কিন্তু সে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন গুরুত্ব পায়নি, বরং পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারী সংস্থা আবাসন খাতের ব্যবসায়ী ও জমি ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে। এমন আলোচনাই সম্মেলনে উঠে এসেছে।
নগরের জন্য যথার্থ পরিকল্পনার বিষয়টিও সম্মেলনে বলা হয়। এক্ষেত্রে উন্নয়নকাজে যথেষ্ট সমন্বয়হীনতা পরিলক্ষিত হয়। একদিকে পৌরসভা, সিটি করপোরেশন রাস্তা খোঁড়ে, অন্যদিকে পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (ওয়াসা) রাস্তা খোঁড়ে। এছাড়া আইন অমান্য করার সংস্কৃতি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা। কাগজে-কলমে আইন থাকলেও তার বাস্তবায়ন দেখা যায় না। আইনপ্রণেতাদের মধ্যেই আইন লঙ্ঘনের প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। সর্বোপরি পরিবেশ সুরক্ষায় পরিকল্পিত নগরায়ণ অপরিহার্য। পরিবেশ আন্দোলনকে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার তাগিদ এখন জোরালোভাবে প্রয়োজন। নতুন সরকারের পরিবেশমন্ত্রী শপথ নেয়ার পর নগরায়ণ ও পরিবেশ বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক দিক, এজন্য পরিকল্পিত নগরায়ণে সরকারের ব্যবস্থা নেয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। এক্ষেত্রে আর সময়ক্ষেপণ করা ঠিক হবে না। অন্যথায় একদিকে যেমন পরিবেশের ক্ষতি হবে, তেমনি ঢাকা বসবাসের অযোগ্যতায় আরো নিম্নমুখী হবে, যা মোটেও প্রত্যাশিত নয়। ঢাকার শহরাঞ্চল বছরে সাড়ে ৩ শতাংশ হারে বাড়ছে। বিশ্বের বড় শহরগুলোর মধ্যে এ বৃদ্ধি সর্বোচ্চ। ঢাকায় উঁচু ভবন, বড় রাস্তা, মেট্রোরেল ও পাতাল সড়কের মতো মেগা প্রকল্প হচ্ছে। তৈরি পোশাক কারখানার সবচেয়ে বড় কেন্দ্র হয়ে উঠেছে এ শহর। গত দুই যুগে এখানকার জনসংখ্যা পাঁচ গুণের বেশি বেড়েছে। দেশের মোট জনসংখ্যার ১৩ শতাংশের ওপরে এখানে বসবাস করে। এক্ষেত্রে সঠিক নগরায়ণের উদাহরণ হিসেবে শ্রীলংকার দৃষ্টান্ত উত্থাপন করা যেতে পারে। দেশটি ৮০ শতাংশ মানুষকে গ্রামে রেখেই উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হয়েছিল। এছাড়া চীনে অর্থনৈতিক সংস্কার শুরুর পর দেশটির গ্রামাঞ্চলে টাউনশিপ-ভিলেজ-এন্টারপ্রাইজ নামে পরিচিত অসংখ্য শিল্প-কারখানা স্থাপন করা হয়। তাতে সেখানে ১০ কোটির বেশি মানুষের কর্মসংস্থান করা সম্ভব হয়েছিল।
আমরা সুস্থ পরিবেশে স্বাভাবিকভাবে বাস করতে চাই। সে কারণে ঢাকার বাসযোগ্যতা যেন বজায় থাকে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য কৃষিজমি রক্ষার পাশাপাশি পানির উৎস জলাশয় রক্ষা করা প্রয়োজন। আমরা প্রত্যাশা করি, সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো সমন্বিতভাবে ঢাকার বসবাসযোগ্যতা রক্ষায় কাজ করবে। এক্ষেত্রে পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করতে সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা কাম্য।










